শালুক ও অধুনাবাদ : চিন্তনের যৌক্তিক কাঠামো এবং শ্রেয়বোধের উজ্জীবন

মাহফুজ আল-হোসেন

image

কবি ও নন্দনতাত্বিক মাহফুজ আল-হোসেন

সাহিত্য ও চিন্তাশিল্পের লিটল ম্যাগাজিন শালুক ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে ইতোমধ্যেই গৌরবের বিশ বছর অতিক্রম করেছে। দেশি-বিদেশি পাঁচ শতাধিক লেখক-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গত ২২-২৪ নভেম্বর ২০১৯ অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিনব্যাপী শালুকের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সর্বোতসফল অনুষ্ঠান। শালুক শুধুমাত্র একটি সাহিত্য পত্রিকা নয়; এটি একটি সাহিত্য আন্দোলনের নাম। প্রচল জনপ্রিয় ধারার গড্ডল স্রোতের বিপরীতে প্রতিস্পর্ধী অবস্থানে থেকে নির্ভীকচিত্তে সাহিত্য, শিল্প ও চিন্তাচর্চার মুক্ত বাতায়ন শালুক। সাহিত্যের আদি ও মহত্তম প্রকরণ কবিতা দিয়ে শুরু করলেও সময়ের পরিক্রমায় কথাসাহিত্য, নাট্যকলা, প্রবন্ধ, নন্দনতত্ত্বসহ মানব চিন্তন-অনুধ্যানের বিচিত্র ও বহুবর্ণিল বিষয়াবলি এর সূচিভুক্ত হয়েছে। শালুকের লেখক, পাঠক ও শুভাকাক্সক্ষীদের নিয়ে গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়েছে শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা এবং এ পর্যন্ত এর দশটি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য-সুহৃদ ও সুধীজনের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

এটি অনস্বীকার্য যে, বাণিজ্যিক পত্রিকার সাহিত্যচর্চা এবং লিটল্ ম্যাগাজিনের মধ্যে চেতনাগত ও বৈশিষ্ট্যগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। ইচ্ছে করলেই বাণিজ্যিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী লেখকের সম্পূর্ণ স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রেখে প্রবহমান ধারণার বাইরে কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে না। পারে না কর্পোরেট পুঁজির বেসাতি কিংবা সাহিত্যের পণ্যায়নের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে। একটি লিটল ম্যাগাজিনের পক্ষেই এরূপ নীতিভিত্তিক ইস্পাতদৃঢ় অবস্থান নেয়া সম্ভব এবং শালুক তার বিশ বছরের প্রত্যয়ী পথ চলায় সে অঙ্গীকারকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ওয়েবজিন, ব্লগজিন ইত্যাদির মাধ্যমে স্বেচ্ছাপ্রকাশের বল্গাহীন স্বেচ্ছাচারিতার এই যুগে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে মুদ্রিত মাধ্যমের একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুইটি দশক অতিক্রম করতে পেরেছে, সেটি শুধুমাত্র শনাক্তযোগ্য নয়, বিস্ময়করও বটে।

বিষয় ভাবনা ও প্রবণতার ক্ষেত্রে শালুক ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিকতাকে ধারণ করেছে দৃঢ়ভাবে, তবে পাশ্চাত্য কিংবা প্রাচ্যের সাহিত্যতত্ত্বের অন্ধ অনুকরণ করে নয়, দর্শন হিসেবে শালুক বেছে নিয়েছে স্বসংজ্ঞায়িত অধুনাবাদকে। অধরা মাধুরী অকস্মাৎ হাতে পাওয়ার মতোই ‘অধুনাবাদ’ শব্দটি শালুক-সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশের মগ্ন চৈতন্যের স্বজ্ঞায় ধরা পড়ে সৃজনশীল কোনো এক মুহূর্তে; তিনি তাঁর ‘প্রতিপ্রতিভা’ শিরোনামের এক কবিতায় সর্বপ্রথম এ শব্দটি ব্যবহার করেন। শালুক-এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধনী পর্বে “পাগলা ঘোড়া, দুর্বিনীত ষাঁড়” শীর্ষক স্বাগত বক্তব্যে তিনি অধুনাবাদ বিষয়টি সুস্পষ্ট করেন এভাবে:

“অনেক চিন্তাভাবনার নির্যাস এই ‘অধুনাবাদ’। ... এতে আধুনিকতা কিংবা উত্তরাধুনিকতার মতো কোনো সময়খণ্ড কিংবা অসীমতা-সসীমতা নেই। ...স্পষ্ট করতে চাই যে, এটি কোনো পশ্চিমা কিংবা পরদেশি ইজম-প্রভাবিত সাহিত্যতত্ত্ব নয়; এটি সম্পূর্ণই এই আবহমান বাংলার জলহাওয়া, নিসর্গমৃত্তিকা নিসৃত একটি চর্চাম-লী। উদ্ধৃতিসর্বস্বতা পরিহার ও শিল্পস্রষ্টার একান্ত বিশ্বস্ত চিন্তার পরিভ্রমণই এই অধুনাবাদে পাল তুলে দেবে। এটি সাহিত্যতত্ত্ব হলেও সাহিত্য ব্যাপ্তির ক্যানভাসে ঠাঁই পাওয়া সকল বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত হতে বাধা নেই। সঙ্গীত, চিত্রকলা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান- সকল কিছুতে অধুনাবাদ তার নিরীক্ষাপ্রবণ প্রায়োগিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে পারবে, সংযুক্তিতে সিদ্ধ হতে পারবে। অধুনাবাদকে উপেক্ষা করার ভাষাও এই তত্ত্বে প্রবল শক্তিধর।”

অংশগ্রহণমূলক নিবিড় জ্ঞানানুশীলন এবং চর্চার মধ্য দিয়ে শালুক অনতিভবিষ্যতে অধুনাবাদের সংজ্ঞার্থ ও বৈশিষ্ট্যের সংবদ্ধ রূপ তুলে ধরবে নিঃসন্দেহে। এতদসত্ত্বেও আমরা প্রাথমিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছি যে, অধুনাবাদ হচ্ছে নিরন্তর নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নানা মাত্রিকতায় প্রতিনিয়ত সত্য ও সুন্দরকে শৈল্পিকভাবে পুনরাবিষ্কার করা। সদাসর্বদা সৃজনশীলতার সপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা এবং এর বিপক্ষে ক্রিয়াশীল সকল বাধাকে অগ্রাহ্য করে সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়া। অধুনাবাদ সকল প্রকার রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি ও মৌলবাদের ঘোরবিরোধী। এটি মুক্তচিন্তা, যুক্তিশীলতা, স্বকীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সর্বোতভাবে ধারণ করতে বদ্ধপরিকর। এটি মজ্জাগত সংস্কার ও কাঠামোবদ্ধ ধারণার প্রতি অনুগত না হয়ে চিন্তার নবায়ন ও বাঁকবদলকে প্রণালিবদ্ধ ও বিশ্লেষণাত্মকভাবে অধ্যয়ন করে তার স্বরূপকে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে চায় এবং পাবলিক ডিসকোর্স হিসেবে জনবিতর্ককে উৎসাহিত করতে আগ্রহী। অধুনাবাদ ঢালাও প্রচার প্রোপাগা-ার বিরোধী। এর দৃষ্টি নিবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনলব্ধ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তাকে জনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করা। আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা। ভাবনার সংবৃত্তায়ন কিংবা কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং কেলাসিত ভাবনার বিচূর্ণায়নের মধ্য দিয়ে নিত্য-নতুন চিন্তাভাষ্য ও পাঠকৃতি তৈরি করা। অজ্ঞেয়বাদী ও সংশয়দীর্ণ অবস্থানের পরিবর্তে ভয়ডরহীন অভিব্যক্তির অবাধ ও নিরূপদ্রব প্রকাশকে অধুনাবাদ উৎসাহিত করে। ব্যক্তিবিশেষ কিংবা গোষ্ঠীর অনুকরণ, অনুসরণ কিংবা উদ্ধৃতিসর্বস্বতাকে সযত্নে এড়িয়ে চলতে চায় অধুনাবাদ। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় ধরিত্রীর সকল প্রজাতির টিকে থাকার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করতে চায় অধুনাবাদ। সকল কালের সকল যুগের সাহিত্যকৃতি ও শিল্পসুকৃতিকে মানবজাতির মহামূল্যবান ঐতিহ্যসম্পদ জ্ঞান করে তা সংরক্ষণ, অধ্যয়ন, মূল্যায়ন এবং ঐগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যায়নের কবলমুক্ত করে সার্বজনীনভাবে সেসবের শিল্পসুষমা যাতে ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সবাই উপভোগ করতে পারে সে বিষয়টির অগ্রগণ্যতা জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে চায় অধুনাবাদ। মানুষে মানুষে বিশেষ করে নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গসহ সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সকল বৈষম্য অপনোদন করে সবার জন্য সমতাপূর্ণ, সমমর্যাদার শান্তিময় উদারনৈতিক এক বৈশ্বিক সমাজ গড়ায় অঙ্গীকারাবদ্ধ অধুনাবাদ।

শিল্প, সাহিত্য ও চিন্তনচর্চার ক্ষেত্রে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্তি ও অনায়াসগম্যতার পক্ষে অধুনাবাদ এবং এসব সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকা- যাতে কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে সে বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার পক্ষে এ মতবাদ। অধুনাবাদী সাহিত্য সাম্প্রতিককালের যেমন, সাহিত্যকৃতির সর্বকালিক প্রাসঙ্গিকতায়ও বিশ্বাসী অধুনাবাদ। কারণ অধুনাবাদ সদাসাম্প্রতিক, আদি এবং অন্তহীন।

অধুনাবাদ সাহিত্যের স্থানিক কোনো কেন্দ্র কিংবা প্রান্তের অস্তিত্ব স্বীকার করে না এবং স্থানাভিজাত্যের আরোপিত বোধ যেন কোনো সাহিত্যকৃতিকে খাটো বা বড় করে দেখার অপপ্রয়াস না চালাতে পারে সেদিকেও সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এটি। অধুনাবাদী অনুভবে সাহিত্যের কোনো গলি বা রাজপথ থাকতে পারে না। এমনকি এ ভাবাদর্শ অনুসারে চিন্তাভাষ্যের চিহ্নায়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে দ্যোতক ও দ্যোতিতের মধ্যে যেন কোনোরূপ উত্তমর্ণ কিংবা অধমর্ণের সম্পর্ক তৈরি না হয়।

অধুনাবাদ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা। কালের পরিক্রমায় শিল্প-সাহিত্য-মননের ক্ষেত্রে বহুশাস্ত্রীয় পাটাতনের ভিত্তিকে অবলম্বন করে নানা নন্দনতাত্ত্বিক মতবাদ সম্মুখে এসেছে। অধুনাবাদের সাথে ঐসব চিন্তন-অনুধ্যানের কোনো বিবাদ-বিসংবাদ নেই। মানবচিন্তন সবসময় নিরীক্ষাপথেই অগ্রসর হয়েছে। নিত্যনতুন আবিষ্কার এবং সাধনার ফলস্বরূপ আমাদের বোধের অগ্রগমন সূচিত হয়েছে। আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনাচরণে এসবের অভিঘাত লেগেছে প্রবলভাবে। একদার গুহামানব এখন জলে স্থলে অন্তরীক্ষে নিজের অস্তিত্বকে বিস্তৃত করেই ক্ষান্ত হয়নি, সৌরমণ্ডলির গ্রহ-উপগ্রহ কিংবা দূরবর্তী নক্ষত্ররাজিতে নিজেদের বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন লালন করছে। নিরন্তর গতিময়তাই অধুনাবাদের আরাধ্য। সাহিত্য শব্দের মূল ধাতু ‘সহিত’ নৈরাশ্যবাদিতা কিংবা বিচ্ছিন্নতার বোধকে কখনোই সমর্থন করে না বরং সবাইকে যুক্ত করতে চায় নান্দনিক সম্পর্কে। শালুক অধুনাবাদের আদর্শকে অন্তর্মুখী বৌদ্ধিক সংজ্ঞায়নের মধ্যেই সীমিত রাখতে চায় না। শালুকের লেখক-পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের সাথে এ নিয়ে মুক্তপ্রান্ত আলোচনায় প্রয়াসী বলেই শালুকের মাসিক সাহিত্যআড্ডার বিষয়বস্তু হয়েছে অধুনাবাদ। শালুকের সর্বশেষ দুটি সাহিত্য আড্ডায় দুটি পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে অধুনাবাদের ওপরে এবং উপস্থিত আলোচক এবং পাঠকগণ খোলা মনে আলোচনায় অংশ নিয়ে অধুনাবাদের স্বরূপ উন্মোচনে প্রয়াসী হয়েছেন নিজস্ব ভাবনাভাষ্যে। আগামীতে অধুনাবাদ নিয়ে শালুক-এর একাধিক সংখ্যা প্রকাশের প্রবল আকাক্সক্ষা রয়েছে শালুক-সম্পাদকের।

প্রকৃতপ্রস্তাবে, অধুনাবাদ হলো পুনঃপুনঃ অভিযোজিত এক যৌক্তিক চিন্তাকাঠামো যেটি মূলত বাংলার জলহাওয়া নিসর্গমৃত্তিকার নির্যাস থেকে উৎসারিত নন্দন ও নৈতিকতার নিত্যনতুন উপলব্ধি এবং যেগুলো সচেতন মানুষ একে অপরের সাথে বিনিময় করে সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিক চেতনা ও শ্রেয়বোধের উজ্জীবন ঘটাতে প্রয়াসী। অধুনাবাদের ধারাবাহিক চর্চায় আমাদের সকল কুলীনতা-মলিনতা লীন হয়ে যাক। আসুন আমরা প্রচল পরচর্চা ও পরান্মুখ দীনতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিন্তনের সৌন্দর্য-অনুসন্ধিৎসু সুজনের সাথে ভাব বিনিময়ের যে অনন্য সুযোগ শালুক আমাদের করে দিয়েছে, তাকে সার্থকভাবে কাজে লাগাই।

জয় হোক সকল প্রাণের। জয়তু শালুক।