বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক নির্বাচন : ভারতে ভাগ্য নির্ধারণী লড়াই

১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার থেকে ভারতজুড়ে শুরু হচ্ছে ১৭তম লোকসভা নির্বাচন। বিশ্বে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের রোলমডেল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটিতে এবার সাত দফায় ভোটগ্রহণ হবে। ফল প্রকাশিত হবে ২৩ মে। দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে প্রভাবশালী নেতা নরেন্দ্র মোদি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিরোধী কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএর সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দলগুলোর জোট এবারের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোটকে খুব সহজে ছাড় দেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ নির্বাচনী যজ্ঞ কয়েক মাস আগে যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে ১০ এপ্রিল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে বার্তা সংস্থাটি। ভারতীয় কৃষকদের পড়তি আয় ও বেকারত্ব দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জনসমর্থনে লাগাম টেনে ধরতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে হওয়া সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি জোটই আবারও ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে আভাস দেয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’দের স্লোগান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গড়ার লক্ষ্যে লড়ছেন। আর কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রাহুল গান্ধী দেশটির সাধারণ জনগণের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দিল্লির ক্ষমতায় বসতে চান। ২০১৯ সালের এ সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি বনাম কংগ্রেসের লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র হতে চলেছে এটিই। বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ২০টি রাজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গের দুটি লোকসভা কেন্দ্রেও ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে একটি হলো আলিপুরদুয়ার আর অন্যটি কোচবিহার। আলিপুরদুয়ারে ১ হাজার ৮৩৪টি বুথে ভোটগ্রহণ হবে প্রথম দফায়। এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হবে তৃণমূল প্রার্থী দশরথ তিরকে, আরএসপি প্রার্থী মিলি ওঁরাও, বিজেপি প্রার্থী জন বারলা ও কংগ্রেস প্রার্থী মোহনলাল বসুমাতার মধ্যে। এছাড়া আরও দুই প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত জয়ন্ত কিন্দো ও এসইউসিআইয়ের রবিচন রাভা। আলিপুরদুয়ারে ২০১৪ সালে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৫৩টি ভোট পেয়ে জয় পান তৃণমূল কংগ্রেসের দশরথ তিরকে। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির (আরএসপি) মনোহর তিরকে। তিনি পান ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫৬টি ভোট। ১৯৭৭ সালে জন্ম হয় আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রের। ওই বছর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আলিপুরদুয়ার ছিল আরএসপির একচেটিয়া আসন। গতবারের দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মনোহর তিরকে কুমারগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের ২০০১, ২০০৬ ও ২০১১ সালের বিধায়ক। তিনি আরএসপির দাপুটে নেতা। তবে এবার আরএসপির প্রার্থী মিলি ওঁরাও। ১ হাজার ৮৩টি বুথে ভোট হবে আলিপুরদুয়ারে। এ লোকসভা কেন্দ্র মোট সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। এগুলো হলো কালচিনি, তুফানগঞ্জ, আলিপুরদুয়ার, মাদারিহাট, ফালাকাটা, কুমারগ্রাম ও নাগরাকাটা।

আর পশ্চিমবঙ্গের আরেক জেলা কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে ভোটে মূল লড়াই হবে তৃণমূল প্রার্থী পরেশ অধিকারী, বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক, কংগ্রেস প্রার্থী পিয়া রায়চৌধুরী ও ফরওয়ার্ড ব্লকের গোবিন্দচন্দ্র রায়ের মধ্যে। মোট বুথের সংখ্যা ২ হাজার ১০। ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ কেন্দ্রের টানা বিজয়ী ছিল ফরওয়ার্ড ব্লক। ২০১৪ সালে জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৬ সালের উপনির্বাচনেও এ কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসই জয়লাভ করে। এ উপনির্বাচনে জয়ী হন তৃণমূলের পার্থপ্রতীম রায়। ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৫টি ভোট পান তিনি। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন বিজেপির হেমচাঁদ। তিনি পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৮১ হাজার ১৩৪টি ভোট। ১৯৫১ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এ কেন্দ্র ছিল কংগ্রেসের। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত এ কেন্দ্রটি ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এ কেন্দ্র আবারও কংগ্রেসের দখলে ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এ কেন্দ্রটি ফের ফরওয়ার্ড ব্লকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ কেন্দ্রের টানা বিজয়ী ছিল ফরওয়ার্ড ব্লক।

এবারের ভাগ্য নির্ধারণী লোকসভা নির্বাচনে এ জেলায় নির্বাচনীর প্রচারে এসেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

এ সপ্তদশ নির্বাচনে দেশটির নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে, প্রায় ৯০ কোটি ভোটার এবার ভোট দেবেন। এর মধ্যে নতুন ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৩৫ বা এর থেকে কম। ১৮-১৯ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা দেড় কোটির কাছাকাছি। গতবারের থেকে এবার ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। বিভিন্ন জরিপ থেকে জানা গেছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে খরচ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন। বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে সপ্তম ভারতের ভোট অংশ নিচ্ছে প্রায় ২ হাজার (১ হাজার ৮৪১টি দল) রাজনৈতিক দল এবং মোট প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এবার সারা দেশে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি কেন্দ্রে ভোট নেয়া হবে। ২০১৪ সালে দেশটির ৫৪৩ আসনের মধ্যে ২৮২টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিজেপি। আর পরাজিত হয় কংগ্রেস।

এ লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এত বড় নির্বাচন এর আগে আর কখনো হয়নি। কাল এক দফায় অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের বিধানসভায় ভোট হবে। উড়িষ্যায় বিধানসভা ভোট হবে চার দফায়। এবারের লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন দেশের প্রায় ৯০ কোটি ভোটার।

সাত দফার এ নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হবে ১১ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), মোট আসন ৯১টি; দ্বিতীয় দফার ১৮ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), মোট আসন ৯৭টি; তৃতীয় দফার ২৩ এপ্রিল (মঙ্গলবার), মোট আসন ১১৫টি; চতুর্থ দফার ২৯ এপ্রিল (সোমবার), মোট আসন ৭১টি; পঞ্চম দফার ৬ মে (সোমবার), মোট আসন ৫১টি; ষষ্ঠ দফার ১২ মে (রবিবার), মোট আসন ৫৯ ও সপ্তম দফার ১৯ মে (রোববার) মোট আসন ৫৯টি।