গণহত্যা অস্বীকার করলেন সুচি

image

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বুধবার (১১ ডিসেম্বর) মায়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় মায়ানমারের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাখাইনে সংগঠিত গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে দেশটির শান্তিতে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি। বুধবার দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে সুচি বলেন, মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ‘অসম্পূর্ণ এবং বেঠিক’। তবে রাখাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ করা হতে পারে সৈন্যদের। মায়ানমারের সৈন্যরা যদি যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করা হবে উল্লেখ করে সু চি বলেন, এটিকে আন্তর্জাতিক করার কোন সুযোগ নেই। পাশাপাশি এ সংঘাত আরও গভীর করতে পারে এমন কিছু না করতে আইসিজের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এছাড়াও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মায়ানমার অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও আদালতকে তিনি জানান। মায়ানমারের দাবি রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তাই এর বিরুদ্ধে গাম্বিয়া নয় একমাত্র বাংলাদেশের মামলা করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মায়ানমারের এজেন্ট আইনজীবী উইলিয়াম স্ক্যাবাস বলেন, রাখাইনে গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার প্রমাণ থাকলেও গণকবরের প্রমাণ নেই। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে ঘটে যাওয়া নির্যাতন যে গণহত্যার উদ্দেশ্যেই ঘটানো হয়েছে তার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেনি গাম্বিয়া। এ কারণেই গাম্বিয়ার অভিযোগ ধোপে টিকবে না। গাম্বিয়াকে নামমাত্র অভিযোগকারী উল্লেখ করে মায়ানমারের আইনজীবীরা বলেন, রোহিঙ্গা ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হলে একমাত্র বাংলাদেশ হতে পারে আর কেউ নায়। অন্যদিকে সূর্য ওঠার আগেই মায়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সমর্থনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পিস প্যালেসের সামনে দেশটির নাগরিকরা সমবেত হন। শান্তিতে আটজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার স্বীকৃতি দিতে অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানান।

সু চি তার বক্তব্যের শুরুতে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদসমূহের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে আদালত সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণহত্যা সনদের বিধান রুয়ান্ডা ও সাবেক ইয়োগোস্লোভিয়ায় প্রয়োগ করা হয়নি। গাম্বিয়ার দাবিতে বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রশ্নে দেশের অভ্যন্তরে সামরিক-বেসামরিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সু চি প্রশ্ন তোলেন, যে রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে কোন ঘটনার তদন্ত ও বিচার করে এবং সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের সাজা দেয়, তাদের গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকতে পারে কিনা। ‘কাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হচ্ছে? যদিও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তবু আমি নিশ্চিত করতে চাই যে বেসামরিক নেতাদের ওপরও যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সু চি বলেন, মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি উপলব্ধি করা সহজ নয়, এবং ২০১৭ সালের আগস্টের ঘটনাবলী শুরু হয়েছিল যখন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আক্রমণ চালায়। তবে তিনি স্বীকার করেন, মায়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হয়তো মাত্রাতিরিক্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করে থাকতে পারে। যদি, মায়ানমারের সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করা হবে। অং সান সু চি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রধান বাসভূমি রাখাইন প্রদেশে গোলযোগের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর। নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের ‘দূর্দশা’র কথা আদালতে স্বীকার করেন তিনি। তবে শুনানিতে ২০১৭ সালে রক্তাক্ত সামরিক অভিযান বারবারই ‘অভ্যন্তরীণ সংক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। বলেছেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাব দিচ্ছিল মায়ানমার সেনাবাহিনী।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মায়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাকা-, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের বাস্তবতায় জীবন বাঁচাতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)-এ মামলা করে গাম্বিয়া। মামলায় নিজ দেশের আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি। মায়ানমারের পক্ষে অন্য যেসব আইনজীবী প্রতিনিধিত্ব করছেন তারা হলেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী ট টিন, যুক্তরাজ্যের এসেক্স চেম্বারসের ক্রিস্টোফার স্টকার, মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং মানবাধিকার বিষয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম সাবাস, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল ল’র অধ্যাপক ও কেনিয়ার হাইকোর্টের আইনজীবী মিস ফোবে ওকোয়া, হার্ভাডের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস জিমারম্যান এবং যুক্তরাজ্যের এসেক্স চেম্বারসের মিস ক্যাথেরিন ডবসন।

মায়ানমারের পক্ষে আইনজীবী এজেন্ট আদালতকে বলেন, গণহত্যার ব্যাখ্যা সংকীর্ণভাবে দেয়া হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে হয়। কিন্তু, আদালতে তেমন কিছু উপস্থাপন করা হয়নি। সাধারণ অপরাধকে গণহত্যা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে সে বিষয়ে বলা হচ্ছে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট অনুযায়ী। বলা হচ্ছে, এজন্যে মায়ানমার সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী। বলা হচ্ছে, রাখাইন রাজ্যে যা করা হয়েছে তা গণহত্যার শামিল। কিন্তু, তারা কোন রেফারেন্স দিতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মঙ্গলবার গাম্বিয়ার অভিযোগ উত্থাপনের সময় ১০ হাজার রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার যে তথ্য দেয়া হয়েছে সেটি সত্য নয় দাবি করে মায়ানমারের আইনজীবী বলেন, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনেও এই সংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য নেই। সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আর্সা) সংঘাতে নিহতদেরও গাম্বিয়া কথিত ১০ হাজার জনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের শুনানিতে মায়ানমারের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার গাম্বিয়াকে নামমাত্র অভিযোগকারী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আদালতে গাম্বিয়া আবেদন করলেও মূলত আবেদনটি করেছে ইসলামি সহযোগী সংস্থা (ওআইসি)। মামলার অর্থায়ন করছে ওআইসি। তার দাবি, গাম্বিয়া গত অক্টোবরে মায়ানমারকে কূটনৈতিক পত্র (নোট ভারবাল) দেয়ার এক সপ্তাহ আগেই ওআইসি আইনগত পদক্ষেপ শুরু করেছে। তিনি বলেন, মায়ানমারের ঘটনাবলিতে যদি কোন দেশ সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, সেটা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। গণহত্যার প্রশ্নে অন্য যেসব দেশ মামলা করেছে, তারা সবাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গাম্বিয়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয়।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ শুনানির দ্বিতীয় দিনে স্টকার এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ওআইসির ঢাকা ঘোষণায় ‘গণহত্যা বিশেষণ’ ব্যবহার করা হয়নি। এতে জাতিগত নির্মূলের কথা বলা হয়েছে।

ওআইসির প্রতিভূ হিসেবে গাম্বিয়া মামলা করায় বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারের আওতায় আসে না। ওআইসি ছাড়া আরও কারা অর্থায়ন করছে তা স্পষ্ট নয়। গাম্বিয়া আইসিজের বিধিমালাকে পাশ কাটানোর জন্য ওআইসির হয়ে মামলা করেছে। কেননা, সনদভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধের মামলা কেবল একটি রাষ্ট্রই করতে পারে, কোন সংস্থা বা জোট নয়। আদালতকে এই মামলা বিবেচনা করতে হলে বিরোধটি অবশ্যই মায়ানমার ও গাম্বিয়ার মধ্যে হতে হবে। গাম্বিয়ার অভিযোগ এবং বিরোধ ওআইসির তথ্যের ভিত্তিতে।

গাম্বিয়ার সঙ্গে বিরোধের ভিত্তি নেই দাবি করে তিনি বলেন, তথ্যানুসন্ধান দলের রিপোর্ট এবং ওআইসির প্রস্তাবের ভিত্তিতে মায়ানমারের কাছে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল, তা থেকে বিরোধ তৈরি হতে পারে না। ওই চিঠিতে মায়ানমারের প্রতি গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য যে দাবি জানানো হয়েছিল, তার জবাবের জন্য যতটা সময় অপেক্ষা করা হয়েছে, তা যথেষ্ট কি না প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ওই চিঠি থেকে কোন বিরোধের জন্ম হয় না।

প্রথম দিন মামলার বাদীপক্ষ গাম্বিয়া ও তাদের

রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে অং সান সু চির প্রতি মুহাম্মদ ইউনুসসহ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়েছেন এমন আটজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে গণহত্যার অপরাধ স্বীকারের আহ্বান।

নোবেল বিজয়ীরা এক বিবৃতিতে বলেন, সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি অং সান সু চির সংঘটিত ফৌজদারী অপরাধের জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করা উচিত।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই কারণে যে এসব অপরাধের নিন্দা না জানিয়ে অং সান সু চি বরং এটা সক্রিয়ভাবে অস্বীকার করছেন যে এ ধরনের অপরাধ আদৌ ঘটেছিল। দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি যুক্তি তুলে ধরেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শান্তির পক্ষের মানুষ হিসেবে আমরা অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তিনি যেন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলা বৈষম্য অবসানের ব্যবস্থা নেন এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ভূমির মালিকানা, চলাচলের অধিকার এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে কাজ করেন।

মুহাম্মদ ইউনুস ছাড়া অন্য যারা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন, তারা হলেন শিরিন এবাদি (ইরান-২০০৩), লেমাহ গবোয়ি (লাইবেরিয়া-২০১১), তাওয়াক্কল কারমান (ইয়েমেন-২০১১), মাইরিড মাগুয়ের (উত্তর আয়ারল্যান্ড-১৯৭৬), রিগোবার্তো মেনচু তুম (গুয়াতেমালা-১৯৯২), জোডি উইলিয়ামস (যুক্তরাষ্ট্র-১৯৯৭) ও কৈলাশ সত্যার্থি (ভারত-২০০৬)।