কোরবানির পশুর হাটে সিন্ডিকেট : বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন

image

সিন্ডিকেটের কারণে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট থেকে কাক্সিক্ষত রাজস্ব পাচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। প্রতিবছর অন্তত ৬০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সংস্থা দুটি। ঈদুল আজহা উপলক্ষে বসা এই হাটগুলো থেকে ইজারাদাররা বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করলেও নামমাত্র মূল্যে ইজারা দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। লভ্যাংশের পুরোটাই ঢুকছে ইজারাদারের পকেটে। তবে ইজারাদাররা বলছেন তারা নিয়ম মেনেই ইজারা নেন। প্রাতি বছর ঢাকায় চার থেকে পাঁচ লাখ পশু কোরবানি হয়। এই বিপুল পরিমাণ পশু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ইজারা দেয়া হাট থেকেই ক্রয় করেন রাজধানীবাসী। প্রতিটি পশু বিক্রি বাবদ ৫ শতাংশ হারে হাসিল আদায় করেন ইজারাদাররা। যা থেকে প্রায় শত কোটি টাকার মতো হাসিল আদায় হয়। কিন্তু ইজারাদারদের শক্ত সিন্ডিকেটের কারণে হাট ইজারা দেয়ার সময় এই অর্থের সামান্যই ইজারার অর্থ হিসেবে পায় সিটি করপোরেশন।

চলতি বছর রাজধানীতে বসছে ২৩টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট। এসব হাটে প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার গরু-ছাগল বিক্রির সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৮০ হাজার ১৪৫টি গরু এবং ৪৬ হাজার ৭৯১ ছাগল বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর হাটে ২ লাখ ৮০ হাজার ১৪৫ গরু বিক্রি থেকে ৮৪ কোটি ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং ৪৬ হাজার ৭৯১টি ছাগল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা হাসিল আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮৬ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টাকা হাসিল আদায় হবে। কিন্তু এবার ২৩টি হাট ইজারা দিয়ে দুই সিটি করপোরেশন রাজস্ব পাচ্ছে ২২ কোটি ২৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। অর্থাৎ হাটের হাসিল হিসেবে আদায় করা অর্থের মাত্র এক চতুর্থাংশ পাচ্ছে ইজারা মূল্য।

দুই সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবার ঈদে চার লাখের অধিক পশু কোরবানি হবে। এসব পশু বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করবেন ইজারাদাররা। ইজারাদাররা কী পরিমাণ অর্থ আদায় করতে পারেন গত কয়েক বছরের হিসেব থেকে একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

২০১৮ সালে রাজধানীর কোরবানির হাটগুলোতে গরু-ছাগল বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৪১৩টি। ২ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৫টি গরু এবং ৪৪ হাজার ৫৬৩টি ছাগল বিক্রি হয়েছে। গরু বিক্রি করে ইজারাদার হাসিল আদায় করেছেন ৮০ কোটি ৪১ লাখ ৫০০ টাকা এবং ছাগল বিক্রি করে হাসিল আদায় করেছেন ২ কোটি ২২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ওই বছর রাজধানীর ২৩টি পশুর হাট থেকে ইজারাদার ৮২ কোটি ৬৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকার হাসিল আদায় করলেও হাট ইজারা দিয়ে দুই সিটি করপোরেশন রাজস্ব পেয়েছে ২১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

২০১৭ সালে রাজধানীর হাটগুলোতে পশু বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৫৪১টি। ২ লাখ ৫৪ হাজার ১০০টি গরু এবং ৪২ হাজার ৪৪১টি ছাগল বিক্রি হয়েছে। ওই বছরে গরু বিক্রি করে ইজারাদাররা হাসিল আদায় করেছেন ৭৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং ছাগল বিক্রি করে হাসিল আদায় করেছেন ২ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকা। রাজধানীর ২০টি পশুর হাট থেকে ৭৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকার হাসিল আদায় হলেও দুই সিটি করপোরেশন হাট ইজারা দিয়ে রাজস্ব পেয়েছে মাত্র ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

২০১৬ সালে রাজধানীতে ২২টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় হাটগুলো ইজারা দেয়া হয়। ওই বছর স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেয়া এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাটগুলোতে গরু-ছাগল বিক্রি হয়েছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার। এর মধ্যে গরু বিক্রি হয়েছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৫টি, হাসিল ৭২ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। আর ছাগল বিক্রি হয়েছিল ৪০ হাজার ৪২০টি, হাসিল ২ কোটি ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। সর্বমোট ইজারাদাররা হাসিল আদায় করে ৭৪ কোটি ৯০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

২০১৫ সালে ১৪টি হাট ইজারা দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার ৯৯৯ টাকা রাজস্ব পায়। ইজারাদাররা পশু বিক্রি থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার হাসিল আদায় করেন। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন ৯টি হাট ইজারা দিয়ে ৫ কোটি ৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৭২ টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু হাটে প্রায় ৬০ কোটি টাকা হাসিল আদায় করা হয়। অর্থাৎ দুই সিটি করপোরেশনকে ৯ কোটি ৪৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭১ টাকা রাজস্ব দিয়ে ইজারাদাররা আয় করেছে ৯০ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৪২৯ টাকা।

দুই করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ থেকে জানা গেছে, সরকারি হাট-বাজারগুলোর ব্যবস্থাপনা, ইজারা পদ্ধতি এবং তা থেকে প্রাপ্ত আয় বণ্টন সম্পর্কিত নীতিমালা ২০১১ অনুযায়ী হাট ইজারা দেয়া হয়। আর বিধিমালা অনুযায়ী, ৩ বছরের গড় মূল্যের ওপর মাত্র ৬ শতাংশ বৃদ্ধি করার বিধান রাখা হয়েছে। এ কারণে সিটি করপোরেশন চাইলেও ইচ্ছেমতো ইজারামূল্য বাড়াতে পারছে না। ফলে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, আমরা উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করি। সবার সামনেই দরপত্র খোলা হয়। সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পান। কাক্সিক্ষত দর না পেয়ে আমরা কয়েকটির পুনঃদরপত্রও আহ্বান করেছিলাম।

ইজারামূল্য কেন বাড়ানো হয় না প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করা শর্তে ডিএসসিসির ঊধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে সব সময় সিন্ডিকেট কাজ করে। ২০১৭ সালে ৭টি হাট খাস আদায়ের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সিন্ডিকেটে রাজনৈতিক নেতাদের মতোই করপোরেশনের লোকও জড়িত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডিএনসিসি’র নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশনে আছেন। তারা আইনের মারপ্যাঁচ সব খুব ভালো করেই বোঝেন। আইন-কানুন সব ঠিক রেখে তারা এসব করে যাচ্ছেন।