রুশ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

image

রাশিয়ার তৈরি করোনা ভাইরাসের টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে দেখবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও)। রাশিয়া ভ্যাকসিন দ্রুত অনুমোদন দেওয়ার পর গত বুধবার এক বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) বলেছে, ভ্যাকসিন পরীক্ষার সকল দিক খতিয়ে দেখতে তারা রুশ বিজ্ঞানী ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার রাশিয়াকে ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভ্যাকসিন যাদের উপর প্রয়োগ করা হয়েছে তাদের সকলের স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে সংস্থাটি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও বলছে, সংস্থাটি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরি ও গবেষণার সকল অগ্রগতিকে স্বাগত জানাচ্ছে। বর্তমানে ৬টি দেশ ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। বিশ্বে মানব শরীরে পরীক্ষা চলছে ২৮টি’র বেশি ভ্যাকসিনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৬টি ভ্যাকসিন ট্রায়ালের একেবারে চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে যে ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হয়েছে সেটি ডব্লিওএইচও ঘোষিত ২৮টির তালিকায় রয়েছে। কিন্তু ট্রায়ালের একেবারে প্রথম ধাপে তালিকাভুক্ত হয়েছে রুশ ভ্যাকসিনটি। তারপরও ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দেয়া হয় অতি দ্রুত।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলছেন, রুশ ভ্যাকসিনটি বিশ্বের প্রথম করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন। এটা নিরাপদ ও কার্যকর । তার মেয়ের উপরও এট প্রয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরোস্ক বলেছেন, হাজারো লোকের উপর এর পরীক্ষা হয়েছে সুতরাং এটি নিরাপদ। রাশিয়ার রাজনীতি ও ব্যবসার সাথে জড়িত ক্ষমতাধর অভিজাত শ্রেনীর কয়েকশো ব্যক্তিও এই ভ্যাকসিনটি গ্রহন করেছেন এবং ভ্যাকসিনটিকে নিরাপদ বলছেন।

এদিকে রাশিয়া তার তৈরি ভ্যাকসিন দ্রুত অনুমোদন দেয়ায় বিশ্বজুড়ে অনেক বিশেষজ্ঞরাই একে সন্দেহের চোখে দেখছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ এবং ‘ওনিল ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল এন্ড গ্লোবাল হেলথ ল’ এর পরিচালক লরেন্স ও. গস্টিন বলেন, জন-স্বাস্থ্যকে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং জাতীয়তাবাদী দম্ভ হতে দূরে রাখতে হবে। পুতিন মনে করছেন তিনি ভ্যাকসিন তৈরীর প্রতিযোগিতায় জিতে গেছেন। তার এই কার্যক্রমটি দুর্বিনত,বাধাহীন ও ভয়ংকর। তিনি (পুতিন ) রাশিয়ার মানুষদের স্বাস্থ্য ও নিরপত্তা নিয়ে জুয়া খেলছেন। তিনি চিকিৎসা-বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক মানদন্ড ও নৈতিকতা ভঙ্গ করছেন। কোন ভ্যাকসিন প্রয়োগের আগে সেটাকে কার্যকর ও নিরাপদ হিসাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস্টিয়ান লিন্ডমেয়ার জেনেভায় জাতিসংঘের এক আয়োজনে বলেছেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা ও চর্চা আছে। টিকা খুঁজে পাওয়া বা টিকা কীভাবে কাজ করে, তা জানা ও টিকা তৈরির সব কটি ধাপের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

রাশিয়ার মস্কোর গামেলিয়া ইনস্টিটিউটে তৈরী করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন অভিমত দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পশ্চিমা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারাও মন্তব্য করছেন। খোদ রাশিয়াতেও ভ্যাকসিনটি সম্পর্কে ইতিবাচক নেতিবাচক মন্তব্য করছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মহামারী ও অনুজীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিখ্যাত স্বাস্থ্য আইন গবেষক গ্রেগ গনজালভেজ বলেন, মস্কোর গামেলিয়া ইনস্টিটিউটে তৈরী করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিনটি রাশিয়ার জনগনকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলেছে। ভ্যাকসিনটি শক্তিমান রাষ্ট্রনায়ক পুতিনের চাপের কারনেই দ্রুত অনুমোদন ও প্রয়োগ করার কথা ভাবছে দেশটি। পুতিন কারো কথা শুনছেন না কারন তার কাছে রাশিয়ার জনগনের জীবনের মূল্য নেই।পুতিন এই ভ্যাকসিনটিকে বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন বলছেন,যা সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানীদের নিকট উপহাসের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।এটা রাশিয়া বিরোধী প্রচারনা বা হিংসাত্মক বিষয় নয়।মূলত,এই ভ্যাকসিনটি সঠিক ভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।অতীতে দেখা গেছে সঠিক পন্থায় ঔষধ তৈরী না হলে তা স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয় নিয়ে আসে।’ পশ্চিমা গনমাধ্যমগুলো বলছে, রুশ ভ্যাকসিনটি তৈরীতে সঠিক বৈজ্ঞানিক নীতিগুলোকে ভঙ্গ করা হয়েছে। সরকারের চাপের কারনে দ্রুত এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারাও রাশিয়ার মস্কোর গামেলিয়া ইনস্টিটিউটে তৈরী করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি রদ্রিগো দুতার্তে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন রুশ ভ্যাকসিনটি মানবতার কল্যানে তৈরী হয়েছে এবং তিনি এই ভ্যাকসিনটি দেশের প্রথম ব্যক্তি হিষাবে গ্রহন করতে চান। দুতার্তের মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান , দুতার্তে ব্যাপারটি নিয়ে সিরিয়াস। দরকার পরলে যে তিনি জনগনের জন্য জীবন দিতে পারেন তারই প্রমান এটি।

খোদ রাশিয়াতেও ভ্যাকসিনটি সম্পর্কে ইতিবাচক নেতিবাচক বিভিন্ন মন্তব্য করছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা ভেলেন্টিনা কোসেনকো বলছেন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী এই ভ্যাকসিনটি শরীরে নিয়েছেন তাদের মধ্যে খারাপ কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

এদিকে বিভিন্ন রুশ বিজ্ঞনী ভ্যাকসিনটির পক্ষে ইতিবাচক ধারনা পোষন করছেন এবং এটা শরীরে নিয়েছেন। গ্যমেলিয়ার প্রধান ও বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গিন্টসবার্গ ও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এই ভ্যাকসিন নিয়েছেন। রাশিয়ার আরডিআইএফ এর প্রধান দিমিত্রিয়েভ এবং তার পরিবার এই টিকা শরীরে নিয়েছেন। অপরদিকে, রাশিয়ার ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যাদের শরীরে করোনার এন্টিবডি আছে তাদের জন্য ভ্যাকসিনটি বিপদজনক। রাশিয়ার বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট আলেকজান্ডার চিপুরনভও একই বক্তব্য দিয়েছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক ক্লিনিকাল ট্রায়াল সংস্থা-একটো’র মতে ভ্যাকসিনটির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার আগে রাশিয়াকে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার উপর জোর দিতে বলছে।