অস্তিত্ব সংকটে আদি বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা

দখল ও দূষণের শিকার

image

উচ্ছেদ অভিযানের ছোঁয়া লাগেনি বুড়িগঙ্গায়

তিন সংস্থার সমন্বয়হীনতাই দায়ী : বিশেষজ্ঞরা

অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদ অভিযানের কোন ছোঁয়া লাগেনি আদি বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড়ে। নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। বেদখল হতে হতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে বসিলা মোহনা পর্যন্ত সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আদি বুড়িগঙ্গা নদীটি আজ মৃতপ্রায়। নদীর দুই পাড় দখল করে তৈরি করা হয়েছে ১০-১৫তলা ভবন, শিল্প-কারখানাসহ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে হাজারীবাগের সিকদার মেডিকেল কলেজ, কামরাঙ্গীর চরে পান্না গ্রুপের ভলভো ব্যাটারির কারখানা, ম্যাটাডোর ব্রাশ ফ্যাক্টরি, ডিপিডিসির বিদ্যুৎ সাবস্টেশনসহ অসংখ্য শিল্প-কারখানা ও বহুতল ভবন এই আদি চ্যানেলের জমিতে গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করে স্থানীয়রা। নদীর দুই পাড়ে নেই কোন সীমানা প্রচীর। নদীর সীমা চিহ্নিত জন্য একাধিক জরিপ করা হলেও নদীর উদ্ধারে কোন কার্যক্রম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ঢাকা জেলা প্রশাসক। কমিটি আর উপকমিটির বেড়াজালে আটকা পড়ে যায় এই চ্যানেলের উদ্ধার প্রক্রিয়া। তবে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি জেলা প্রশাসনের আওতায় থাকায় অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে কোন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। এ বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি উদ্ধারে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বিআইডব্লিউটিএ। কিছুদিন আগে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু কিছু অংশ উচ্ছেদ করার পর তা আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেন যে তারা এই অভিযান বন্ধ করেছে আমরা তা বলতে পারব না। তবে চ্যানেলটি উদ্ধার করে এই দুই পাড়ের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তারা এই বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।

জানা গেছে, পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের কিছুটা পশ্চিমে চাঁদনীঘাট এলাকায় দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার উত্তর দিকের শাখাটি আদি চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। আর দক্ষিণের শাখাটি এখনকার মূল বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার এই দুই ধারার মাঝখানে কামরাঙ্গীর চর, নবাবগঞ্জ চরসহ কয়েকটি এলাকার অবস্থান। কামরাঙ্গীর চর এলাকার কিছু অংশ ছাড়া এই চ্যানেলের পুরোটাই এখন ভরাট হয়ে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাড়ি-ঘর, বহুতল দালান ইত্যাদি। অথচ দুই দশক আগেও এই চ্যানেলটি হাজারীবাগ, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুরের পাশ দিয়ে আবারও বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। চ্যানেলটি উদ্ধানে ২০১৪ সালের ২৫ মে তৎকালীন নৌমন্ত্রী ও নদী উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের সভাপতি শাজাহান খানের নেতৃত্বে একাধিক মন্ত্রী, টাস্কফোর্সের সদস্যরা সরেজমিন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি পরিদর্শন করেন। চ্যানেলটির দুরবস্থা দেখে নৌমন্ত্রী পরের দিনই সচিবালয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠকে আদি চ্যানেল উদ্ধারে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরে আর সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। কমিটি আর উপকমিটির বেড়াজালে আটকা পড়ে যায় এই চ্যানেলের উদ্ধার প্রক্রিয়া। তখন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়। এর প্রায় ১ মাস পর লালবাগ সার্কেলের সহকারী ভূমি কমিশনারকে আহ্বায়ক করে আরও একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। তবে গত ৫ বছরেও কোন কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরী নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। এই ধারাটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে একসময় গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বুড়িগঙ্গা নামে অভিহিত হয়। ১৮৯৭ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে ঢাকার উজানের নদ-নদীগুলো মধুপুর জঙ্গলের উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে সরে যায়। সে সময় অথবা মতভেদে তারও আগে ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের ফলে সলমাসি, কলাতিয়া, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ এলাকা দিয়ে প্রবাহমান বুড়িগঙ্গা কিছুটা দক্ষিণে সরে যায়। তখন তলদেশের গঠনগত পরিবর্তন হওয়ায় নদীতে পলি পড়ার গতিও বেড়ে যায়। ফলে মাঝখানে জেগে উঠতে থাকে চর, যার একটি অংশ পরবর্তী সময়ে কামরাঙ্গীরচর ও আরেকটি অংশ নবাবগঞ্জ চর হিসেবে পরিচিত হয়। এসব চরের ভেতর দিয়ে কয়েকটি খাল ও জলাভূমি থাকার প্রমাণ দেখা যায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে প্রণীত সিএস ম্যাপে। এদিকে বুড়িগঙ্গার ধলেশ্বরীর উৎস পলি ভরাটের কারণে বন্ধ হয়ে যেতে থাকলে আদি চ্যানেলটি সলমাসি, বছিলা, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগের দিকে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে শুরু হয় চাষাবাদ। এরপর নগরায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে দখল, ভরাট ও বাড়িঘর নির্মাণ।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, আদি চ্যানেল ভরাট ও দখলের ফলে এর ওপর নির্মিত সেতুগুলো এখন প্রায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। কামরাঙ্গীর চরের লোহারপুল ও পাকা সেতুর নিচে পানি থাকলেও পশ্চিমের অন্য সেতুগুলোর কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কচুরিপানা আর আগাছায় ভরা। মাটি ভরাট করে অনেক সেতুকে দুই দিক থেকে দখল করে ফেলা হয়েছে। দখল চলছে এখনও। নবাবগঞ্জের পাকা সেতুটি ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ করা হয়। এক যুগের ব্যবধানে ওই সেতুটি এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। সেতুর নিচে পানি নেই, আছে মাটি। দুই দিকে অসংখ্য স্থাপনা। আবাসন ব্যবসায়ীরা বালু ভরাট করে এই এলাকায় সারি সারি প্লট বিক্রি করেছেন। একই অবস্থা কামরাঙ্গীর চরের রসুলপুর ও হাজারীবাগের কোম্পানিঘাট সেতুরও।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আবদুল মতিন সংবাদকে বলেন, আমরা বারবার স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের অবহেলা দেখছি। বুড়িগঙ্গাসহ সব নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করতে হলে সরকারের সঠিক পদক্ষেপ, কঠোর আইন ও বাস্তবায়নই কেবল পারে নদী বাঁচাতে। বুড়িগঙ্গা ও এর আদি চ্যানেল বাঁচাতে হলে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। কারণ এখানে শুধু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে তা নয়। নদী গতিপথ পরিবর্তন করায় অনেকের বৈধ জমিও এখন নদীর সীমানা হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী নদীর জায়গায় স্থাপনা করা যায় না। তাই অনেক বৈধ মালিকের স্থাপনা উচ্ছেদেরও প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া নদী তীরের প্রাচীন স্থাপনা সংস্কার করে সংরক্ষণ করা, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়াতে খনন করা ও তীরের সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা জরুরি। এসব কাজের জন্য সদিচ্ছা ও দৃঢ়তা দুটোই প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব উল ইসলাম সংবাদকে বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি ঢাকা জেলা প্রশাসকের আন্ডারে। এই চ্যানেলের মুখে কিছু অংশ আমরা উচ্ছেদ করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে তা বেশিদূর অগ্রসর হয় নি। সেহেতু আমরা মূল বুড়িগঙ্গা নদী দুই তীর রক্ষা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। সেহেতু আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলেটি উদ্ধারে আর কাজ করা হয়নি। যদি চ্যানেলটি বিআইডব্লিউটিএ’র আওতায় দেয়া হয়। তাহলে চ্যানেলটি উদ্ধারে কার্যক্রম নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকার আশপাশের দুই নদী আদি বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা এখন অস্তিত্ব সংকটে। দখল-দূষণে এ ঢাকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নদী এখন হারিয়ে ফেলছে অতীত ঐতিহ্য। একই সঙ্গে অপরিণামদর্শী পরিকল্পনা ও প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে নৌপথ হিসেবে এ দুই নদীর চাহিদাও লোপ পেতে বসেছে। একালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের জন্য এই দুই নদীর পানি প্রবাহের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল তা যেন কালের আবর্তে লোপ পেতে বসেছে। সরেজমিন ঘুরে এই দুই নদীর বর্তমান দুরবস্থা নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছেন মাহমুদ আকাশ।

শীতলক্ষ্যা নদী উদ্ধারে নেই কোন পরিকল্পনা

তিন শতাধিক ডকইয়ার্ড ও বালু ভিটি উচ্ছেদ হয়নি

দখল ও দূষণে শিকার শীতলক্ষ্যা নদী উদ্ধারে নেই কোন পরিকল্পনা। প্রতি সপ্তাহে তিন দিন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অবৈধ ৩ শতাধিক ডকইয়ার্ড ও শতাধিক বালু মহাল উচ্ছেদ করা হয়নি। এছাড়া সীমানা পিলারে রয়েছে আপত্তি। নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুর থেকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা চিহ্নিত করতে ৫ হাজার ১১টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১৯৮টি পিলার নদীর সীমানার সঠিক স্থানে বসানো হয়নি বলে আপত্তি জানিয়েছে অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এ পিলারগুলো বেশিরভাগেই বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থিত। এ সব প্রতিষ্ঠান কৃত্রিমভাবে নদীর তীর ভরাট করে পিলারগুলো সরিয়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। শীতলক্ষ্যা নদীর দু’তীরে জরিপ করে পুনরায় সীমানা পিলার স্থাপনের সুপারিশ করার জন্য ২০১৭ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ২ বছরেও জরিপ কাজ শেষ করতে পারেনি ওই কমিটি। তাই নতুন করে পিলার স্থাপনের পক্রিয়া এখনও শুরু করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানায়। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক মো. শফিকুল হক (বন্দর) সংবাদকে বলেন, ঢাকা নদী বন্দরের মতো নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। কারণ শীতলক্ষ্যা নদী দুতীরে সীমানা পিলার নিয়ে যে আপত্তি জানানো হয়েছি সে বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি। এর জন্য ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা রয়েছেন। কমিটি শীতলক্ষ্যা নদীর দু’তীরে জরিপ কাজ পরিচালনা করছে। জরিপ কাজ শেষে সীমানা পিলার বসানো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সরেজমিনে শীতলক্ষ্যা নদীর দু’তীর ঘুরে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের জেলার সদর ও বন্দর থানার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শীতলক্ষ্যা নদীটি। এই নদীর বন্দর থানার কিছু কিছু এলাকায় নদীর সীমানা চিহ্নিত করে পিলার স্থাপন করা হলেও সদর থানার পাড়ে কোন পিলার স্থাপন করা হয়নি। তবে বন্দর থানার কোন এলাকায় সীমানা পিলারের কোন চিহ্ন নেই। কিছু কিছু এলাকায় পিলার থাকলেও তা বালু দিয়ে ভরাট করে দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জের ট্রলার ঘাট দক্ষিণ পাশ থেকে মাহমুদ নগরের সোনাকান্দা পর্যন্ত ৮৪টি পিলার স্থাপর করা হয়েছে। এর অধিকাংশ পিলার সঠিক স্থানে বসানো হয়নি। এ সব পিলারগুলো যেখানে বসানো হয়েছে এ থেকে আরও ১৫০-৭০০ ফুট উপরে নদীর সীমানা। এ সব পিলার নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এর মধ্যে মদনগঞ্জ লঞ্চঘাটের দক্ষিণপাশে বসুন্ধরা সিমেন্ট ফ্যাক্টরির সামনে ৯টি, মাহমুদ নগর এলাকায় সামিট পাওয়ার প্লান স্টেশনের সামনে ১২টি, মদনগঞ্জের ট্রলারঘাটে ১৯টি, বাংলাদেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরির সামনে ৮টি, সিমেক্স সিমেন্ট ফ্যাক্টরির সামনে ৭টি, সাররার জুট মিলের সামনে ৪টি ও সোনাকান্দা বাদশা ডকইয়ার্ডের সামনে ৩টি পিলার নিয়ে আপত্তি রয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু এলাকায় নদীর সীমানা চিহ্নিত করা জন্য স্থাপিত পিলার ভেঙ্গে বালু ভরাট করা হচ্ছে। পিলার রেখে নদী অনেক ভিতরে গিয়ে মাটি ভরাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানায়।

এ বিষয়ে মদনগঞ্জের ট্রলারঘাট এলাকায় মাহমুদ নামের এক বাসিন্দা সংবাদকে বলেন, বেশির ভাগ এলাকায় পিলার ভেঙ্গে মাটি ভরাট করে ডকইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া অনেক এলাকায় নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে গাছ লাগানো হলেও তা বেশি দিন থাকেনি। গাছ ভেঙ্গে বালু মহাল তৈরি করা হয়েছে। এ সব বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা দেখেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ বন্দরের যুগ্ম পরিচালক শেখ মাসুদ কামাল সংবাদকে বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি জড়িপ কাজ করা হচ্ছে। এই জরিপ পক্রিয়া শেষে নদীর সীমানা পিলার পুনঃস্থাপন করা হবে। কতদিনের মধ্যে এই জরিপ প্রক্রিয়া শেষ হবে তা সঠিকভাবে বলা মুসকিল। আশা করছি চারপাশের নৌপথ রক্ষার তৃতীয় প্রকল্পে শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলার স্থাপনের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, ঢাকার চারদিকের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ^রী ও শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য ২০০৯ সালে আদালতের নির্দেশে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পিডব্লিউডি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ৫০১১টি সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১৯৮টি পিলার নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ বন্দর অফিসের। এতে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে ১৩৫৬টি এবং ৮৪২টি পিলার সঠিক স্থানে বসানো হয়নি বলে সংস্থাটি জানায়। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীর তীড়ে প্রায় ৩ শতাধিক শিপ ও ডকইয়ার্ড তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি থাকলেও বেশির ভাগেই অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর এম. মাহবুব উল ইসলাম সংবাদকে বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আমাদের সুপারভিশনের অভাবে অনেক অবৈধ স্থাপনা রয়ে গেছে। এছাড়া নদী সীমান পিলার স্থাপনের জরিপ কাজ এখনও শেষ হয়নি। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল তা কার্যকর হয়নি। শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষায় এখনও কোন প্রকল্প নেয়া হয়নি। তবে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার দ্বিতীয় প্রকল্পে শীতলক্ষ্যা নদীর একটি অংশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে প্রকল্পের শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের ১১০ কিলোমিটার নৌপথ রক্ষা কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।