প্রশিক্ষণ পেয়েও সৃজনশীল প্রশ্নের চর্চা করছেন না শিক্ষকরা

image

সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ পেয়েও তাদের একটি বড় অংশ সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন না। প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে সৃজনশীল বিষয় চর্চা করছেন না। আবার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সাড়ে ১৩ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাজার থেকে কেনা প্রশ্নপত্র দিয়ে বার্ষিক, অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য একাডেমিক পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের সৃজনশীল চর্চা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন। আংশিক প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছে ২৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিক্ষক। তবে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল বিষয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারছেন না বলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরের সর্বশেষ (গত ফেব্রুয়ারি) একাডেমিক সুপারভিশন রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। সারাদেশের মাধ্যমিক স্তরের ১৮ হাজার ৫৯৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬ হাজার ২৫৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুপারভিশন করে ওই তথ্য পেয়েছে মাউশি অধিদফতর।

এ ব্যাপারে মাউশি অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান সংবাদকে বলেন, ‘সব শিক্ষকই সৃজনশীল বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ পাননি এমন শিক্ষক এখন খোঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশিক্ষণ নিয়েও সব শিক্ষক বিষয়টি চর্চা করছেন না। এটা নিরন্তর চর্চা, চিন্তা, মেধা ও শ্রমের ব্যাপার। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনছি, কিছু স্কুলে শিক্ষকদের দিয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন না করে বাইরে (বাজার) থেকে প্রশ্ন কিনে ইন্টারনাল পরীক্ষা নেয় হচ্ছে। এতে শিক্ষকরা সৃজনশীল চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া সৃজনশীল চর্চায় শিক্ষকদের বাধ্য করা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব। সেটিও সবক্ষেত্রে হচ্ছে না।’

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির ‘একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদন’ বলা হয়েছিল, সারাদেশের ৭ হাজার ২৭৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৭১৪টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন। গড়ে ৫১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন। বাকি ৪৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পুরোপুরি সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না।

২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সৃজনশীল বিষয়ে প্রায় ৯ শতাংশ শিক্ষকের দক্ষতা বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় শতভাগ শিক্ষক সৃজনশীল বিষয়ে কমবেশি প্রশিক্ষণ পেলেও এ বিষয়ে নিয়মিত চর্চা করার আগ্রহ নেই সবার মধ্যে। এ জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েও অনেকে সৃজনশীল বিষয়ে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন না।

রাজধানীর ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভূঁইয়া সংবাদকে বলেন, ‘আমার স্কুলের ৫৪ শিক্ষকের প্রায় সবাই সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। কিন্তু দু’তিনজন আছেনÑ যারা প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন না। তারা বিষয়টি চর্চা করছেন না। নিয়মিত চর্চা করলে সৃজনশীল বিষয় আয়ত্ত করা কঠিন কিছু নয়।’

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই করার জন্য সরকার সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করে। ২০০৮ সাল থেকে সৃজনশীল পদ্ধতি মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবর্তন করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ১৮ জুন এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এসএসসি পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু হয় ২০১০ সালে। ২০১২ শিক্ষাবর্ষে এইচএসসিতে প্রথমে বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে। বর্তমানে এইচএসসির অধিকাংশ বিষয়েই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হয়।

প্রথম দিকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সৃজনশীল প্রশিক্ষণ পেতেন না। দু’বছর ধরে কারিগরি শিক্ষকদের এই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষকরা সৃজনশীর বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন বলে সংবাদকে জানান স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু।

মাউশির সর্বশেষ একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন সুপারিশ ও নির্দেশনা খুব একটা আমলে নিচ্ছে না অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাত্র ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বিদ্যালয় ‘একাডেমিক সুপারভিশন রিপোর্ট’-এর সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করছে। ৫৩ দশমিক শূন্য ১ বিদ্যালয়ে এই সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ বিদ্যালয় ওইসব সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টাই করছে না। ৩৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রধান শিক্ষক তাদের রেজিস্টার হালনাগাদ করছেন। আংশিক হালনাগাদ করছেন ৪৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষক। ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ শিক্ষক রেজিস্টার আমলেই নিচ্ছেন না।

শিক্ষকের ডায়েরি হালনাগাদের হারও হতাশাজনক। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডায়েরি পুরোপুরি হালনাগাদ করছেন ৩০ দশমিক ৪২, আংশিক করছেন ৫৮ দশমিক ৫১ ও ১১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ শিক্ষক করছেনই না।

অঞ্চলভিত্তিক কৌশলগত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িমসি করছে। এক্ষেত্রে মাউশি অধিদফতরের ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে বার্ষিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করে ৮৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বিদ্যালয়। অন্যগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৭১ দশমিক ৯৯, সিলেটে ৮৮ দশমিক ৮২, চট্টগ্রামে ৯০, রংপুরে ৮৯ দশমিক ৬৯, রাজশাহীতে ৮০ দশমিক ৮৬, খুলনায় ৯০ দশমিক ৬১, বরিশালে ৭০ দশমিক ৭২ ও কুমিল্লায় ৬৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে গড় এই হার ৮৩ দশমিক ২৬ শতাংশ।

শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সৃজনী ক্ষমতা বিকশিত করার জন্য্যই এ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী তার আহরিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারবে।

সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়নে পরীক্ষকদের ব্যক্তিগত বিচ্যুতির সুযোগ সীমিত। এ জন্য নম্বর প্রদান বর্তমানের সামঞ্জস্যহীন হবে না। প্রশ্ন দুর্বল, মধ্যম ও ভালোমানের শিক্ষার্থীদের পৃথক করতে সক্ষম। এ জন্য তাদের পাঠ্যবই পড়তে উৎসাহ জোগায়, কমায় মুখস্থনির্ভরতা। মুখস্থনির্ভরতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করার জন্যই সৃজনশীল প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয় বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক সুপারভিশনের আবশ্যকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম নিয়মিত প্রক্রিয়ায় আনার জন্য মাউশি অধিদফতরের ‘অ্যাকসেস অ্যান্ড কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ইউনিট (একিউএইউ) এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ এ কাজ করছে।

১৯৯৮ সালে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান প্রণয়নের সময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য কৃতিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির (পিবিএম) অভিজ্ঞতার আলোকে স্কুল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও একাডেমিক সুপারভিশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।