সুশান্তের মৃত্যু: রিয়ার মিডিয়া ট্রায়াল

image

সুশান্তের মৃতদেহ উদ্ধারের দু’মাসের মাথায় তার বান্ধবী রিয়া দেখেন সব দোষ তাকে দেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাবতীয় ঘৃণার কেন্দ্রে রিয়া চক্রবর্তী। এতে ভূমিকা রাখছেন নামকরা সাংবাদিকেরাও।

সুশান্ত সিং রাজপুত বলিউডের সম্ভাবনাময় অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হতবাক করে দেয় দর্শক, অনুরাগীদের।

গত ১৪ জুন মুম্বাইয়ের নিজ ফ্লাট থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ জানায়, আত্মহত্যা। এরপর গণমাধ্যমে জানা যায় তিনি বেশ কিছু মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে পুরো ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। সবার মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসেন অভিনেতার প্রেমিকা।

বিবিসি জানাচ্ছে এরপর তাকে নিয়ে শুরু হয় গুজব। তারপর নানান কটু কথা। নারী হিসেবে অবমাননাকর যত মন্তব্য। তার ব্যক্তিজীবন ও সম্পর্ক নিয়ে হেন কিছু নেই যা তুলে ধরতে বাকি রাখে ভারতের গণমাধ্যম।

তাকে ধান্ধাবাজ মহিলা থেকে শুরু করে বলা হয় তিনি যাদুটোনা করেছেন, সুশান্তকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে গেছেন ইত্যাদি।

সামাজিক মাধ্যমে তাকে আরো নির্দয়ভাবে যাইচ্ছেতাই বলা শুরু হয়। তাকে বলা হয়, সুযোগসন্ধানী, বেশ্যা, যিনি বড়লোকদের শরীর দিয়ে ফাঁদে ফেলেন।

রিয়া গত মাসে ইনস্টাগ্রামে তাকে পাঠানো একটি মেসেজের স্ক্রিনশট দেন ইনস্টাগ্রামে। সেখানে দেখা যায়, সুশান্তের ভক্ত দাবি করে একজন রিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়ে বলেছেন রিয়া যেন আত্মহত্যা করে নইলে সুশান্তের ওই ভক্ত তাকে লোক ভাড়া করে মারবে।

ওই পোস্টে রিয়া লেখেন, "আমাকে বলা হলো লোভী, আমি চুপ থাকলাম, আমাকে বলা হলো খুনী, আমি চুপ থাকলাম, আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলা হলো, আমি চুপ থাকলাম।"

এসময় তিনি সাইবার ক্রাইম দেখার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সহযোগিতা চান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিয়াকে নিয়ে নোংরা কথাবার্তা আরো বেড়ে যায় সুশান্তের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর।

মামলায় সুশান্তের বাবা অভিযোগ করেন, রিয়া তার ছেলের টাকা নিয়েছে, ওষুধের ওভারডোজ খাইয়েছে, হুমকি দিয়েছে মানসিক অসুস্থতার খবর রটিয়ে দেওয়ার, এবং তার ছেলের সঙ্গে পরিবারের দূরত্ব তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, তার ছেলের কোনো মানসিক সমস্যা ছিল না। তার অভিযোগ, রিয়া তার ছেলেকে বিষ দিয়ে মেরেছে, তাকে হত্যা করেছে। ভারতের সব পত্রপত্রিকার শিরোনাম হয়েছে তা।

রিয়া তার মৃত্যুর জন্য যে কোনো ধরনের দায় অস্বীকার করেছে।

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী মীনাক্ষী অরোরা বলেছেন, হত্যায় সম্পৃক্ততা প্রমাণ হয়নি, এখনও তদন্ত চলছে, কিন্তু অধিকাংশ মিডিয়া ইতোমধ্যেই তাকে দোষী বানিয়ে ফেলেছে।

অরোরা বলেন, “রিয়াকে মধ্যযুগের মতো ফাঁসিতে ঝুলিয়ে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

আইনজীবী মন্তব্য করেন, “মিডিয়া বিচার করে ফেলেছে। কিন্তু তার জন্য তদন্ত আছে, আদালত আছে। তার বিচার করা তো মিডিয়ার কাজ না। এটা বেআইনি।”

পল চাওলা নামের আরেকজন আইনজীবী বলেন, এ ধরনের রিপোর্টিং খুবই সমস্যাজনক।

“মানুষকে গুজবের চাহিদার তুষ্টিসাধন করতে মানুষকে এভাবে উস্কে দেওয়া এবং ছিদ্রান্বেষণ প্রচণ্ডভাবে সমস্যাজনক।”

তিনি বলেন, “এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেলো একজন নারীর বিরুদ্ধে লাগা কত সহজ। বিষয়টা সেটা নয় যে তিনি দোষী কি না, আমি এখানে যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখি সেটা হচ্ছে এই বিচারের আগেই কাউকে দোষী বানিয়ে ফেলা, উন্মত্ত জনতার হাতে গণপিটুনির মতো, তারপর গ্রেফতারের জন্য দাবি এসব।”

রিয়ার পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া মিডিয়ার অনায্য ভূমিকার ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।

এছাড়া বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, সুশান্তের মৃত্যুর ঘটনায় তার কোনো ভূমিকাই নেই।

গত বছরের শেষ দিকে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক হয়। ডিসেম্বর থেকে তারা একসাথে থাকতে শুরু করেন।

৮ জুন রিয়া তার নিজের বাড়িতে যান বাবা মায়ের কাছে। এর এক সপ্তাহ পরই সুশান্ত সিং আত্মহত্যা করেন।

সুশান্তের মৃত্যুর এক মাস পর ইনস্টাগ্রামে রিয়া লেখেন আবেগ সংবরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি, আমার ভেতরটা পুরো অবশ হয়ে গেছে, আর তোমার সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কথা হবে না, যেহেতু তুমি নেই।

তার বন্ধুরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি কী পরিমাণ ভালবাসতেন সুশান্তকে। কীভাবে ক্যারিয়ারের চেয়ে সুশান্তকে বড় করে দেখেছেন তিনি।

কিন্তু মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে এমন আক্রমণ শুরু হয় যে খোদ সুশান্তের মনোচিকিৎসক সুসান ওয়াকার একটা বিবৃতি দিতে বাধ্য হন।

সেই বিবৃতিতে বলা হয়, সুশান্তের জন্য একটা বড় আশ্রয়স্থল ছিল রিয়া। মায়ের ওপর মানুষ যেভাবে নির্ভর করে, রিয়ার ওপরও সুশান্ত সেভাবেই নির্ভর করতেন।

সেটা নিয়ে মানুষ কথা বলতে ছাড়েনি সোশাল মিডিয়ায়। বলেছে, ওই ডাক্তার তার রোগীর বৃত্তান্ত বাইরে ফাঁস করে দিয়ে নৈতিকতার লঙ্ঘন করেছে।