দুটি লক্ষ্য-রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা : একান্ত সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান

image

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান

আমাদের সামনে দুটি লক্ষ্য- রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ গড়া। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সারথি হতে হবে। স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এটাই হোক বাঙালির প্রত্যয় : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। সত্তরের দশকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী এবং বুয়েটের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল ইউনিয়নের (ইকসু) ভিপি, তরুণ ছাত্রনেতা। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন পাক হানাদারদের নোয়াখালি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটি। চোখের সামনে জীবন উৎসর্গ করতে দেখেছেন সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের। বাংলাদেশের ৪৯তম বিজয় দিবস উপলক্ষে দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের গর্বিত অনুভূতির কথা ব্যক্ত করলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় পাঁচ দশক আগের সেই লোমহর্ষক দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সংবাদ এর স্টাফ রিপোর্টর ফয়েজ আহমেদ তুষার

সংবাদ : বাংলাদেশ এবার ৪৯তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে; আপনার অনুভুতি কি?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : এবারের বিজয় দিবসকে আমি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখছি। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী বা মুজিববর্ষ উদযাপনের ক্ষণ গণনা (কাউন্টডাউন) শুরু হয়ে গেছে। একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করেছে স্বাধীনতা, ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালাল চক্র তাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে তা বাস্তবে রূপ নিতে দেয়নি। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার স্বপ্ন পূরণের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। আমাদের সামনে এখন দুটি লক্ষ্য- রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ গড়া। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সারথি হতে হবে। স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এটাই হোক সবার প্রত্যয়।

সংবাদ : একাত্তরে প্রাক-মুক্তিযুদ্ধের সময়টা কেমন ছিল? আপনি সে সময় কোথায় ছিলেন?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, পরিপ্রেক্ষিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদানের ফলে এটি সবার কাছে ¯পষ্ট হয়ে উঠে যে, পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার সময় এসে গেছে। পরবর্তীতে ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও পাকিস্তানিদের ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি ও কালক্ষেপণ থেকে সবাই বুঝে গিয়েছিল দেশ ভাগের চূড়ান্ত সময় এসে গেছে। বাসা ঢাকায় হলেও নীবিড় অধ্যয়নের জন্য আমি হলেই থাকতাম। বুয়েটের আহসানউল্লাহ হল ছিল তখন আন্দোলন সংগ্রামের দুর্গ। আমরা প্রতিদিনের ঘটনার সঙ্গে আপডেট থাকতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) পাক সরকারের নজরদারিতে থাকায় প্রায়ই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক হতো আমাদের আহসানউল্লাহ হলে। তোফায়েল ভাই, সিরাজুল আলম খান, রাজ্জাক ভাই, নূরে আলম সিদ্দিকি, মাখন, খসরু, মন্টুসহ সিনিয়র নেতাদের অনেকেই এখানে আসতেন। এ সময় অনেক ছাত্র নেতাকে আমরা লজিস্টিক (থাকা-খাওয়া) সাপোর্ট দিয়েছি। হাসানুল হক ইনু তো বুয়েটেরই ছাত্র। সেলিম, ফরহাদ, মানিকও আসতেন। একাত্তরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের কথা- আমরা কয়েকজন রাতের বেলা ডেমরা এলাকায় যেতাম। সেখানে একটা নতুন মাটি কাটা পুকুরে (তখনও পানি জমে নি) উইং কমান্ডার খুরশিদ সাহেবের তত্ত্বাবধানে রাইফেল চালানো শিখতাম। আমি, আজাদ, হেলালসহ আরও কয়েকজন, এটা আমাদের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সংবাদ : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে কিছু বলুন। ওইদিন কি আপনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত ছিলেন।

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : মার্চের ৩ তারিখ আমরা দল বেঁধে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পল্টনের গণসমাবেশে যোগ দিলাম। পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্যে আমাদের রক্তে আগুন জ্বলে উঠল। এরই মধ্যে পাকিস্তান বিরোধী পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। যাই হোক, ৭ মার্চ আমরা সবাই মিলে রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জনসমাবেশে আগেভাগেই সমবেত হলাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে সেই জনসমুদ্রে স্বাধীনতার জোয়ার শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ হবে সবাই জানতো। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর যুদ্ধের জন্য সবাই মোটামুটি প্রস্তুতি নিতে লাগল। পিতা শওকত ওসমান (প্রথিতযশা কবি ও কালজয়ী কথাসাহিত্যিক) এর যোগ্য উত্তরসূরী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করলেন কবিতার ছন্দে- ‘৭ মার্চে বাঙালির নেতা, দিয়েছিল ডাক স্বাধীনতার। দিয়েছিল ডাক প্রস্তুত হও, শত্রু রুখতে যা আছে যার। মরতে শিখেছি দাবানো যাবে না, শুনেছি বজ্র কন্ঠ তার। রক্ত দিয়েছি আরও চাই দেব, সংগ্রাম মুক্তি স্বাধীনতার। হুকুম দেয়ার নাও যদি পরি, সব করে দেবে বন্ধ। দিব্য চোক্ষে দেখে ছিল জয়, ছিল নাকো দ্বিধা দ্বন্দ্ব।

বাঙালি শুনেছে বুকের গহিনে, নেতা যা বলেছে কথাতো তার। শুরু হয়েছিল শত্রু হটাও, তাইতো যুদ্ধ স্বাধীনতার।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ সম্প্রতি বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেসকো স্বীকৃতি দিয়েছে, বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

সংবাদ : ২৬ মার্চের গণহত্যা সম্পর্কে কিছু বলুন। ওইদিন আপনি কোথায় ছিলেন?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : সে সময় আমি হলেই থাকতাম। বাসা ছিল মোমেনবাগ (রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীতে)। মাঝে মাঝে বাসায় যেতাম। ২৫ মার্চে একটা কিছু হবে, সেটা অনেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। আমরা বুয়েটের কয়েকজন ছাত্র বোমা তৈরির প্ল্যান করলাম। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তোফাজ্জল স্যার আমাদের এক বিকার পারদ দেবেন বলেছিলেন বোমা বানানোর জন্য। সেদিনই (২৫ মার্চ) রটে গিয়েছিল আর্মি নামবে। সিনিয়র নেতারা বললেন আজ হলে থাকা যাবে না। তাই ওইদিন (২৫ মার্চ) পারদ নেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত হলো। সন্ধ্যায় বাসায় গেলাম। এরপর রাজারবাগের পুলিশ লাইনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা হলো। আমাদের মহল্লায় পুলিশের সদস্যদের মেইন রোডের বিভিন্ন বাড়ির বারান্দা ও ছাদে অবস্থান নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। যাতে তারা প্রয়োজনের সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। রাত এগারোটা কিংবা সাড়ে এগারোটা হবে। হঠাৎ বিকট শব্দে গর্জে উঠল সেনাবাহিনীর ট্যাংক। শুরু হলো ব্যাপক গোলাগুলি। ট্রেসার বুলেটের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল পুরো এলাকা। পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধ করা অসম্ভব হওয়ায় তারা অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হলো। আমরা সপরিবারে মহল্লার ভেতর রহমান চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। পরদিন সকাল বেলা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আসি। দেখি চার পাশের সব কিছু ল-ভ-, সব তছনছ, চারদিকে বুলেটের চিহ্ন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পুলিশ সদস্যদের মৃতদেহ। মহল্লার ছেলেদের নিয়ে আহত পুলিশদের সাহায্যে এগিয়ে আসলাম। তাদের রাইফেল লুকানোর ব্যবস্থা করলাম। সাধারণ পোশাক পড়িয়ে পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে দিলাম। জানতে পারলাম রাজধানীতে অগণিত মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরই মাঝে যে যার যার মতো ঢাকা ছাড়তে শুরু করলো। ২৬ তারিখ কারফিউ ছিল। ২৭ তারিখ খুব সম্ভবত দুই ঘন্টার জন্য কারফিউ তুলে নিল। এই ফাঁকে আমি প্রথমেই ইকবাল (সার্জন জহুরুল হক হল) হলে গেলাম। দেখি মাঠের মধ্যে পড়ে আছে ছাত্রদের মরদেহ, চারদিকে রক্তের দাগ। এরপর বুয়েটের লিয়াকত (সোহরাওয়ার্দী) হলে গিয়ে দেখি সেখানেও কয়েকজন ছাত্রের মৃতদেহ পড়ে আছে। হলের পাশের পলাশী ফায়ার সার্ভিস অফিসের সবাইকে গুলি করে হত্যা করেছে পাক- সৈন্যরা। এসব দেখে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম পুনরায় কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই।

সংবাদ : মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে অংশ নিলেন? ভারতে প্রশিক্ষণ এবং দেশে ফিরে হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণের দু-একটি ঘটনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলবেন কি?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : ভেবেছিলাম ঢাকায় থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলব। তবে তা আর সম্ভব হলো না। ২৮ মার্চ নিরুপায় হয়ে ঢাকা ছাড়তে হলো। বুড়িগঙ্গা পার হয়ে প্রথমেই গেলাম রুহিতপুরে শিল্পী এমদাদ সাহেবের বাড়ি। সেখানে তার পরিবারে সদস্যদের সঙ্গে কিছুদিন থাকলাম। এরপার গেলাম মুন্সীগঞ্জে শিল্পী প্রাণেশ ম-লের বাড়ি। ভারতে যাওয়ার কোন লিংক পাচ্ছিলাম না। মে মাসে ন্যাপের এক নেতার সঙ্গে দাউদকান্দি য্ওায়ার পথে শুনলাম পাক কনভয় টহল দিচ্ছে। চায়ের দোকানদার বললো, প্যান্ট দেখলে সন্দেহ করবে। তাড়াতাড়ি করে লুঙ্গি পড়ে নিলাম। সেখান থেকে গভীর রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নৌকায় করে রওনা হলাম। মাউচ্ছা খাল নামের একটা এলাকায় নেমে পড়তে হলো। নৌকা আর যাবে না। নিñিদ্র অন্ধকারে ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে কতক্ষণ হেঁটেছি মনে নেই। দূরে একটা ছোট্ট আলো দেখে আশা জেগে উঠল। সামনে গিয়ে দেখি পান-বিড়ির দোকান। ওখান থেকে আমাদের ফ্যাকাল্টির এক পিয়নের বাড়ি গিয়ে উঠলাম। তার বাড়িতে থেকেই পায়েলগাছা কলেজের ছাত্রলীগ নেতা নয়ন ও তার বন্ধুদের সহেেযাগিতায় চৌদ্দগ্রাম দিয়ে আগারতলায় পৌঁছলাম। গন্তব্য আগারতলা বরদোয়ালী ক্যাম্প। সেখানে কিছুদিন থেকে ট্রেনিং এ অংশ নিলাম তেজপুরে। কমান্ডারদের জন্য বিশেষ ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশে ঢুকে বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশ নিয়ে সফলভাবে পাক সেনাদের পরাজিত করি। এর মধ্যে বেতিয়ার যুদ্ধ, বহুল আলোচিত। আজাদ, দুদু, বশীর, আওলাদসহ ৯ জন শহীদ হলো। সেখানে তাদের স্মরণে একটা শহীদ মিনার হয়েছে। আরেকটি খুবই সাকসেসফুল যুদ্ধ ছিল বজরা অপারেশন। সেখানে একটা হাসপাতালে পাক হানাদারদের ক্যাম্প ছিল। আমরা লোকাল গেরিলাদের সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ করলাম। পাক সেনাদের ৯০ জনের মত নিহত হলো, আমাদের শহীদ হয়েছিল একজন।

সংবাদ : একাত্তরের ডিসেম্বরে কোথায় ছিলেন?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : ডিসেম্বরে চাঁদপুর, দোহার হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করলাম। বুয়েটে গেলাম। এরপর পুরান ঢাকার ক্যাম্পে গিয়ে উঠলাম। আমাদের পাশের ক্যাম্পে ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীরবিক্রম)। ক্যাম্পে অবস্থানকালে আমাদের কাজ ছিল রাজাকার, আলবদর, স্বাধীনতাবিরোধী দালালদের ধরা। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পরিকল্পনা মাফিক দালাল ধারার কাজ করেছি। এ সময় দেশের বেশির ভাগ জেলাই হানাদার মুক্ত হয়ে যায়। বিজয় ছিল দ্বারপ্রান্তে; কেবল ঘোষণা বাকী। এরপর এলো ১৬ ডিসেম্বর। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই মহেন্দ্রক্ষণ। পৃথিবীর বুকে স্থান করে নিলো লাল-সবুজের পতাকাবাহী নতুন একটি দেশ। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলোচনায় বসার সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েও তার সঙ্গে দেখা করেছি; তার উপদেশ শুনেছি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন বিজয়ের পূর্ণতা যেন অসম্পূর্ণ ছিল। সবাই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় ছিলাম। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা এবং লাখো বাঙালির বরণ করে নেয়ার মধ্য দিয়েই বিজয়ের আনন্দ পূর্ণতা পায়।

সংবাদ : স্বাধীনতার পাঁচ দশকে প্রাপ্তি কতটুকু?

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান : একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তণের পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরে তার নেতৃত্বে দেশ আর্থ-সমাজিক উন্নয়নের পথে চলতে শুরু করে। তিনি বেঁচে থাকলে অনেক আগেই আমরা উন্নত, সম্মৃদ্ধ দেশে পরিণত হতাম। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমি যেমন গর্বিত; তবে লজ্জিত এই কারণে যে এই স্বাধীন দেশেই নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে। তাও সপরিবারে। প্রাণ দিতে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন জাতীয় চার নেতাকে। এখনও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সদর্পে ঘুরে বেড়ায়, এই বাংলার মাটিতে। অথচ নতুন প্রজন্ম এসব ইতিহাস ভালোভাবে জানে না। ভালো লাগে এই ভেবে, দীর্ঘদিন পরে হলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার হত্যার বিচার করেছেন এবং রায়ও কার্যকর হয়েছে। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও শুরু করেছেন; যা চলমান আছে। স্বস্তি পাই এই ভেবে, এই দেশ অচিরেই রাজাকার মুক্ত হবে হবে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস ভালোভাবে জানাতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের, সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুফল পেতে চাইলে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ তার নেতৃত্বেই নতুন প্রজন্মকে আমরা উপহার দিতে পারব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’।