আধুনিক পাটকল করব : অভিজ্ঞরা চাকরি পাবে

দুর্নীতিবাজ যেই হোক ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রী

image

প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে দল-মত নির্বিশেষে দেশব্যাপী চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী পাটকল বন্ধে সরকারের পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, পাটকল আধুনিক করা হবে। যারা অভিজ্ঞ তারা চাকরি পাবেন।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়, দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িতদের আমরা ধরে যাচ্ছি। দুর্নীতিবাজ যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব এবং এটা অব্যাহত থাকবে।’ প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ৯ জুলা বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের অষ্টম (বাজেট) অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, অনিয়মে জড়িত, আমরা যাকেই পাচ্ছি এবং যেখানেই পাচ্ছি তাকে ধরছি। আর ধরছি বলেই, চোর ধরে যেন চোর হয়ে যাচ্ছি।’

‘আমরা ধরি আবার আমাদেরকেই দোষারোপ করা হয়। এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য। এর আগেতো দুর্নীতিটাই নীতি ছিল। অনিয়মটাই নিয়ম ছিল। সেভাবেই রাষ্ট্র চলেছে, ’ যোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যতদূর পারি শুদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এই অনিয়মগুলো আমরা নিশ্চয়ই মানব না।’ এর আগে বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের বক্তৃতা করেন। তিনি বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরলে কোভিড-১৯ এরমধ্যেও দেশব্যাপী তার সরকারের চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী। ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি, করোনা চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা-খাওয়া বিষয়ে ব্যাপক ব্যয়ের পরিসংখ্যান এবং অন্য অনিয়ম অসংগতির প্রসঙ্গে দেশে ’৭৫ পরবর্তী সামরিক সরকারগুলোর দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে দায়ী করেন। সরকার প্রধান তার সরকারের একের পর এক বিভিন্ন দুর্নীতিবাজদের পাকড়াও করার দিকে ইঙ্গিত করে সরকারের দুর্নীতির মূল উৎপাটনে আন্তরিকতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি একইসঙ্গে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘ভয়কে জয় করার’ ও পরামর্শ দেন।

যারা লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশ্যে হাত পাততে পারছে না এমন বহুলোকের বাড়ি-ঘরে গোপনেও ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘সরকারিভাবে যেমন দিচ্ছি তেমনি দলীয়ভাবেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমানভাবে সাহায্য করে যাচ্ছি। কারণ, এটাই আওয়ামী লীগ, যে আওয়ামী লীগ জাতির পিতার নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা এনেছে।’

করোনাভাইরাসের ভয়ে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থবিধি মেনে চলার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কথা শুনলেই মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত হয়। এত আতঙ্কিত হবো কেন। মরতে তো একদিন হবেই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি তাহলে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাব। আমাদের দেশে করোনারোগীর সুস্থ হওয়ারর হার অনেক বেশি। মনে সাহস রাখতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

তিনি বলেন, করোনার কারণে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকবে না। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, করোনার সংক্রমণ জুলাই মাস পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। এরপর আস্তে আস্তে কমে যাবে। সেটাই হচ্ছে। আশা করি, পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

সরকার প্রধান সম্প্রতি বিজেএমসি’র নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকলগুলোর আধুনিকায়নে এসব মিলের শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করে উৎপাদন বন্ধে তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপেরও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত এক বছর ধরে এ পাটকলগুলোর ২৫ হাজার শ্রমিককে সরকারের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হচ্ছে, বিজেএমসি দিতে পারছে না। এ পাটকলগুলো সবচেয়ে পুরোনো, ৫০ ও ৬০ এর দশকে এগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। এগুলো আর লাভজনক করা সম্ভব না।’

বিশে^ কৃত্রিম তন্তুর বিপরীতে নতুন করে পাটের আবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা পাটের জিন আবিষ্কার করেছি। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের সম্ভাবনা রয়েছে। এ পাটকলগুলো আধুনিক করে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যারা আগ্রহী হবে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যাবে।’

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী এ বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এ পাটকলগুলোকে সময়োপযোগী ও আধুনিক করতে হবে। আমরা সেটা করব। শ্রমিকদের পাওনা ৫ হাজার কোটি টাকা আমরা পরিশোধ করছি।’

তিনি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ সম্পর্কে বলেন, ‘সব টাকা শ্রমিকদের হাতে দেয়া হবে না। দিলে খরচ হয়ে যাবে। অর্ধেক টাকা নগদ আর অর্ধেক আমরা তাদের সঞ্চয়পত্র করে দেব। এতে তারা প্রাপ্য মজুরির চেয়ে বেশি পাবে।’

দেশে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাতো আছেই তার সঙ্গে এখন আবার যোগ হয়েছে বন্যা। ইতোমধ্যে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালননিরহাট, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টঙ্গাইল, মাদারীপুরসহ বন্যা দেখা দেয়া ১২টি জেলায় প্যাকেট ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ৬৪টি জেলার জন্য বন্যার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ১০ হাজার ৯শ’ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ এবং ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দিয়ে দেয়া রয়েছে। যাতে দুর্যোগ হলে কোন ধরনের অপেক্ষা করতে না হয়। সঙ্গে সঙ্গে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা যায়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বন্যা, নদীভাঙ্গন, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, অগ্নিকা-সহ যেকোন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করতে আমরা সবসময় প্রস্তত থাকি এবং আমাদের দেশের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের জানা আছে এবং সে অনুযায়ীই আমরা ব্যবস্থা নেই। যাতে দেশের মানুষকে আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারি এবং তাদের কষ্ট কমাতে পারি।’

প্রধানমন্ত্রী এই করোনাকালীন বাজেট প্রণয়নের জন্য অর্থমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর ও বিভাগকে তার ভাষণে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যা অনেক উন্নত দেশও করতে পারেনি। কিন্তু আমরা করেছি।’

এই বাজেটে প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা, সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করে দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধীদের ভাতার পরিমাণ এবং সংখ্যা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ সব শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য ১৯টি প্যাকেজে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি সরকার পরিচালনায় আসার পর বাজেট ঘাটতি কখনও শতকরা ৫ শতাংশের ওপরে উঠতে দেই নাই কিন্তু এবার করোনার জন্য বাজেট ঘাটতি আমরা ৬ ভাগ রেখেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা লাগলে আমরা দেব। কিন্তু করোনার কারণে অর্থনীতি যেন স্থবির না হয়।’

কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত ১০ জুন এবারের সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। ১১ জুন সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল ২০২০-২১ অর্থ বছরের জন্য প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। ৩০ জুন এই বাজেট সংসদে পাস হয়।