সীমান্তে শক্তি বাড়ানোর দৌড়ে ভারত ও চীন

image

হিমালয় পর্বতমালায় বিবদমান সীমান্তজুড়ে পাল্লা দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছে ভারত ও চীন। দুই দেশই এ ক্ষেত্রে একে অন্যকে টেক্কা দিতে চাইছে।

গত মাসে এই দুদেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হয়। তার পেছনেও অন্যতম কারণ ছিল এটা।

সেখানে লাদাখে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০০ মিটার উচুতে পাহাড়ের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে উচু বিমান ঘাঁটি তৈরি করেছে ভারত। সেই ঘাঁটিতে যেতে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বানানো ২৫৫ কিলোমিটার দারবুক-শায়ক-দৌলত বেগ ওল্ডি সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয় গত বছর। প্রায় দুই দশক ধরে চলে এর নির্মাণকাজ।

রাস্তা হয়ে যাওয়ার পর এখন ওই বিমান ঘাঁটিতে যে কোনো সময় দ্রুত শক্তি সমাবেশ করতে পারবে ভারত।

ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৩,৫০০ কিলোমিটার। কিন্তু কখনোই এই সীমান্ত চূড়ান্ত করা হয়নি। এ নিয়ে পার্বত্য, বন্ধুর এই অঞ্চলে বহুবার মুখোমুখি হয়েছে দেশ দুটোর সেনাবাহিনী। দুই পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশীর রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সেনাবাহিনী।

গত ১৫ জুন তাদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়, তার উত্তেজনা সহসাই প্রশমিত হবে বলে মনে হচ্ছে না বলে জানাচ্ছে বিবিসি।

দুই দেশ সীমান্ত এলাকায় তাদের নিজস্ব সড়ক, রেল যোগাযোগ ও বিমানঘাটি স্থাপনের পাশাপাশি তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোর আধুনিকায়নে ব্যাপক অর্থ ও জনবল বিনিয়োগ করেছে। প্রত্যেকেই বছরের পর বছর ধরনে স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছে।

যখন এক দেশ কোনো স্থাপনা তৈরি করে, তখনই আরেক দেশ ক্ষেপে যায়। কেননা যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ হলেই আরেক দেশ মনে করে এটা করা হয়েছে কৌশলগত সুবিধার জন্য। এ কারণেই সম্প্রতি ভারতের রাস্তা বানানো নিয়ে ক্ষেপে যায় চীন।

এর আগে ২০১৭ সালে দোকলাম মালভূমিতে যে সংঘর্ষ হয়েছিল তাও রাস্তা বানানো নিয়েই। সেবার ভারত, চীন ও ভুটানের মধ্যকার একটা সংযোগস্থলের কাছে একটি রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল চীন।

চীনকে ছুঁতে ভারতের দৌড়

ভারতের লাদাখে দৌলত বেগ ওল্ডি বিমান ঘাঁটি সচল করা হয় ২০০৮ সালে। আর নতুন সড়কটি একে সংযুক্ত করবে রাজ্যের রাজধানী লেহর সঙ্গে। যে কোনো আবহাওয়ায় চলাচলের উপযোগী এই রাস্তাটি কারাকোরাম থেকে ২০ কিলোমিাটর দূরে, আর ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে দুই দেশের মধ্যে যে সীমান্ত কল্পনা করা হয় তার সমান্তরালে নির্মিত হয়েছে।

রাস্তাটি হওয়ার কারণে যন্ত্রপাতি নেওয়া সহজ হয়ে গেছে। এর আগে ওই বিমানঘাটিতে সড়ক পথে যাওয়া যেতো না। সৈন্যবাহিনী বা মালপত্র সবই নিতে হতো হেলিকপ্টারে। তা এখনকার মতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ছিল না। ফলে মালপত্র, রসদ, যন্ত্রপাতি – যা কিছুই নেওয়া হতো, তা সেখানে থেকেই নষ্ট হতো। এখন সেগুলো খুব দ্রুত, সহজে সেখানে পরিবহন সম্ভব হবে।

এর পাশাপাশি আরো রাস্তা তৈরি হচ্ছে রসদ সরবরাহস্থলের সঙ্গে সেনাদের যোগাযোগ সহজ করতে। ফলে সেখানে নিয়াজিত সৈন্যরা সহজেই চীন অভিমুখে এগিয়ে যেতে পারবে। আরো সহজে কৌশলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবে তারা।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর ভারত এ এলাকায় অবকাঠোমো নির্মাণের গতি আরো বাড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এ কারণে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরখণ্ডে চীনের সীমান্তে রাস্তা তৈরির কাজে ঝাড়খণ্ড থেকে ১২ হাজার শ্রমিক নিয়োগ করেছে।

বহু বছর ধরে সীমান্ত এলাকাগুলো অবহেলিত ছিল ভারতের। এদিকে চীন অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণে অনেক এগিয়ে গেছে। ফলে চীনের সেনাদের সেখানে কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়ে গেছে। এখন ভারত চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে। সেখানে সড়কের পাশাপাশি একটা রেলসংযোগ স্থাপনের কাজও শুরু করছে ভারত।

এছাড়া কৌশলগত দিক বিবেচেনায় ৭৩টি রাস্তা ও ১২৫টি সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে ভারত। তবে সেগুলোর বাস্তবায়নের গতি এখনো খুবই ধীর। এগুলোর মধ্যে সবেমাত্র ৩৫টার কাজ শেষ হয়েছে। এ বছরের শেষের দিকে ১১টি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এর বাইরে ভারতের সেনাবাহিনীর ভারী সমরাস্ত্র পরিবহনের সুবিধার্থে সীমান্ত এলাকায় ১১টি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে ।

বর্তমানে এ অঞ্চলে ২৫টি বিমান ঘাঁটি আছে ভারতের। এখানে কৌশলগত দিক বিবেচনায় বিমান ওঠানামার আধুনিক সুবিধাসহ আরো ঘাটি তৈরির পরিকল্পনা আছে ভারতের।

এই পরিকল্পার অংশ হিসেবে আরো আটটি বিমান ঘাঁটি আধুনিকায়ন করা হবে। নতুন বিমান ঘাঁটি হবে আরো নয়টি।

ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটি রয়েছে আসামের চাবুয়ায়। সেখানে যুদ্ধবিমান সুখই-৩০ এবং চেতক হেলিকপ্টার মোতায়েন রয়েছে। ভারত সেই ঘাটির মেরামত ও আধুনিকায়নের কাজ সম্প্রতি শেষ করেছে।

তবে সবমিলিয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও এই অঞ্চলে বন্ধুর পরিবেশ, ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণের গতি এখনো ধীর।

সুবিধায় চীন

চীনের সঙ্গে তাল মেলোতে গেলে ভারতকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

কেননা অধিকতর সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে সীমান্ত এলাকায় বিমান ঘাঁটি, সেনানিবাসসহ প্রভূত ভৌত অবকাঠোমো গড়ে ফেলেছে চীন। সীমান্তবর্তী তিব্বত ও ইউনান প্রদেশে রাস্তা বানানোর কাজ করছে ১৯৫০-এর দশক থেকে।

২০১৬ সাল থেকে ভারত ও ভুটান সীমান্তে যোগাযোগ বাড়াতে তৎপরতা আরো জোরদার করেছে তারা। চীন এখন কাজ করছে পুরোনো জিনজিয়ান-তিব্বত সড়ককে জাতীয় জনপথে সংযুক্ত করতে। এই মহাসড়ক পুরোটাই চীন-ভারত সীমান্তের সমান্তরালে। এছাড়া ভারতের অরুণাচল প্রদেশের কাছে মেদগ ও জায়ুর মধ্যে একটি পাকা সড়কের কাজ এ বছরের শেষ দিকেই সম্পন্ন হবে তাদের।

ভারতের সঙ্গে সীমান্তের কাছাকাছি চীনের বিমান ঘাঁটি আছে ১২টি। যেগুলোর মধ্যে ৫টিতে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের বিমান ওঠানামা করে। সেখানে আরো তিনটি নতুন বিমান ঘাঁটি বানাচ্ছে চীন। পাশাপাশি শিগাস্তে, এনগারি গুনাসা এবং গোঙ্গায় সব আবহাওয়ায় ব্যবহারোপযোগী বিমানঘাঁটিতে মাটির নিচে স্থাপনা ও নতুন রানওয় নির্মাণসহ আধুনিকায়ন করেছে চীন।

পাঙ্গন হ্রদ থেতে ২০০ কিলোমিটার দুরে এবং ভুমি থেকে ৪,২৭৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত গুনসা বিমানবন্দরে ভূমি থেকে আকাশে মিসাইল উৎক্ষেপনের ব্যবস্থা ও আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে তাদের।

তবে আকাশে ভারতের তুলনামূলক কিছু সুবিধা আছে। সেটা হচ্ছে চীনের বিমানঘাটিগুলো একটু ভেতরের দিকে, এবং বেশি উঁচুতে। সেই উচ্চতায় বাতাস হালকা হওয়ায় তাদের বিমানগুলোতে জ্বালানি বহনক্ষমতা কম।

অবকাঠামোয় সন্দেহ

উভয় পাশে দুই দেশের এসব স্থাপনা তৈরির একটাই উদ্দেশ্য - যে কোনো সংঘর্ষের সময় যত দ্রুত ও সহজে সম্ভব সেখানে সৈন্য ও সমরাস্ত্রের সমাবেশ ঘটানো।

২০১৯ সালে সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সোসাইটির প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, যখন ভারতের এই উচ্চাভিলাষী অবকাঠামোগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে, তখন ভারতের সেনাবাহিনীর বিরাট অংশ খুব সহজেই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পৌছতে পারবে।

বহুকাল ধরেই এ অঞ্চলে অবকাঠামোর গড়ার বিষয়ে ভারতের ভাবনা ছিল ভিন্ন। তারা আগে ভাবতো এ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নত হলে সংঘাত বাঁধলে চীনের সৈন্যদের পক্ষে সহজেই ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়া সহজ হবে। এখন সেই ভাবনা থেকে তারা সরে এসেছে।

প্রসঙ্গত, দুই দেশের মধ্যে একবারই যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। সেই যুদ্ধে ভারত বাজেরকমভাবে হেরেছিল।

এখন দুই পাশে রাস্তাঘাট, রেলপথ ও সেতু বাড়ার কারণে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আরো বাড়ছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা