সৌদি রাজপরিবারেই যুবরাজ সালমানের ‘বিরোধিতা’

image

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসু্যুলেটের ভেতর সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সৌদি রাজপরিবারের কিছু সদস্যও যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরোধিতায় সরব হচ্ছেন। আল-সৌদ পরিবারের ওই সদস্যরা যুবরাজের বাদশা হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে রাজপ্রাসাদ সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। রাজপরিবারের বিভিন্ন শাখার প্রিন্স ও যুবরাজ সালমানের জ্ঞাতি ভাইদের অনেকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকার প্রশ্নে পরিবর্তন দেখতে চান। তবে ৮২ বছর বয়সী বাদশা সালমান বেঁচে থাকা অবস্থায় তারা এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেবেন না বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

পশ্চিমা বিশ্বে এমবিএস (মোহাম্মদ বিন সালমান) নামে পরিচিত যুবরাজ সালমান এখনও বাদশার প্রিয়পুত্র হওয়ায় তাকে সরিয়ে দেয়ার দাবি উঠলেও সালমান তাতে সম্মতি দেবেন না বলেই অনুমান করা হচ্ছে। রাজপরিবারের সদস্যরা এখন বাদশার মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই ৭৬ বছর বয়সী প্রিন্স (যুবরাজ) আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে সিংহাসনে বসাতে আগ্রহী। বাদশা হলে যুবরাজ সালমানের এ চাচা পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা এবং কিছু পশ্চিমা দেশেরও সমর্থন পাবেন বলে সৌদি একটি সূত্র জানিয়েছে। আড়াই মাস বিদেশে কাটিয়ে প্রিন্স আহমেদ গত মাসে রিয়াদে ফিরেছেন। বিদেশে থাকাকালে লন্ডনে তার বাসভবনের সামনে সৌদ সাম্রাজ্যের পতন চেয়ে বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের প্রতিক্রিয়ায় সৌদির বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনাও করেছিলেন বাদশা সালমানের এ ছোটভাই। গত বছর উত্তরাধিকার নির্ধারণ কমিটির যে তিন জ্যেষ্ঠ সদস্য যুবরাজ সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স বানানোর বিরোধিতা করেন, আহমেদ তাদের একজন ছিলেন বলেও দুটি সূত্র সে সময় নিশ্চিত করেছিল। এ বিষয়ে প্রিন্স আহমেদ বা তার প্রতিনিধিদের কারও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রিয়াদের কোন কর্মকর্তাও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে রয়টার্সের যোগাযোগে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।

সৌদি বংশে কয়েকশ’ যুবরাজ রয়েছে। ইউরোপীয় রাজপরিবারের মতো এখানে রাজার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সিংহাসনের উত্তরাধিকার হতে পারেন না। সৌদি রাজপরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী, বাদশা এবং পরিবারের বিভিন্ন শাখার জ্যেষ্ঠ সদস্যরা মিলে তাদের দৃষ্টিতে সিংহাসনের জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য ব্যক্তিকেই উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করেন। তবে ওই মনোনয়নই শেষ কথা নয়। বাদশার মৃত্যু বা তিনি রাজকাজ পরিচালনায় অক্ষম হলে ৩৪ সদস্যের কাউন্সিলই নতুন বাদশা ঠিক করবেন। আগে থেকে ঠিক করে রাখা উত্তরাধিকারের বাদশা হতে হলেও কাউন্সিলের সম্মতি লাগবে। এদিকে যুবরাজ সালমানের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়া প্রভাবশালীরা এখন সেই ক্ষণেরই অপেক্ষা করছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারাও সৌদি রাজপরিবারের উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনায় যুবরাজ আহমেদকে পরবর্তী বাদশা বানালে সমর্থন দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এমন বেশ কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে।

প্রায় চার দশক সৌদির স্বরাষ্ট্র ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা আহমেদ দায়িত্ব পেলে যুবরাজ সালমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে কোন রকম পরিবর্তন আনবেন না বলেও আস্থাশীল সূত্রগুলো। সালমানের এ ভাই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রিয়াদের সামরিক চুক্তিগুলো বহাল রাখার পাশাপাশি রাজপরিবারের মধ্যে একতাও ফিরিয়ে আনবেন বলে মত তাদের। এ প্রসঙ্গে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের চাপ ও সিআইএর মূল্যায়নের পরও হোয়াইট হাউস এখনই যুবরাজ সালমানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরিতে আগ্রহী নয়। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ অবস্থান বদলেও যেতে পারে। সোমবার (১৯ নভেম্বর) রিয়াদে বাদশা সালমান তার ছেলের সমর্থনে যে ভাষণ দিয়েছেন হোয়াইট হাউস সেটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে বলেও মত ওই মার্কিন কর্মকর্তার। এদিনের ভাষণে সৌদি সরকারি কৌঁসুলির প্রশংসা ছাড়া খাশোগি হত্যাকা- নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি বাদশাহ সালমান। এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ ক্রাউন প্রিন্স সালমানের কাছ থেকেই এসেছিল বলে সিআইয়ের মূল্যায়নকে শনিবার ‘অসম্পূর্ণ, তবে হতে পারে’ বলে উল্লেখ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মঙ্গলবার এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি। তবে এ প্রসঙ্গে ‘নতুন কিছু যোগ করার নেই’ বলে সোমবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

কেবল খাশোগি হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন হওয়ার কারণেই নয়, যুবরাজ সালমান রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় আগ্রহ দেখানোতেও ওয়াশিংটন তার ওপর ক্ষেপেছে বলে ধারণা সৌদি সূত্রগুলোর। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে চলতি বছরের ১৫ মে লেখা যুবরাজের এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেখার কথাও জানিয়েছে রয়টার্স। ওই চিঠিতে যুবরাজ সালমান রাশিয়ার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনাসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কেনার ওপর জোর দিতে বলেন। এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা রিয়াদের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।