করোনার ভুয়া সনদ বিপদ ডেকে আনছে বহির্বিশ্বে

image

ভুয়া করোনা সনদের কারণে দেশের জনশক্তি রপ্তানি ও বিমান পরিবহন ব্যবসা চরম হুমকির মুখে পড়ছে। ভুয়া করোনা সনদ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে দেশের সুনামও নষ্ট হচ্ছে। এবার ইতালিতে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ফ্লাইট ও যাত্রী প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইউরোপের দেশ ইতালি। এর আগে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ করেছে। ভুয়া করোনা সার্টিফিকেটের জন্য বাংলাদেশেও করোনা পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ পর্যায়ক্রমে আকাশপথে যোগাযোগ চালু করলেও বাংলাদেশ সেই সুবিধা নিতে পারছে না। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেশ কয়েকজন যাত্রীর করোনা শনাক্ত হওয়ার কারণে ঢাকা থেকে একের পর এক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিমান যাত্রীদের নির্ভুলভাবে করোনা শনাক্তের প্রক্রিয়ায় গলদ দেখা যাচ্ছে। বিমান চড়া নিশ্চিত করতে অনেকেই ‘করোনা রোগী নন’-এমন ভুয়া সনদ নিয়ে সুস্থ সেজে উড়োজাহাজে উঠে পড়ছেন, যা বিদেশে গিয়ে শনাক্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বন্ধ করে দেয়া বহুল বিতর্কিত বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল থেকেই প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ভুয়া কোভিড-১৯ সনদ দেয়া হয়েছে। এই ধরনের হাসপাতাল একটা নয়, আরও থাকতে পারে। সরকারের উচিত জরুরিভিত্তিতে একটি ট্রাস্ট গঠন করে ভুয়া কোভিড-১৯ সনদ বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া।

তারা আরও বলেন, একের পর এক বিদেশি রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ছে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। জনশক্তি রপ্তানিও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছে। ফ্লাইট চলাচল নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় দেশের পণ্য রপ্তানিও ঝুঁিকর মুখে পড়ছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত হলে, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ থেকে জনশক্তি, তৈরি পোশাক রপ্তানিসহ অন্য বাণিজ্যেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক বলেন, বিদেশে যাওয়ার সময় যাত্রীর জ্বর, সর্দি বা করোনা উপসর্গ আছে কিনা, তা বিমানবন্দরে তা পরীক্ষা করা হয়। তাছাড়া অনেক দেশে কোভিড-১৯ সনদ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আক্রান্তের ৪/৫ দিন পর করোনা ধরা পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে নেগেটিভ হলেও গন্তব্যস্থলে যাওয়ার পর কারোর করোনা পজিটিভ হতে পারে। ভুয়া করোনা সনদ নিয়ে বিমানে চড়ার কারণে আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ফ্লাইট ও যাত্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইতালি। এমনকি কোন বিদেশি নাগরিকও বাংলাদেশ থেকে ইতালি ঢুকতে পারবেন না। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ থেকে ইতালি রুটে যাত্রী পরিবহনকারী কাতার এয়ারওয়েজ।

গত ৬ জুলাই সোমবার বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়া বিশেষ ফ্লাইটের ২১ জন যাত্রী করোনা পজেটিভ শনাক্ত হন, যার কারণে বাংলাদেশিদের ইতালিতে প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। ২১ যাত্রীর করোনা শনাক্তের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে ইউরোপের দেশটিতে। এ ঘটনার একদিন পর বুধবার রাজধানী রোমের ফিউমিসিনো ও মিলানের মালপেনসা বিমানবন্দরে অবতরণ করা ১৮২ বাংলাদেশির মধ্যে ১৬৭ জনকে ফেরত পাঠায় ইতালি। ওই দুটি ভিন্ন ফ্লাইটে এই দুই বিমানবন্দরে অবতরণ করা হলে তাদের নামতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।

ইতালির জনপ্রিয় ‘ইল মেসেজ্জারো’ পত্রিকায় বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষায় দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে টাকার বিনিময়ে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নেগেটিভ সনদ বিক্রি হয়। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ নিয়ে মিথ্যে নেগেটিভ সনদের কারণে ইতালি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বাংলাদেশে ভুয়া কোভিড-১৯ সনদের পেছনে প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি হয়েছে। তিন হাজার ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার হাজার টাকার মধ্যে কোভিড-১৯ এর ভুয়া সনদ পাওয়া যায়।

ইতালির আরেকটি বহুল প্রচারিত ‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ল্যাজিও শহরে ১৪টি নতুন সংক্রমণের কেস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি কেস দেশের বাইরে থেকে এসেছে। যার সাতজনই বাংলাদেশ থেকে এসেছে।’

‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকার অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬ জুন বাংলাদেশ থেকে ২৭৬ যাত্রী নিয়ে যে বিমানটি রোমে অবতরণ করেছিল সেখানে ৩৬ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইটের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ইতালি।’

এসব বিষয় নিয়ে ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিরা অস্বস্তিতে হয়েছেন বলে জানা গেছে। দেশটিতে অবস্থানরত একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক টেলিফোনে জানিয়েছেন, ‘ভুয়া করোনা সনদের কারণে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতালিতে বাংলাদেশিদের বাঁকা চোখে দেখা হচ্ছে।’

বিমান পরিবহন সেবায় নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তা, সম্প্রতি জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরে যাওয়া প্রায় একশ’ বাংলাদেশির শরীরে করোনা পাওয়া গেছে। এরপর বাংলাদেশে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েও তা ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে টার্কিশ এয়ারলাইন্স। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আরব আমিরাত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ফ্লাইট চালুর অনুমতি দিয়েও তা স্থগিত রেখেছে।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়, যা খুব দ্রুত বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা জারি করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিদেশফেরত সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি যাদের শরীরে করোনা উপসর্গ থাকবে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২১ মার্চ থেকে চীন ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশের সঙ্গে সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বেবিচক। এরপর গত ১৫ জুন থেকে যুক্তরাজ্য ও কাতারের সঙ্গে বিমান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ২১ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান সংস্থার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। তবে গত ৩ জুলাই থেকে ঢাকা-ইস্তাম্বুল রোডে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেয়েও তা ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে টার্কিশ এয়ারলাইন্স।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, দুবাই ও আবুধাবিতে গত ৬ জুলাই থেকে বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট চালুর সূচি নির্ধারণ করা থাকলেও আরব আমিরাত সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার কারণে তা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে বিমান বাংলাদেশ। আর গত ১১ জুন বিশেষ ফ্লাইটে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার পর ১৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশির শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশিদের প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দক্ষিণ কোরিয়া।

গত ১০ জুন বিমানের চার্টার্ড ফ্লাইট জাপান যাওয়ার পর ৪ বাংলাদেশির করোনা শনাক্ত হয়। এরপর বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ফ্লাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে জাপান। গত ১১ জুন ঢাকা থেকে গুয়াংজুতে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের ১৭ জন বাংলাদেশি যাত্রীর করোনা শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সকে এক মাসের জন্য ফ্লাইট চলাচলের নিষেধাজ্ঞা দেয় চীন সরকার।

ভুয়া কোভিড-১৯ সনদে সরকারের অস্বস্তি

বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমানো ব্যক্তিদের নিয়ে ইতালিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটিকে দুঃখজনক অভিহিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘এতে অবশ্যই ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। পজেটিভ রিপোর্ট নিয়ে চলে গেল, তারপরে ওখানকার আইন-কানুন মানল না। কিছু বাংলাদেশির কারণে ইতালিতে বাংলাদেশের নাগরিক সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে। ইতালিয়ান জনগণও শুনেছি, তারা এখন বাংলাদেশি দেখলে পছন্দ করে না।’

ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে যাবার দায় সরকারের ওপর আসে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা সরকারের ওপর আসে না। এদের অনেকেই ইতালির নাগরিক। তারা কা-জ্ঞানহীন কেন? বাংলাদেশ থেকে কেউ যাতে ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে বিদেশে যেতে না পারে, সেটি সরকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া টেস্টের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে।’

দুনিয়ার সব দেশেই অপকর্ম হয়-মন্তব্য করে একে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের দেশে অপকর্ম হলে আমরা এগুলোর শাস্তি দেই। শাস্তি দেই বলেই আমাদের একটা সম্মান আছে।’