সোলেইমানি হত্যার জবাব যেখানে দিতে পারে ইরান

image

ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে তাকে হত্যা করার পরপরই কঠোর প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়েছে ৪ শতাংশ। এমন পরিস্থিতির মধ্যে তেহরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

ইরাকের স্থানীয় সময় ৩ জানুয়ারি শুক্রবার ভোরে রাজধানী বাগদাদে মার্কিন এক রকেট হামলায় নিহত হন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষাবাহিনী (ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস কর্প)-এর কুদস শাখার প্রধান জেনারেল ও আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির প্রধান কারিগর কাসেম সোলেইমানি। তিনি দেশটির আইআরজিএস বাহিনীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কমান্ডার ছিলেন। সিরিয়া ও ইরাকে জঙ্গিবিরোধী লড়াইয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যা করায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইরান প্রতিশোধের হুমকি দেয়ায় হামলা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এই ব্যস্ততম সমুদ্রপথে হামলা হলে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তেল সরবরাহ ও বিশ্ব বাজারে। ইরান ও ওমানের মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরে যাওয়ার সরু পথ হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোন ধরনের সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য পথটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। পথটির ওপর ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের সব বন্দর, আরব আমিরাতের বেশিরভাগ বন্দরসহ সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বাস্তবসম্মত হোক আর না হোক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হলে তা অবশ্যই বিশ্ববাজারে গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শীর্ষ তেল আমদানিকারক দেশগুলো এ পথের ওপরই বেশি নির্ভর করে থাকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ এ পথ দিয়েই সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর। এশিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ তেলের যোগান দেয় এই নৌপথ। তাই পথটি বন্ধ করা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাবে। ফলে এসব দেশ আরও ভোগান্তিতে পড়বে।

গত বছর ওই ওমান উপসাগরের কাছে দুই জাহাজে হামলা হয়। এর একটি তেলবাহী আর অন্যটি ক্যামিকেলবাহী জাহাজ। এর ফলে ওই সময় তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের শীর্ষ জেনারেলকে হত্যার জবাবে পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। তাদের অভিমত, ‘ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হয়রানি পুনরায় শুরু করতে পারে।

জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটাতে অস্থায়ীভাবে সামারিক তৎপরতাও শুরু করতে পারে।’ চলমান হুমকির কারণে যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বিশ্বের অর্থনীতিতে ব্যাপক সংকট দেখা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বলছে, ওমান ও পারস্য উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হরমুজ প্রণালি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু। এ প্রণালির নিরাপদ সরবরাহ ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতি চলতে পারে না। জ্বালানি তেল বিশ্লেষণ সংস্থা ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এই ভৌগোলিক সীমানায় ইরানি নৌবাহিনীর প্রভাব প্রবল। এখন বিশাল উপকূলীয় সুবিধার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করা হলে ধাক্কা খাবে বিশ্ব অর্থনীতি। এর জেরে বিশ্ব তেল বাজারে সংকট দেখা দেবে।