পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার পথে সৌদি-ইরান

image

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরান। দেশ দুটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ৫ অক্টোবর শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে দু’দিনের সফরে (১৯ ও ২০সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব যান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এ সময় রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে তাকে অনুরোধ করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস নামে পরিচিত)। যুবরাজ ইমরান খানকে বলেন, ‘আমি যুদ্ধ এড়াতে চাই।’ নিউইয়র্কে সাম্প্রতিক জাতিসংঘ ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনের পার্শ্ববৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান। রিয়াদের পক্ষ থেকে ইরানি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে ইরাককেও অনুরোধ করা হয়েছে। গত মাসের ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি তেল স্থাপনায় হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে রিয়াদ। ওই হামলার পর সৌদি আরবের তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। এরপরই ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে পাকিস্তান ও ইরাকের শরণাপন্ন হন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওই তেল স্থাপনায় ১৪ সেপ্টেম্বরের হামলায় ঘটনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দায় স্বীকার করলেও শুরু থেকেই এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে আসছে সৌদি আরব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয় রিয়াদ। কিন্তু দৃশ্যত রিয়াদের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরপরই নড়েচড়ে বসেন সৌদি যুবরাজ। মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে এক রকম বাধ্য হন তিনি। সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের বিষয়ে রিয়াদের সাধারণ মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি রিয়াদের আত্মবিশ্বাস ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে বিগত কয়েক দশকের কৌশলগত বিন্যাসের ভিত্তিস্বরূপ। কিন্তু বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েও ইরানের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে না পেরে দৃশ্যত হতাশ সৌদি। নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটনই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের বিষয়ে মুসলিম বিশ্বের উদ্বেগ সত্ত্বেও বরাবরই তার প্রতি আগ্রহ ছিল রিয়াদের। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মধ্যেই ট্রাম্পকে ‘মুসলিমদের সত্যিকারের বন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন সৌদির বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এর আগে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ট্রাম্পের অভূতপূর্ব আগ্রহ রয়েছে। তিনি মুসলিমদের সত্যিকারের বন্ধু। তার অভিবাসন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু ইসলাম-এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

ট্রাম্পের কথিত শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে সৌদি যুবরাজ প্যালেস্টাইনের প্রতিও তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিলেন বলে খবর প্রকাশ হয়। কিন্তু এখন আক্রান্ত হওয়ার পরও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনকে কাছে না পেয়ে রিয়াদকে সংকটের নিজস্ব সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। রিয়াদের পক্ষ থেকে নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার বিষয়ে সৌদির পক্ষ থেকে পাকিস্তান ও ইসলামাবাদের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সরাসরি যুবরাজ এমবিএস এ অনুরোধ করেছেন বলে যে খবর বেরিয়েছে তা অস্বীকার করেছে রিয়াদ। তবে ইরানের পক্ষ থেকেবলা হচ্ছে, তাদের দিক থেকে আলোচনার বিষয়ে কোনও আপত্তি নেই। এ ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান উন্মুক্ত। সম্প্রতি সৌদি-ইরান আরোচনার বিষয়ে সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেন ইরানের স্পিকার আলী লারিজানি।

তিনি বলেন, সৌদি আরব এবং এ অঞ্চলের অন্য দেশের সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে ইরান দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। ইরান-সৌদি সম্পর্ক এ অঞ্চলের নিরাপত্তাগত ও রাজনৈতিক বহু সমস্যা সমাধানে সক্ষম। এর আগে গত সপ্তাহে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল মাহদী আল-জাজিরাকে জানান, তার বিশ্বাস তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনার পারদ কমিয়ে আনতে চাইছে রিয়াদ। আবদুল মাহদী আরও বলেন, প্রত্যেকেই আলোচনা বিষয়ে আগ্রহী। তবে ইরান বলছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে তারা আলোচনায় আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রও আলোচনার কথা বলছে। সৌদি আরবও আলোচনার দ্বার বন্ধ করে দেয়নি। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা।