কৃষি জমি নষ্ট করে শিল্পায়ন নয় : কৃষক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

image

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষকরাই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখে। কৃষক ফসল ফলায়, আমরা খেয়ে বেঁচে থাকি। তিনি বলেন, কৃষি জমি নষ্ট করে যত্রতত্র শিল্পকারখানা করতে দেয়া হবে না। আমাদের কৃষি জমি বাঁচাতে হবে; ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে হবে। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃষক লীগের ১০ম সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে (বেলা ১১টায়) আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে কৃষক লীগের দশম জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ সমীর চন্দ্র চন্দের সঞ্চালনায় সম্মেলনে সাংগঠনিক রিপোর্ট ও শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজা। বক্তব্য রাখেন সর্বভারতীয় কৃষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার অঞ্জনসহ কেন্দ্রীয় জেষ্ঠ্য নেতারা। এ সময় আওয়ামী লীগ ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে প্রায় প্রায় ৭ হাজার কাউন্সিলর এবং ৯ হাজার ডেলিগেট অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি, যেন কৃষি জমি নষ্ট না হয়। যারা শিল্পকারখানা করতে চান, তাদের ওইসব অঞ্চলে প্লট দেয়া হবে। তিনি বলেন, আগে কৃষক ফসল ফলাত, কিন্তু তার পেটে খাবার ছিল না। তাদের পরনের কাপড় ছিল না। কৃষকের অধিকার সংরক্ষণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আমরা উন্নত হব, শিল্পায়ন করব। বাংলাদেশে ই-কৃষি চালু হয়েছে। কৃষকরা যেকোন সমস্যার সমাধানে ‘১৬১২৩’ নম্বরে কল করে জানতে পারে। আমাদের কৃষকরাও এখন যথেষ্ট পরিপক্ক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া শুরু করি। ওই সময় বিশ্বব্যাংকের একজন প্রতিনিধি বলেছিলেন, কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া যাবে না। কৃষকদের ভর্তুকি দিলে আমরা টাকা দেব না। আমি বলেছিলাম, আপনাদের টাকা লাগবে না। আমরা আমাদের টাকা দিয়ে কৃষকদের ভর্তুকি দেব। গত ১০ বছরে আমরা ৬৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছি। ২ কোটি ১৩ লাখ কৃষককে উপকরণ কার্ড দিয়েছি। তারা ওই কার্ড দেখালে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ কিনতে পারবে আমরা সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার পায় সে ব্যবস্থাও সরকার করছে। শেখ হাসিনা বলেন, হাওর এলাকার কৃষকরা অকাল বন্যায় প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া উপকূলীয় এলাকার কৃষকরাও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। তাদের জন্য কোন বীমার ব্যবস্থা চালু করা যায় কিনা সেটাও আমাদের সরকার ভাবছে। কৃষক যাতে ভালোভাবে ফসল ফলাতে পারে সে জন্য সারের দাম কমানো হয়েছে। সেচের জন্য ব্যবহার করা বিদ্যুতের ওপর ২০ ভাগ ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। মোটকথা কৃষকদের যত ধরনের সুবিধা দেয়ার কথা, আমরা তা দিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশকে উন্নত সমৃদ্ধশীল করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন জমি আর অনাবাদি থাকবে না। আনাচে-কানাচে, ঘরের পাশে, এমনকি ছাদেও যেন কিছু চাষ হয়, ফসল উৎপাদন হয়। যেসব কৃষকের নিজেদের বাড়ি আছে, ভিটা আছে বা ভিটার পাশে জমি আছে, সেখানেও তারা যেন উৎপাদন করতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই ‘আমার বাড়ি, আমার খামার’ প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

কৃষিখাতে গবেষণার গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গবেষণা ছাড়া কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা গবেষণার মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন করছি। বর্তমানে দেশেই গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সবজি ১২ মাসই উৎপাদন করা যাচ্ছে। আমরা ফসলকে বহুমুখী করতে চাই। এ পর্যন্ত ১০৮টি ধানের জাত আবিষ্কার করতে পেরেছি। আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ চাল উৎপাদন করতে পেরেছি। আমি নিজেও সেই চাল খেয়ে দেখেছি। এছাড়া ৪৪২টি উৎপাদনপ্রযুক্তি আমরা উদ্ভাবন করতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা যেদিন পার্লামেন্টে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল সেদিন খালেদা জিয়া ও সাইফুর রহমান বলেছিলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ভালো না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে বিদেশ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে না। জবাবে আমরা বলেছিলাম, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। আমরা ভিক্ষুক হতে চাই না।

শেখ হাসিনা বলেন, কৃষকদের উৎপাদনের ফলেই আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় আজ প্রায় দুই হাজার ইউএস ডলার হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে সারাবিশ্বে আমরা চতুর্থ অবস্থানে আছি। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের প্রবৃদ্ধি এখন ৮ দশমিক ১৩। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কৃষকের। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা এবার পুষ্টির দিকে নজর দিচ্ছি। আমরা মাছ ও খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে আছি। এছাড়া তরি-তরকারি উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে আছি। রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষিপণ্য যেন প্রাধান্য পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ভূমিহীনদের ভূমি দিচ্ছি। গৃহহীন-ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম করে দিচ্ছি। যার কিছুই নেই অন্তত আশ্রয়ন প্রকল্পে থাকার জায়গা দিচ্ছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও আর গৃহহারা থাকবে না। তাদের প্রত্যেকের যেন মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়, আমরা সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সম্মেলনে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা এসেছেন। তারা তাদের অধিবেশনে নেতা নির্বাচন করবেন। আমি কৃষক লীগের এই সম্মেলনের সফলতা কামনা করছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষক লীগে স্বচ্ছ নেতৃত্ব উপহার দেবেন : ওবায়দুল কাদের

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে কৃষক লীগে ক্লিন ইমেজের (স্বচ্ছ) নেতৃত্ব উপহার দেবেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যেন স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিত্ব কৃষক লীগের নেতৃত্বে আসতে পারে, সেদিকে নেতাকর্মীদের নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, গত ৪৪ বছরে সবচেয়ে কৃষকবান্ধব সরকার শেখ হাসিনার সরকার। সবচেয়ে সৎ ব্যক্তি, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, বিচক্ষণ নেতা, দক্ষ প্রশাসক, সফল কূটনীতিকের নাম শেখ হাসিনা। যার উন্নয়ন অর্জন শুধু এদেশে নয়, সারা বিশ্বে সমাদৃত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু কে বলে বঙ্গবন্ধু নেই। বঙ্গবন্ধু থাকবেন লাঙলের ফলায়, থাকবেন শ্রমিকের হাতুড়ি-গাইতিতে, থাকবেন লালনের একতারায়।