বইপ্রেমী হারুন-অর-রশীদ

image

হারুন-অর-রশীদ

পেশায় তিনি একজন ব্যাংকার। কিন্তু আপাদমস্তক তিনি একজন বইপ্রেমী মানুষ। তবে বই কেবল নিজেই পড়েন না, অন্যকেও বই পড়তে উৎসাহিত করেন, তরুণ প্রজন্মকে বিনোদনের সুযোগ করে দিচ্ছেন তাদের কাছে বই পৌছে দেওয়ার মাধ্যমে। তিনি বই প্রেমী হারুন-অর-রশীদ। রাজশাহীর সেই পলান সরকারের কথা আমরা সবাই জানি যিনি প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদেরকে বই পড়িয়েছেন। পলান সরকার ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। কিন্তু তার অসমাপ্ত কাজ যেন নিজের কাঁধে তুলেছেন হারুন-অর-রশীদ। বইয়ের প্রতি তার অদম্য ভালোবাসা দেখতে হলে যেতে হবে ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জে। হারুন-অর-রশীদের জন্ম কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া গ্রামে হলেও, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে বর্তমানে তিনি নবাবগঞ্জে কর্মরত আছেন গ্রামীণ ব্যাংকে। ওখানেই গড়ে তুলেছেন তার বইয়ের স্বর্গরাজ্য। ছোট্ট বাসাটি যেন শুধু বইয়ের আবরণেই মোড়ানো। তাকে সাজানো অসংখ্য বই। কামরার চারিদিকে শুধু বই আর বই।

এই যে এত বই, এগুলো কী নিতান্তই শখের বসে শুধু সংগ্রহের করা? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,। দৈনন্দিন বাজার খরচ বাঁচিয়ে কোনো রকম দিনাতিপাত করে দিনের পর দিন অতি কষ্টে সংগ্রহ করেছি এই বই। এগুলো শুধু নিজের জন্য নয়। আশে-পাশের মানুষের মাঝে সভ্যতার আলো বিলিয়ে দেয়ার জন্য।’

অফলাইন কিংবা ডিজিটাল মাধ্যম বই নিয়ে তার অনেক কাজ। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকশ দেশি-বিদেশি বইয়ের রিভিউ লিখেছেন তিনি। বইয়ের প্রচার নিয়ে কিংবা বইয়ের কথা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন রিভিউর মাধ্যমে। ডিজিটাল মাধ্যমেই শুধু থেমে নেই তার কাজের গতি । বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি মানুষের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছেন নিজ উদ্যোগে। সপ্তাহ শেষে আবার নতুন বই দিয়ে নিয়ে আসছেন পুরনো বই। মহামারী করোনার সময়েও থেমে নেই তার এ মহৎ কাজটি। যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে বই পৌঁছে দিচ্ছেন ঘরবন্দি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। এ যেন আরেক পলান সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক আর অন্যান্য অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌরাত্ম্যে শিশু কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা যখন বুঁদ হয়ে থাকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার নেশায়, একজন বইপ্রেমী হারুন তখন বই কাঁধে ছুটে বেড়ান গ্রামের পর গ্রাম। ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকে এই মানুষগুলোকে বইয়ের দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনতে শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সবার হাতে তুলে দিচ্ছেন বই। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে বইমুখী করতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন অবিরত। মাদকাসক্ত তরুণদের হাতে তিনি মাদকের বদলে তুলে দিচ্ছেন বই। মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়া তরুণদের ফিরিয়ে আনছেন বইয়ের দুনিয়ায়। গত দশ বছরে তিনি প্রায় দুই শতাধিক তরুণকে মাদকের জগত থেকে বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনছেন। অনলাইনের আসক্তি কমিয়ে তরুণদের একটা বিশাল অংশকেও তিনি এভাবেই ফিরিয়ে আনছেন বইয়ের রাজ্যে।

হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি একটা সভ্য সমাজের। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো লাইব্রেরি তৈরি করছি। সমাজের বিত্তশালীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদের প্রদত্ত অর্থ দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তুলছি উন্মুক্ত পাঠাগার। বিভিন্ন সেলুন কিংবা চা-কফির দোকানেও বই দিয়ে বইয়ের প্রচারণা করছি।’

এই বইপ্রেমীর আরও একটি পরিচয় হল তিনি রেখালেখিও করেন। হারুন-অর-রশীদ জানান, ২০২০ একুশে বইমেলায় তার লেখা একটি থ্রিলার প্রকাশের পর পাঠকমহল থেকে অনেক প্রশংসা পেয়েছেন। এবং মহামারী করোনাকালে তার প্রকাশিত এটি বউ ‘ইস্কাপনের টেক্কা’ ইতোমধ্যেই বেস্ট সেলারের খ্যাতি অর্জন করেছে।

বই নিয়ে হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘বই নিয়ে আমার স্বপ্ন অনেক। আমি চাই পৃথিবী বইয়ের হোক। প্রতিটি মানুষের ঘর হোক বইয়ের স্বর্গরাজ্য। স্মার্টফোন নয়, তরুণদের হাতে শোভা পাক বই।’