বেইজিংয়ে শক্তি প্রদর্শন চীনের

হংকংয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ

image

চীনের কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ অক্টোবর মঙ্গলবার বেইজিং যখন শক্তি প্রদর্শন করছে, ঠিক সেই সময়ে হংকং-এর রাস্তায় চীনবিরোধী বিক্ষোভে নেমেছে কয়েক হাজার মানুষ। বিক্ষোভের তীব্রতায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে হংকংয়ের ১৪টি সাবওয়ে স্টেশন। বিক্ষোভটি এক পর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীদের ওপর পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করে পুলিশ।

চীনের জাতীয় উদযাপনের এ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করছে হংকংয়ের বাসিন্দারা। স্থানীয় সাংবাদিক ইলাইন ইউ বলেন, বেইজিং যখন উদযাপনে ব্যস্ত, তখন শোকাহত হংকং। টুইটার বার্তায় এএফপির সাবেক এই কর্মী বলেন, হংকংয়ের বিক্ষোভকারীরা চীনের জাতীয় দিবসে শোক পালন করছে। ব্যানার নিয়ে তারা উইঘুর ও তিব্বতিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে। জেমস ম্যা নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, মঙ্গলবারের বিক্ষোভ সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ ধরপাকড় চালিয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খ্যাতনামা অ্যাক্টিভিস্ট পর্যন্ত বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। মঙ্গলবারের বিক্ষোভ থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা। তার পোস্টারে ডিম ছুঁড়ে মারে বিক্ষোভকারীরা। শি জিনপিংয়ের ছবির ওপর নিজেদের স্লোগান স্প্রে করে দেয় তারা। মুখোশ নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন ২৭ বছরের এক ব্যক্তি। ম্যাক্স নামের ওই বিক্ষোভকারী বলেন, চীনের জন্য তার কোনও অনুভূতি নেই। ফলে দেশটির জাতীয় দিবসে তার জন্য উদযাপনের কিছু নেই। পুলিশি ধরপাকড়ের ফলে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে মুখোশ পরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

‘মহান চীনা জাতিকে কোন শক্তিই টলাতে পারবে না’
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্বের কোন শক্তিই তার মহান চীনা জাতিকে থামাতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য-যুদ্ধ, তাইওয়ান বিতর্ক এবং হংকংয়ে স্বাধীনতাকামীদের বিক্ষোভ সত্ত্বেও দেশটির কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বর্ষপূর্তির দিনে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর বেইজিংয়ের প্রাণকেন্দ্র তিয়ানআনমেন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট শাসনের ঘোষণা দেন দেশটির জাতির পিতা মাও সে তুং। কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বর্ষপূর্তির দিনে মঙ্গলবার সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, চীনের ভিত্তি নাড়াতে পারে, এমন শক্তি বিশ্বে নেই। কোন শক্তিই নেই যা চীনের মানুষ ও জাতির অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে। এদিন ইতিহাসের অন্যতম বড় সামরিক শক্তির প্রদর্শনী দেখিয়েছে চীন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র দেশ থেকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা চড়াই-উতরাইয়ের ঘটনা তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় বিশেষ প্রদর্শনীর। বিশ্বের সামনে নিজেদের সামরিক শক্তি জাহির করতে মঙ্গলবারের এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয় ১৫ হাজার সেনা, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, উচ্চপ্রযুক্তির ড্রোনসহ এমন কিছু অস্ত্র। এর মধ্যে ছিল আগে কখনও দেখানো হয়নি এমন উভচর যুদ্ধযান, ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, গাইরোকপ্টার, জাহাজভিত্তিক প্রতিরক্ষা অস্ত্র, আগাম সতর্কতামূলক রাডার, অধিক উচ্চতায় উড়ন্ত ও গভীরতায় ডুবো ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন। এদিন চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি তাদের নতুন উদ্ভাবিত পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৪১ দেখিয়েছে। এটি সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়াও ছিল ডিএফ-১৭ নামে হাইপারসনিক গ্লাইডার।

এদিকে মঙ্গলবার বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে সামরিক প্যারেডে দেয়া ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন এবং ‘এক দেশ, দুই নীতির বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। হংকং এবং ম্যাকাও-তে আমরা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি বজায় রাখব। আমরা পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করব। পুনরায় ‘একত্রীকরণের’ জন্য বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হংকংয়ের নাম না নিয়েই তিনি বলেন, চীন সরকার সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশটির স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বের এমন কোনও শক্তি নেই যা এই মহান জাতিকে টলাতে পারে। এ দেশের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম। ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে চীনা জাতি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। সুতরাং এ জাতির অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

প্রসঙ্গত, পিপলস রিপাবলিক অব চীনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিয়েনয়ানমেন স্কয়ারে এদিন নানা অনুষ্ঠান ও প্যারেড চলানোর পাশাপাশি এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ সামরিক মহড়া চালায় বেইজিং। এ সময় ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক বিমান ও সাঁজোয়াযানের মহড়াসহ সামরিক বাহিনীর কসরত দেখানো হয়। পিপলস রিপাবলিকান অব চীনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে চলছে সাজ সাজ রব কমিউনিস্ট দেশটিতে। আগে থেকেই সামরিক শক্তি প্রদর্শনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এদিনের মহড়ায় ছিল ১৫ হাজার সেনা, ১৬০টি ফাইটার জেট, ৫৮০টি ট্যাংকারসহ এমন কিছু অস্ত্রÑ যা আগে কখনও জনসমক্ষে দেখানো হয়নি।

সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান।