শিল্পাচার্য জয়নুল শিল্পের শিক্ষাগুরু : সেমিনারে বক্তারা

image

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে স্বরণ করে দেশের বিশিষ্ট শিল্প সমালোচকরা বলেছেন, শিল্পাচার্য একাধারে বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পথিকৃৎ, সফল শিল্পী-শিক্ষক, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ধারক-বাহক ও সেবক এবং মানবতাবাদী ছিলেন। তার শিল্পকর্ম মানুষের মনকে ছুয়ে যেত। ১১ মে শনিবার রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন : শিল্পের শিক্ষাগুরু’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা। সেমিনারটির আয়োজন করে জাতীয় জাদুঘর।

জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এর সভাপতি শিল্পী হাশেম খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ও শিল্পী ড. ফরিদা জামান, বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক অধ্যাপক মঈনুদ্দীন খালিদ, জাতীয় জাদুঘরের সচিব আবদুল মজিদ, মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহম্মদ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ছেলে মইনুল আবেদিন প্রমুখ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক শিল্পী দুলাল চন্দ্র গাইন।

বক্তারা বলেন, জয়নুল আবেদিন শুধু শিল্পের শিক্ষক হিসেবে আর্ট স্কুলের গ-ির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। নিজের শিল্পচর্চাকে শাণিত করতে ছুটিতে ছবি আঁকতে চলে যেতেন সাঁওতাল পরগণার দুমকায় ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে। কখনও ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। ১৯৩৮ সালের সর্বভারতীয় চিত্র প্রদর্শনীতে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের একগুচ্ছ জলরং চিত্রের জন্য।

বক্তারা আরও বলেন, কলকাতায় অবস্থানকালে জয়নুল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। খাদ্যের সন্ধানে গ্রাম থেকে আসা অনাহারী মানুষের খাদ্যের জন্য করুণ আর্তনাদ, ডাস্টবিনের পচা-বাসি উচ্ছিষ্ট খাদ্যের জন্য মানুষের সঙ্গে কুকুর ও কাকের প্রতিযোগিতা, খাদ্যাভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এসব দৃশ্য জয়নুল আবেদিনকে খুব মর্মাহত করেছিল। প্রচ- আবেগে তিনি দ্রুততার সঙ্গে দুর্ভিক্ষের অসংখ্য স্কেচ করেছিলেন। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার মধ্য দিয়ে তিনি খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। এই চিত্রমালার জন্য তিনি মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে সারা ভারতবর্ষে পরিচিতি লাভ করেন। এই দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা তাকে আরও বেশি রাজনীতি সচেতন করে তোলে।

চিত্রশৈলীর মাধ্যমে এ দেশের চিত্রকলাকে বাস্তবানুগ অনুকরণের জায়গা থেকে মুক্ত করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমকালীন আধুনিক শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেন জয়নুল আবেদিন। সে হিসেবে পূর্ব বাংলার আধুনিক শিল্পচর্চার সূচনা জয়নুলের হাতেই হয়েছে বলেও জানান বক্তারা।

অধ্যাপক মঈনুদ্দীন খালিদ বলেন, শিল্পী জয়নুল আবেদিন মানুষে কাছে পৌঁছে ছিলেন তার আঁকা ছবির মাধ্যমে আর তা সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটেই উঠে আসে। তিনি ছবি আঁকার জন্য ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে এসে আগেই নদীর ঢেউ মন দিয়ে অনুভব করতেন, তারপর তিনি ছবি আঁকতেন। এমনকি তিনি দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো আঁকার সময় মানুষের বেঁচে থাকার যে শেষ সংগ্রাম তা তুলে ধরেছেন। তার ছবিতে তৎকালীন নারী ও তাদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে অতি যতœসহকারে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কর্ম দক্ষতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, জয়নুল আবেদিন বলতেন, আগে শিল্প বুঝতে হবে তারপর তা ধারণ করতে হবে। তাই শিল্পাচার্য হচ্ছেন ‘মাস্টার অব দ্য ড্রইং’। তার অসংখ্য শিল্পকর্মই তাকে তুলে ধরেছেন সবার কাছে। তার একটু দৃষ্টিতেই ভালো একটা শিল্পকর্ম উঠে আসত।

মইনুল আবেদিন বলেন, ‘মাস্টার অব দ্য ড্রইং’ হিসেবে বাবাকে সবাই স্বরণ করেন। কারণ আমার বাবার অনেক ভালো ছবি আঁকতেন। তবে খুশির খবর হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বাবার নামে (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের) নামে স্কলারশিপ চালু করেছে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন।