তৃতীয় ধাপে পরমাণু চুক্তি থেকে সরছে ইরান

image

২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে ইরান আরও এক ধাপ সরে যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে তেহরান। তৃতীয় ধাপে পরমাণু চুক্তির প্রতিশ্রুতি শিথিলের উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে ষষ্ঠ প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ মেশিন সন্নিবেশ করেছে ইরানের পরমাণু সংস্থা এইওআই। ১৯ আগস্ট সোমবার এইওআই’র বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো এ তথ্য জানায়। এদিকে নতুন পরমাণু চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাভেদ জারিফ। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করলে এ মন্তব্য করেন জারিফ।

এইওআই’র প্রধান আলি আকবর সালেহি জানান, তার প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পর্যায়ে পরমাণু চুক্তির কিছু প্রতিশ্রুতি শিথিলে প্রস্তুত। ১৮ আগস্ট রোববার সালেহির বরাত দিয়ে ইরান ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম তাসনিমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমপি হোসেইন নাকাভি বলেন, জেসিপিওএ পর্যবেক্ষক দল দুই সপ্তাহ আগেই বেশ কিছু প্রস্তাবসহ তৃতীয় ধাপে চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে দেখা করেছে। সালেহি আরও বলেন, এরই মধ্যে এইওআই নতুন করে প্রায় ২০টি আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজ মেশিন তৈরি করেছে। যদি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলো চুক্তি অনুসারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করে, তবে যে কোন সময় তারা পূর্বের পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসবেন। এছাড়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরানবাসী আরাক পরমাণু কেন্দ্র থেকে ‘সুসংবাদ’ পাবে বলেও জানান সালেহি।

আপরদিকে, সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলে, একটি নতুন পরমাণু চুক্তিতে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে মোটেই আগ্রহী নয় ইরান। এর আগের চুক্তি করতে আমরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। পরে তারাই আলোচনার টেবিল থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরান ২০১৫ সালে যে পরমাণু চুক্তি করে ওয়াশিংটন তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পর জারিফ তার দেশের এমন অবস্থান তুলে ধরলেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবে ওই পরমাণু চুক্তি অনুমোদিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজে ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কাজেই মার্কিন সরকারকে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে ওই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করে পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসতে হবে। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই তিন ইউরোপীয় দেশ ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ে তাকে এসব দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। ইতোমধ্যে ফিনল্যান্ড থেকে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর আগে পরমাণু চুক্তি শিথিল করে ইউরেনিয়ামের মজুদ সীমা ৩০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৩৭০ কেজিতে উন্নীত করে ইরান। এসব ইউরেনিয়ামের মাত্রা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামীতে ইউরেনিয়াম উপাদনের মাত্রা বাড়াতে দেশটি এখন নিজেদের প্রযুক্তিতে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ মেশিন তৈরি করছে। ২০১৫ সালে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া এবং জার্মানি পারমাণবিক চুক্তি করেছিল ইরানের সঙ্গে। বারাক ওবামা যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন সে সময় ইরানের সঙ্গে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো পরমাণু চুক্তি করে। সে চুক্তির মূল বিষয় ছিল, ইরান পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন ইরানের যে কোন পরমাণু স্থাপনায় যে কোন সময় পরিদর্শন করতে পারবে।

অর্থাৎ ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানকে নজরদারির মধ্যে রাখতে পারবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়া হয়। কিন্তু ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আবার নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছেন ইরানের ওপর। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরষ্ট্রে যাতে সরে না যায় সেজন্য ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি গত বেশ কিছুদিন ধরে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মিত্র দেশগুলোর আহ্বানে কোন গুরুত্ব না দিয়ে ইরান পরমাণু শক্তি থেকে সরে যান ট্রাম্প।