অ্যামাজনের আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল সরকারের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ

image

অ্যামাজন জঙ্গলের আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল সরকারের অদূরদর্শী ক্রিয়াকলাপ ও দেশটির প্রেসিডেন্ট জেইর বলসেনারোর পদত্যাগের দাবিতে ২৩ আগস্ট শুক্রবার বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ব্রাজিল দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন পরিবেশ রক্ষায় তৎপর অধিকার কর্মীরা। শুক্রবার প্যারিস, লন্ডন, মাদ্রিদ, বোগোতো, টরেন্টো ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন শহরের ব্রাজিল দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ করেন তারা। এসব বিক্ষোভ থেকে আগুন নিয়ন্ত্রনে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসেনারোকে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে শুক্রবার আগুন নিয়ন্ত্রণে অ্যামাজনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলসেনারো।

বিক্ষোভকারীরা জানান, অ্যামাজনকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করার সরকারি নীতির কারণেই আগুন লাগানোর মহোৎসব শুরু হয়েছে। অ্যামাজনে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব নেতা থেকে শুরু করে সেলিব্রেটিরাও আগুন নিয়ে ব্রাজিল সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। শুক্রবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ব্রাজিল দূতাবাসের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন শত শত পরিবেশবাদী। ইয়োথ ফর ক্লাইমেট নামে একটি গ্রুপ এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। ‘অ্যামাজনের জন্য প্রার্থনা’, ‘অ্যামাজন থাকুক, বলসোনারো সরে যাও’, ‘বন ছাড়া আমরা ধ্বংস হবো’সহ নানা ধরনের স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। অনেক বিক্ষোভকারী রক্তের আদলে রং মেখে বিক্ষোভে অংশ নেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টকে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয় ওই বিক্ষোভ থেকে। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরেও একই ধরণের বিক্ষোভ হয়। ব্রাজিলের আগুনের ছবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে বিক্ষোভকারীরা। অনেকেই ‘বয়কট ব্রাজিল’ লেখা প্রতীক হাতে নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেয়। লন্ডনে ব্রাজিল দূতাবাসের বাইরে জড়ো হয় পরিবেশবাদী গ্রুপ এক্সটিঙ্কশন রেবেলিয়ন-এর কর্মীরা। বলসোনারোকে অ্যামাজন জঙ্গল রক্ষার আহ্বান জানানো হয় ওই বিক্ষোভ থেকে। সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ায় ব্রাজিল দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভকারীরা গ্যাস মাস্ক পরে অবস্থান নেয়। ব্যানার নিয়ে অবস্থান নিয়ে রাস্তা আটকে দেয় তারা। অ্যামাজন বনাঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশের অবস্থান ব্রাজিলে। দেশটির প্রায় ৬৭ হেক্টরজুড়ে রয়েছে এ বনাঞ্চল। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া আর প্যারাগুয়েতেও ছড়িয়ে আছে এ বনাঞ্চল। আগুন মূলত ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাজিলের অংশে। সম্প্রতি দেশটির উগ্র ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসেনারো বলেন, ‘অ্যামাজনের আগুন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফলে এটি নিয়ে কারও নাক গলানো সহ্য করা হবে না।’ তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে শুক্রবার আগুন নিয়ন্ত্রণে অ্যামাজনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলসেনারো। আল-জাজিরা জানিয়েছে,বিশ্বব্যাপী নিন্দার মুখে ইতোমধ্যেই সেখানে সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট। ঠিক কবে নাগাদ সেনা মোতায়েন করা হবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানাননি তিনি। তবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিপূর্বে অ্যামাজনের সুরক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন বলসেনারো। রেকর্ড গতিতে প্রতিদিন পুড়ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত অ্যামাজন জঙ্গল। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্স (আইএনপিই) বলছে, চলতি বছর জুন পর্যন্ত ব্রাজিলে ৭২ হাজার ৮৪৩টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আগুনের ঘটনা অ্যামাজন জঙ্গলে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি।

হুমকিতে ইউরোপের সঙ্গে দক্ষিণ

আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি

তিন সপ্তাহ ধরে চলা ধারাবাহিক অগ্নিকা-ের কারণে হুমকির মুখে অ্যামাজনের অস্তিত্ব। এমন পরিস্থিতিতে সমগ্র বিশ্ব যখন উদ্বিগ্ন তখন ট্রাম্প-ভক্ত হিসেবে পরিচিত ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসেনারোর বিস্ফোরক মন্তব্যে হতবাক সমগ্র বিশ্ব। তিনি বলেন, অ্যামাজনের আগুন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফলে এটি নিয়ে কারও নাক গলানো তিনি সহ্য করবেন না। তার এমন মন্তব্য এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে জোরালো উদ্যোগ না নেয়ার জেরে হুমকিতে পড়েছে ইউরোপের সঙ্গে ব্রাজিল তথা দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি। অ্যামাজনের আগুন নেভাতে ব্রাজিল আরও উদ্যোগী না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা ব্লকের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্য চুক্তি আটকে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ড।

ইইউ-এর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার এ চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি। এতে দক্ষিণ আমেরিকা ব্লকে ব্রাজিল ছাড়া বাকি দেশগুলো হচ্ছে আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ে। দীর্ঘ ২০ বছরের আলোচনায় এ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর পর চুক্তিটি এখনও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে অ্যামাজনের আগুন নেভাতে ব্রাজিলের ভূমিকায় হতাশা নিয়ে চুক্তিটিতে অনুমোদন না দেয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ফ্রান্স এবং আয়ারল্যান্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য জার্মানিও অ্যামাজনের আগুন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, এ আগুন শুধু ব্রাজিল ও আক্রান্ত দেশগুলোর জন্যই নয়; বরং পুরো বিশ্বে জন্য হুমকি। আগুন নেভাতে ব্রাজিল সরকারের জোরালো তৎপরতা না থাকার প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশটির দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন পরিবেশ অধিকারকর্মীরা।