ইরানের সঙ্গে ‘রাজনৈতিক’ সমাধানই আমার পছন্দ

image

বিশ্বের সব দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইরানকে ঠোকাতে না পারলে তেলের দাম ‘অভাবনীয় পর্যায়ে’ পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সৌদি যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন টেলিভিশন সিবিএসের এক অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘সামরিক’ নয়, ‘রাজনৈতিক’ সমাধানই আমার বেশি পছন্দ।

২৯ সেপ্টেম্বর রোববার সম্প্রচারিত মার্কিন টেলিভিশন সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারে সৌদির শাসক হিসেবে আবারও সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার ‘সম্পূর্ণ দায়’ তার নিজের বলে স্বীকার করলেও ওই হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ দেয়ার কথা সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন ক্রাউন প্রিন্স। সৌদির নির্বাসিত সাংবাদিক জামাল খাশোগি গত বছরের (২০১৮ সাল) ২ অক্টোবর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো সৌদির প্রভাবশালী এ যুবরাজ এ ঘটনার দায় স্বীকার করলেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে সংঘটিত খাশোগির ওই হত্যাকাণ্ড ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে যুবরাজ বিন সালমানের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তুরস্কসহ মুসলিম বিশ্বেও কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য যুবরাজ সালমানকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু ওই সময় রিয়াদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ট্রাম্প প্রশাসন তাকে নৈতিক সমর্থন দিলে হত্যাকাণ্ডটি ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা হারায়। এরই ধারবাহিকতায় সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার নেয়া এ সাক্ষাৎকারে ক্রাউন প্রিন্স সালমান বলেছেন, ‘বিশ্ব যদি ইরানকে নিবৃত্ত করতে দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, আমরা আরও উত্তেজনা দেখতে পাব, যা বিশ্বকেই হুমকিতে ফেলবে। তেল সরবরাহ বিঘিœত হবে এবং তেলের দাম জীবদ্দশায় দেখিনি এমন অকল্পনীয় আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছাবে।’ গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল শোধনাগারসহ দুটি তেল স্থাপনায় হামলায় ইরানের দায় নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পস্পেওর অবস্থানের সঙ্গে তিনি একমত বলেও এ সময় জানান যুবরাজ।

সাক্ষাৎকারে এমবিএস হিসেবে পরিচিত যুবরাজ সালমান জানান, তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। কেননা সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে কোন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে। তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান সামরিক উপায়ের চেয়ে বেশি ভালো।’ তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দেশটির প্রভাব বিস্তার রোধে ইরানের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক করা উচিত বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রুহানি ও ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক আয়োজনে ইউরোপের দেশগুলো চেষ্টা করলেও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগি হত্যাকাণ্ডের বর্ষপূর্তির কয়েকদিন আগে দেয়া এ সাক্ষাৎকারে ওই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও ওঠে আসে। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স বলেন, ‘একেবারেই নয়।’ তবে এ সময় হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াননি যুবরাজ সালমান। তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি সৌদি সরকারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা করেছে, তাই এর সম্পূর্ণ দায় নিচ্ছি আমি। এটা ভুল ছিল। ভবিষ্যতে যেন এরকম না হয়, সেজন্য অবশ্যই সব ধরনের পদক্ষেপ নেব আমি।’ তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগি হত্যার পর পশ্চিমা বিভিন্ন সরকার, এমনকি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের মূল্যায়নেও যুবরাজ সালমান ওই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে ধারণা দেয়া হয়। তবে সৌদি কর্মকর্তারা শুরু থেকেই হত্যাকাণ্ডে ক্রাউন প্রিন্সের কোন ধরনের ভূমিকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ প্রসঙ্গে রোববারের সাক্ষাৎকারে যুবরাজ সালমান বলেন, ‘অনেকেরই ধারণা, সৌদির সরকারের হয়ে কাজ করা ৩০ লাখ কর্মীর প্রতিদিনের কাজ সম্পর্কে আমার জানা উচিত। এটা অসম্ভব যে, ওই ৩০ লাখ কর্মী তাদের প্রতিদিনের কাজের প্রতিবেদন সৌদি সরকারের শীর্ষ বা দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তাকে পাঠাবেন।’ খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি আরবে তদন্ত চলছে জানিয়ে, দোষী প্রমাণিত হলে পদবী যাই হোক না কেন তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের ‘কেউই বাদ যাবে না’ বলে এ সময় নিশ্চিত করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, সৌদির বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সমালোচক খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রে বসবসরত সাংবাদিক জামাল খাশোগি গত বছরের ২ অক্টোবর তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকেই নিখোঁজ হন। প্রথম দিকে সৌদি খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার দায় অস্বীকার করে। তবে পরে তাকে কনস্যুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে বলে স্বীকার করে। এ ঘটনায় গোপনে ১১ সৌদি নাগরিকের বিচার শুরু হলেও মাত্র কয়েকটি শুনানি হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনেও খাশোগি খুনের ঘটনায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এবং জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।