করোনা মোকাবিলায় বিশ্বনেতা হয়ে উঠছে চীন!

image

ইতালিতে চিকিৎসাসেবা দিতে যাওয়া চীনের স্বাস্থ্যকর্মীরা-রয়টার্স

প্রায় তিন মাস আগে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে নভেল করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। হুবেইয়ের বাইরে দেশটির অন্য সব অঞ্চলে বুধবার সব মিলিয়ে মোট ৩৪ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছে এবং তাদের সবাই বিদেশ থেকে ভাইরাস নিয়ে এসেছেন। এদিন চীনের মূল ভূখণ্ডে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত কোন নতুন রোগী পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ১শ’ কোটি ৩৮ লাখ ৬০ হাজার জনগোষ্ঠীর (২০১৭ সালের সেনসাস অনুযায়ী ১.৩৮৬ বিলিয়ন) এ দেশটি মাত্র ৭২ দিনে এই প্রাণঘাতী মহামারীকে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। নিজ দেশের এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি পার করে এবার বিশ্বের কমপক্ষে ১৭৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়া এ মহামারীকে রুখতে বিভিন্ন দেশকে স্বাস্থ্য উপকরণ, চিকিৎসক ও অর্থ সহায়তা দেয়া শুরু করার মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যেই বেইজিং নতুন নজির সৃষ্টির পথে।

এমন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে কম্বোডিয়ায় করোনাভাইরাস পরীক্ষার সামগ্রী পাঠিয়েছে চীন। বিমান বোঝাই করে ইতালি ও ফ্রান্সে পাঠিয়েছে ভেন্টিলেটর, মাস্ক ও চিকিৎসাকর্মী। ইরান ও ইরাকে মোতায়েন করেছে চিকিৎসাকর্মী। বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, স্পেন এবং আরও কয়েকটি দেশকে দিয়েছে সহায়তার প্রতিশ্রুতি। গত কয়েক সপ্তাহে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি স্বস্তি দেয়ার মতো কথা বলেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে তিনি বলেছেন, ‘ঝড়ের পরেই ওঠে সূর্যালোক’। আরও বলেছেন, মহামারী ঠেকাতে দু’দেশের সহযোগিতা ও বিনিময় জোরালো করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীন বিশ্বনেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে এক বিশেষ প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান দাবি করেছে। নিজ দেশের সংকট কাটিয়ে ওঠার পর এখন বিশ্বজয়ের পথে রওনা দিচ্ছেন চীনের চিকিৎসাকর্মীরা। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে করোনাভাইরাস। জনবহুল এ দেশটিতে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে ১৮ মার্চ বুধবার পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ২৪৫ জনের। আক্রান্তের মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ৮০ হাজার ৯২৮ জনে। এর মধ্যে ৭০ হাজার ৪২০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের হিসাবে জানা গেছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে বেইজিং। উহানে বুধবার নতুন করে একজনও আক্রান্ত হয়নি। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্বে যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠছে এবং চীনা প্রভাব কঠোর নজরদারিতে রাখা হচ্ছে তখন জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ধীরে ধীরে বিশ্বের নেতা হয়ে উঠছে বেইজিং।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে চীনা নাগরিকরা। তথ্যের অপর্যাপ্ততা ও ভাইরাস মোকাবিলার ধীর গতির পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ দানা বাধতে থাকে দেশজুড়ে। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে চীনা নেতৃত্ব।

তবে অন্য ব্যক্তির সঙ্গত্যাগ (কোয়ারেন্টিন) ও সামাজিক শিষ্টাচার (সোশ্যাল ডিসটেন্স) প্রক্রিয়া জোরালো করার পর পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। গত সপ্তাহে ভাইরাস ঠেকানোয় প্রায় পূর্ণ সফলতার দাবি করেছে বেইজিং। অন্য দেশগুলোকে ভাইরাস মোকাবিলায় চীনের দেয়া সহায়ক ভূমিকার প্রশংসা করেছে দেশটির রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম। সিডনির লোয়ে ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কূটনীতিক নাতাশা কাসেম বলেন, ‘এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি চীনা কর্মকর্তারা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে মহামারী মোকাবিলায় বিশ্বকে প্রস্তুতি নেয়ার সময় দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানি চীনের অভ্যন্তরের প্রচারণা ম্যাকানিজম ইতিহাসের পুনর্লিখন করতে সক্ষম। কিন্তু আমরা এখন দেখতে পারছি বাইরের বিশ্বেও এখন তা সক্রিয় হচ্ছে। কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে চীনের জয় পুনর্লিখিত হয়েছে আর দেশটির কর্তৃপক্ষ বাইরের দেশেও সেই বার্তা পাঠানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মানবিক প্রচেষ্টা সত্যি হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে। চলতি সপ্তাহে ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্তের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে চীনের ‘বৈশ্বিক ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের’ আওতায় একটি ‘হেলথ সিল্ক রোড’ প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ উদ্যোগকে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা বলে সমালোচনা করে আসছে।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো নোয়াহ বারকিন বলেন, ‘ইউরোপিয়ান ও অন্য দেশগুলোকে চীন সহায়তা দেয়া নিয়ে ভুল কিছু নেই। বিশেষ করে নিজ দেশে তারা ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে (বেইজিং) এ সহায়তাকে প্রচারণার উপকরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে’।

নোয়াহ বারকিনের মতে, ইতালির মতো দেশগুলোকে সহায়তা দিতে চেয়ে বেইজিং ইউরোপীয় দেশগুলোর পরস্পরের প্রতি অসহযোগিতামূলক পরিস্থিতিকে সামনে আনতে চাইছে। বারকিন আরও বলেন, ‘ট্রাম্প যখন ইউরোপের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তখন চীন উদার, নিঃস্বার্থ বন্ধু’।

চীনের উদ্যোগ কাজে আসছে বলেও মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইগি দি মাইয়ো ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাতে চীন থেকে চিকিৎসাকর্মী ও সরঞ্জাম নিয়ে আসা বিমান দেখা গেছে। ওই পোস্টে তিনি বলেছেন, এ ধরনের সহায়তা পাঠানো প্রথম দেশ চীন। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুসিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি ‘ভাই ও বন্ধু শি জিন পিংকে’ বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, ‘একমাত্র যে দেশ আমাদের সহায়তা করতে পারে সেটি হলো চীন।’