ইরানে গণতন্ত্র বিরোধী অভ্যুত্থান, বৃটিশ গোয়েন্দা ও ধামাচাপার ইতিবৃত্ত

image

ইরানে ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পেছনে একজন বৃটিশ গোয়েন্দার ভূমিকা নিয়ে খবর ছেপেছিলো ইংল্যান্ডের পত্রিকা। কিন্তু তা সেই সময় ধামাচাপা দেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী সেই অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। আর মূল কারিগর ছিলেন এমআইসিক্স এর নর্মান ডার্বিশায়ার নামে এক কর্মকর্তা।

ইরানের প্রথম নির্বাচিত সরকারপ্রধান মোহাম্মাদ মোসাদেঘকে সরিয়ে রেজা শাহ পাহলভিকে আবার সিংহাসনে বসানোই ছিল সেই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য। কেননা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ছিলেন ইরানের প্রথম গণতান্ত্রিক নেতা মোসাদেঘের বিরোধী। কারণ তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের তেল-স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিলেন।

তাই সিআইএ’র সহযোগিতায় মোসাদেঘকে উৎখাত করার পরিকল্পনা হয়। সেই মোতাবেক বিক্ষোভ সংঘটিত করা থেকে শুরু করে অপহরণ, নির্যাতনসহ অভ্যুত্থানের নামে যা যা হয়েছিল, তার জন্য অর্থ ঢালা হয়েছিল নর্মান ডার্বিশায়ারের হাত দিয়ে। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই অভ্যুত্থানে ডার্বিশায়ারের সেই ভূমিকার কথা জেনে যায় বৃটিশ পত্রিকা অবজারভার। তারা তার সাক্ষাৎকারসহ একটি প্রতিবেদন ছাপে ১৯৮৫ সালে। কিন্তু কদিনের মধ্যে সেই সংস্করণটি হাওয়া হয়ে যায়।

সেই অভ্যুত্থানে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা এবং সরকারি হস্তক্ষেপে তা কীভাবে চাপা দেওয়া হয়, তা নিয়ে ‘ক্যু ৫৩‘ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায় গত বছর, অভ্যুত্থানের ৬৭তম বার্ষিকীতে। বিশ্ববিখ্যাত চিত্রসম্পাদক ওয়াল্টার মার্চকে সঙ্গে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটি বানান ইরানীয় বংশোদ্ভুত যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা তাঘি আমিরানি, যিনি সেই ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে অসংখ্য আকর ঘেটেছেন, কথা বলেছেন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে।

বৃটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানকে আমিরানি বলেন, “আমরা জানি না কে বা কারা, কেনইবা, অবজারভারকে নর্মান ডার্বিশায়ার সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল। তবে আমরা জানি, তার সাক্ষাৎকারসহ প্রতিবেদনটি ছাপা হওয়ার পর পুরো সংস্করণটি গায়েব হয়ে গিয়েছিল এবং এর পর আর কেউ এ নিয়ে আর কোনো কিছু ছাপেনি। বোঝাই যায়, যুক্তরাজ্যের সরকার সেদিন কীভাবে পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়েছিল।”

অবজারভারে ১৯৮৫ সালের ২৬ মে প্রতিবেদনটি ছাপা হয়, যার শিরোনাম ছিল - ‘কীভাবে ইরানে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করেছিল এমআইসিক্স ও সিআইএ। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ডার্বিশায়ারকে নিয়ে আর না এগোতে সরকারের পক্ষ থেকে অবজারভারের তৎকালীন সম্পাদক ডোনাল্ড ট্রেলফোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রামাণ্যচিত্রটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে যুক্তরাজ্য অভ্যুত্থানটি সংঘটিত করে। তবে ‍সুনির্দিষ্টভাবে নর্মান ডার্বিশায়ারের ভূমিকা জানা যায় গবেষণার এক পর্যায়ে। প্রামাণ্যচিত্রটির পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন না।’

‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাও’ এবং ‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ চলচ্চিত্রের সম্পাদনা করা ওয়াল্টার মার্চের কথায়: ‘যখন আমরা প্রামাণ্যচিত্রের কাজ শুরু করি, আমরা ডার্বিশায়ার সম্পর্কে জানতামই না। কিন্তু তাঘি এটা বের করেছে। এটা আমাদের প্রামাণ্যচিত্রের পরিকল্পনায় ছিল না। আমরা ৫৩২ ঘন্টার সাক্ষাৎকার ঘেটে এই জিনিস বের করেছি।অ্যাপোক্যালিপ্সে আমি যত কাজ করেছি, তার দ্বিগুণ করতে হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রের জন্য।’

মজার বিষয় হচ্ছে ডার্বিশায়ারের একটি সাক্ষাৎকার আমিরানি পান আশির দশকের মধ্যভাগে বানানো ‘এন্ড অব এম্পায়ার’ নামে একটি সাড়া জাগানো প্রামাণ্যচিত্রের পরিত্যক্ত শ্রুতিলিখনের মধ্যে। সেখানে ডার্বিশায়ারকে বলতে দেখা যায়, “আমার নির্দেশনা ছিল খুবই সাধারণ। মাঠে নামো। রাষ্ট্রদূতকে জানানোর দরকার নেই। মোসাদেঘের উৎখাতে যত টাকা লাগে আমাদের কাছ থেকে নাও।”

তিনি বলেন, ‘১৫ লাখ পাউন্ড সেই সময়ে খরচ করেছি এর পেছনে। এবং আমি নিজে বিক্ষোভের নির্দেশনা দিয়েছি।’ তবে তার সেই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার কখনো প্রচারিত হয়নি। পরে আমিরানি এবং অন্যরা জানতে পারেন সরকারের হস্তক্ষেপেই ঐ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়নি।

প্রামাণ্যচিত্র ‘এন্ড অব এম্পায়ার’-এ ডার্বিশায়ারকে নিয়ে সিআইয়ের কর্মকর্তা স্টিফেন মীড বলেন, “খুবই দক্ষ একজন ব্যক্তি, যিনি ফরাসি ও ফারসি দুটিতেই অনর্গল কথা বলতে পারতেন।” প্রামাণ্যচিত্রে ইরানের তৎকালীন পুলিশ প্রধানের অপহরণ ও ঘটনাক্রমে তার নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকা তুলে ধরা হয়। এই ঘটনা বিশৃংখলার সুত্রপাতে ইন্ধন যোগায়। আর এরই ধারাবাহিকতায় আটক হন মোসাদেঘ।

নিজের ভূমিকা নিয়ে পরিত্যক্ত সাক্ষাৎকারে ডার্বিশায়ারকে বলতে দেখা যায়, ‘আমি ইরানি জনতার মনস্তত্ত্ব ধরতে পেরেছিলাম। আমি বুঝতাম ১৯২০ সালের পর থেকেই তাদের মধ্যে একটা বঞ্চনার অনুভূতি কাজ করতো। ’ডার্বিশায়ার মারা যান ১৯৯৩ সালে। ‘এন্ড অফ এম্পায়ারের’ গবেষক অ্যালিসন রুপার এবং প্রযোজক-পরিচালক মার্ক এ্যান্ডারসন বলেন ডার্বিশায়ারের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কোনো স্মৃতিই তাদের মনে নেই। প্রসঙ্গত, সেই সময় শাহ ইতালিতে নির্বাসনে ছিলেন। অভ্যুত্থানের পর তিনি ইরানে যান। সেসময় সিআইএ ও এমআইসিক্স এর মনোনীত জেনারেল ফেজলুল্লাহ জেহাদি ক্ষমতায়।

যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা পরিভাষায় ওই অভ্যুত্থানকে বলা হয় ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’। আর যুক্তরাজ্যে ‘অপারেশন বুটস’। শাহ এরপরে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত দেশ চালান। আমিরানি বলে, “এই অভ্যুত্থান ইরানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্কের ধারাই শুধু নির্ধারণ করে দেয়নি, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকেই বদলে দিয়েছিল।” “ভাবুন তো একবার সেখানে যদি গণতন্ত্র থাকতো,” বলেন আমিরানি।