মুরসির মৃত্যু নিয়ে ‘রাজনীতিকরণ’ করছে জাতিসংঘ : মিসর

image

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘ ‘রাজনীতিকরণ’ করছে বলে অভিযোগ তুলেছে মিসরীয় সরকার। মুরসির ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হয়েছে দাবি করে ১৯ জুন বুধবার তারা জানায়, জাতিসংঘের অভিযোগ একদমই ভিত্তিহীন। এর আগের দিন (মঙ্গলবার) এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ।

দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই মিসরীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন দেশটির প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সাবেক এ প্রেসিডেন্ট। মুরসিকে গ্রেফতার করে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও কাতারের কাছে রাষ্ট্রীয় তথ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আদালতের মুখোমুখি করা হয়। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনি মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাসের কাছে তথ্য পাচারেরও অভিযোগ আনা হয়। ২০১৬ সালের জুনে তথ্য পাচারের মামলায় মুরসিকে দোষী সাব্যস্ত করে নিম্ন আদালত। দেশের গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের অভিযোগে মুরসিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। এদিকে মুরসির মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসংঘের তদন্তের দাবির জবাবে এক বিবৃতিতে সংস্থাটির এমন পদক্ষেপের ‘নিন্দা’ জানিয়েছেন মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমেদ হাফেজ। তার দাবি, ‘এটা স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল।’ তিনি বলেন, মিসরের রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও বিচারিক বিশুদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে জাতিসংঘ। কোনরকম ষড়যন্ত্রের অভিযোগ একদম ভিত্তিহীন। গত ৭ মে আদালতে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মুরসি বলেন, তার জীবন হুমকির মুখে। তার পরিবারও অনেক দিন ধরেই কারাগারে মুরসির বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই মিসর যেন তাদের কারাবন্দিদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে এমন আহ্বান জানানো হয়। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, আটকাবস্থায় মুরসিকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে কিনা, পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের যথেষ্ট সুযোগ ছিল কিনা- এসব বিষয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এছাড়াও তাকে অনেকদিন ধরেই নির্জন কারাবাসে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে মুরসির মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানিয়ে গত ছয় বছর ধরে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মুরসির চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত নথি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয় মঙ্গলবার। মুরসিকে কারাগারে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্য সুবিধা দেয়া হয়েছে কি না-তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা। ছয় বছরের কারাবাসে দিনে ২৩ ঘণ্টা নির্জন কারাগারই ছিল মুরসির ঠিকানা। দিনে শুধু একবার এক ঘণ্টা হাঁটাহাঁটির সুযোগ দেয়া হতো তাকে। ছয় বছরে মাত্র তিনবার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের (২০১৮ সালে শেষ দেখা হয়) সুযোগ পান মুরসি। গত ৭ মে আদালতে হাজিরার সময় তিনি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তার জীবন হুমকির মুখে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন মুরসির মৃত্যু হলে মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আদালতের এজলাসে হঠাৎ পড়ে গিয়ে’ মুরসির মৃত্যু হয়েছে। এ সময় তার পরিবারের পক্ষ থেকে এজলাসের খাঁচায় বিনা চিকিৎসায় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। সরকারের দাবি, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকরা মুরসিকে মৃত ঘোষণা করেন। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র রুপার্ট কোলভিল এক বিবৃতিতে বলেছেন, আটকাবস্থায় মুরসিকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে কিনা, পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের যথেষ্ট সুযোগ ছিল কিনা- এসব বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া তাকে অনেকদিন ধরেই নির্জন কারাবাসে রাখার অভিযোগও রয়েছে। রুপার্ট আরও বলেন, মুরসির মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে বিচার বিভাগীয় কিংবা অন্য কোন স্বাধীন কর্তৃপক্ষকে নিয়োগ দেয়া উচিত। এর আগে সোমবার তার মৃত্যু নিয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

দেশটির নিষিদ্ধ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) নেতা মুরসি দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। ২০১১ সালে আরব বসন্তের হাত ধরে আসা এক গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক পদচ্যুত হন। পরের বছরেই নির্বাচনে জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসেন মুরসি। তামারুদ নামের একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে সাজানো এক বিক্ষোভ আয়োজন করে ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুরসির হাতে সেনাপ্রধান হওয়া আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ক্ষমতায় বসেন। এদিকে ছয় বছরের কারাবাসে থাকায় দীর্ঘদিন থেকে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারজনিত রোগে ভুগছিলেন মুরসি। কিন্তু কারাবন্দী এ রাজনীতিককে যথাযথ চিকিৎসা নিতে না দিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় সামরিক জান্তা। মৃত্যুর পর মুরসির দাফনেও বাধা দেয়া হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে দাফনের আবেদন জানালে তা নাকচ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৮ জুন মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোরে কঠোর গোপনীয়তায় রাজধানী কায়রোর নসর এলাকায় তাকে দাফন করা হয়। সেখানে পরিবারের সদস্য ও মুরসির দুই আইনজীবী ছাড়া কাউকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। শুধু জানাজা, দাফনে বাধা দেয়াই নয় বরং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও পরিবারের সদস্যদের দেখাতে অস্বীকৃতি জানায় কর্তৃপক্ষ।