‘মিথ্যা’ বলায় তেহরানে বিক্ষোভ

image

গত শনিবার ইরানের তেহরানে আমিরকবির বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন ইরানিরা-ডেইলি মেইল

ইউক্রেনীয় বিমানটিকে ভুলবশত ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে নামানোর কথা প্রথমে অস্বীকার করায় কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষুব্ধ কয়েক শ’ ইরানি তেহরানের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ দেখিয়ে তাদের মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করছে তারা। প্রেস টিভি জানিয়েছে, প্রতিবাদকারীরা কমপক্ষে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়, সেখানে কাঁদুনে গ্যাস ছোড়া হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। এক টুইটার বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অনুপ্রেরণাদায়ী’ প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিবিসি।

গত বুধবার (৮ জানুয়ারি) ভোরে তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ছয় মিনিট পর ইউক্রেন এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে আরোহী ১৭৬ জনের সবাই নিহত হন। প্রথমে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করে ইরান। কিন্তু উড়োজাহাজটি ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। তখন ইরানের কর্মকর্তারা তা ডাহা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে বলছিলেন, যান্ত্রিক ত্রুটিতেই দুর্ঘটনায় পড়ে ওই বিমানটি। ঘটনার তিন দিন পর ১১ জানুয়ারি শনিবার ‘ভুল করে’ বিমানটি ভূপাতিতের কথা স্বীকার করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে ইরানি কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের ৩ তারিখে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের স্থানীয় সময় ভোররাতে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ওই অঞ্চলে প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত বুধবার ভোররাতে ইরাকের দুটি সামরিক ঘাঁটির মার্কিন অবস্থানগুলোতে ডজনেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর ঘণ্টা দুয়েক পর তেহারানের কাছে ইউক্রেনীয় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজটিতে থাকা বহু ইরানি ও কানাডীয়র পাশাপাশি ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান ও জার্মানির বেশ কয়েকজন নাগরিক নিহত হন। প্রথমে নিহত যাত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের কমপক্ষে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, শরীফ ও আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা এক পর্যায়ে প্রতিবাদ শুরু করে। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবাদ ক্ষুব্ধতায় রূপ নেয়।

ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা ফারস এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রায় হাজার খানেক লোক নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে মার্কিন হামলায় নিহত সামরিক কমান্ডার সোলেইমানির ছবি ছিঁড়ে ফেলে। উড়োজাহাজ ভূপাতিতের ঘটনায় যারা দায়ী ও যারা সেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছিল, সবাইকে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেন বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা। তারা ‘কমান্ডার ইন চিফের পদত্যাগ চাই’, ‘মিথ্যাবাদীরা নিপাত যাক’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়। রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে বলে ফারস জানিয়েছে। কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ছবিতে এমনটি দেখা গেছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকে কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আমি আমার দেশের কর্তৃপক্ষকে কখনও ক্ষমা করব না, সেই সব লোককে যারা ঘটনাস্থলে ছিল ও মিথ্যা বলেছে।’ তবে সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরানজুড়ে মানুষের যে ঢল নেমেছিল সেই তুলনায় এ প্রতিবাদ অনেক ছোট ছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইংরেজি ও ফার্সিতে লেখা এক টুইটে বলেন, ‘আমরা নীবিড়ভাবে আপনাদের বিক্ষোভ লক্ষ্য করছি। আপনাদের সাহস অনুপ্রেরণাদায়ী। আমি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং আমার সরকারও ধারাবাহিকভাবে আপনাদের পাশে আছে।’

তেহরানে বিক্ষোভের সময় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আটক

বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা নিয়ে তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে সেখান থেকে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকায়ারকে আটক করে ৩ ঘণ্টা পর মুক্তি দিয়েছে ইরান। তেহরানভিত্তিক বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ উসকে দেয়ায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ম্যাকায়ারকে তেহরানের আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাজ্য এ ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাকায়ার বিমান ভূপাতিতের ঘটনায় নিহতদের প্রতি শোক জানাতে আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ওই শোক সমাবেশই প্রতিবাদ বিক্ষোভে পরিণত হয়। এতে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে দূতাবাসে ফিরে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ব্যাক্তিগত কারণে একটি সেলুনের সামনে গাড়ি থামানোর পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রদূতকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর ছেড়ে দেয় ইরানি কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেয়া এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব বলেন, ‘কোন অভিযোগ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই তেহরানে আমাদের রাষ্ট্রদূতকে গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক আইনের চরম লংঘন। ইরানের সরকার এখন ক্রস-রোড মোমেন্টে আছে। তারা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সব ধরনের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে অচ্ছ্যুৎ রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারে অথবা উত্তেজনা হ্রাস করার পদক্ষেপ নিয়ে কূটনৈতিক পথে এগিয়ে যেতে পারে।’ তাসনিম ম্যাকায়ারকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করার পর ইরানি সংবাদপত্র ইতেমাদ টুইটারে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের একটি ছবি শেয়ার করেছে।