‘হাফ সেঞ্চুরি’র আগেই চলে গেল অজয়

মুহাম্মদ কামরুজ্জামান

image

সংবাদের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (২০১৮)

শুক্রবার (১২ জুলাই) ছুটির দিনে হঠাৎ করে টিভি নিউজ স্ক্রলের এক খবরে চোখ আটকে গেল,‘লন্ডনের হাসপাতালে ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বড়ুয়ার মৃত্যু’। দৈনিক সংবাদের স্পোর্টস এডিটর অজয় বড়ুয়া বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ম্যাচ দেখতে বিলাত গেছে তা আগে থেকেই জানতাম। এমনকি অসুস্থ হয়ে সে লন্ডনের হাসপাতালে ভর্তি তাও জেনেছিলাম অনুজপ্রতিম সাংবাদিক কাশিনাথ বসাকের কাছ থেকে। অপেক্ষা করছিলাম অজয়ের সুস্থতার জন্য, ঠিক সে সময় তার প্রয়াণের খবর আমার কাছে প্রায় বজ্রাঘাতের মতো। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার সম্বিত হারানোর মতো অবস্থা।

এ দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিকের মধ্যে আমি ও আমার চেয়ে ৬/৭ বছরের ছোট অজয় বড়ুয়া (৭২) অন্যতম। চট্টগ্রামের ছেলে অজয় বড়ুয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন ছাড়াও জগন্নাথ হল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টিমকে প্রতিনিধিত্ব করার কৃতিত্ব নিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকেছিল- গণিতে মাস্টার্স হওয়া সত্ত্বেও সেখানের ক্যারিয়ার আরও উজ্জ্বল ও অর্থকরী হওয়াকে ভ্রুক্ষেপ না করেও সত্তর দশকে অজয় যখন এ পেশায় যোগ দেয় অন্যসব পত্রিকার মতো (ব্যতিক্রম দৈনিক বাংলা) সংবাদেও খেলার বিভাগে খণ্ডকালীন রিপোর্টার ব্যবস্থা চালু ছিল। অজয়ের কৃতিত্ব তার প্রচুর ক্রীড়া কার্যক্রম, সত্যনিষ্ঠ রিপোর্টিং এবং সততা দ্বারা পার্ট টাইমার থেকে ফুল র্টাইম রিপোর্টার ও পরে দৈনিক সংবাদের স্পোর্টস এডিটরের পদ অলঙ্কৃত করা। খেলাধুলায় বৌদ্ধ খেলোয়াড় থাকলেও আমার যতদূর মনে হয়, এ দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় অজয় বড়ুয়া প্রথম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের।

একজন সত্যিকার পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বড়ুয়া ছিল তারই প্রবক্তা। চাঞ্চল্যকর খবর দেয়ার বদলে সঠিক ও মত্যনিষ্ঠ খবর দেয়ার ব্যাপারে সংবাদের যে সুনাম, ঐতিহ্য বা রেওয়াজ তা থেকে অজয়কে কেউ বিচ্যুত করতে না পারায় যথাযথ সম্মান ও সমীহ তার ভাগ্যে জুটতে কোন অসুবিধা হয়নি।

বিলেতে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ম্যাচ দেখার ব্যাপারে অজয়ের চেয়ে তার লন্ডন প্রবাসী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছেলে হিমাদ্রী বড়ুয়ার আগ্রহ ছিল বেশি। সপরিবারে খেলা উপভোগ করার উদ্দেশ্য সফল হলেও কোন এক সময় ভীষণ ঠাণ্ডা লাগায় বিপত্তি ঘটে তার। বিলেতের মতো হাসপাতালে যথাসম্ভব সুচিকিৎসা হলেও নিউমোনিয়ার আক্রমণ যে তার কাল হয়ে থাকবে- তা কেও-ই কল্পনা করেনি। এভাবে আমরা হারালাম দীর্ঘদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বড়ুয়াকে। বছরপাঁচেক পূর্ণ হলে তার ক্রীড়া সাংবাদিক জীবনে গোল্ডেন জুবলি পালন করার সুযোগ হতো। বছর দুয়েক আগে ক্রীড়া সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে আমার ৫০ বছর পূর্তির সময়ে ছবিসহ আমার ওপর খবর বেশ গুরুত্ব দিযে প্রকাশ করেছিল সংবাদ। অপেক্ষায় ছিলাম অজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে অভিনন্দন জানানোর। অজয় যে হাফ সেঞ্চুরির আগেই চলে গেল।

এ থেকে বঞ্চিত হওয়াটা খুবই দুঃখজনক ও হতাশার। ঈশ্বর যেন তাকে স্বর্গবাসী করেন। অজয় বিধবা স্ত্রী ছেলে ও দুই মেয়ের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।

লেখক : বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।