পশুর হাট সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা!

image

সরকার করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একদিকে সীমিত পরিসরে অফিস-আদালত ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণ শনাক্তের পরও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৮টি স্থানে পশুর হাট বসানোর আয়োজন করছে। এর ফলে আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশে ব্যাপকভাবে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কোরবানির ঈদের পর পশুর বর্জ্য, চামড়া ও রক্তের কারণে পরিবেশও বিপন্ন হতে পারে। এছাড়াও দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই জনসমাগম ঘটে-এমন সবধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। গণপরিবহন চালু হলেও মানুষ খুব বেশি চড়ছে না, মার্কেট ও দোকানপাট খোলার অনুমোদন দেয়া হলেও সেখানে মানুষের তৎপরতা নেই; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চলছে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনও সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ ছুটি না থাকলেও প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে কর্মীদের আনাগোনা খুবই কম। অন্যান্য সরকারি দফতরে কার্যক্রম চলছে সীমিত পরিসরে; কোথাও কোথাও অনলাইনে জরুরি কার্যক্রত পরিচালনা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাকালে পশুর হাটের কারণে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে রাজধানী ঢাকা। বাড়তে পারে করোনা সংক্রমণ। করোনা ঠেকাতে এমনিতেই সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ কেউ মানছে না। এই অবস্থায় পশুর হাট বসলে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটতে পারে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ‘আবুধাবির একজন বিজ্ঞানীর গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। অনুরূপ নতুন কোভিড-১৯ মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারবে বলে এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন। আর ল্যাবরেটরিতে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাঁচতে পারবে।’

করোনা আতঙ্কের মধ্যেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে এবার ২৪টি স্থানে কোরবানির পশুর হাট নির্ধারণ করা হয়েছি; এর ঢাকা উত্তরের ১০টি এবং দক্ষিণে ১৪টি। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় উত্তরের ৬টি বাতিল করা হয়। এ হিসেবে রাজধানীতে হাট বসছে ১৮টি। পরিবেশবিদদের প্রস্তাব, প্রান্তিক খোলা জায়গায় পশুর হাট বসানো উচিত। শহর অভ্যন্তরে খেলার মাঠ, রাস্তা-ঘাট ও উন্মুক্ত স্থানে পশুর হাট বসার অনুমোদন দেয়াই উচিত নয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আবাসিক এলাকার পরিবেশও বিপন্ন হয়। ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. দেবব্রত বনিক সংবাদকে বলেন, ‘দেশে এখন করোনার মূল ঢেউ চলছে। এখন গবাদি পশুর হাট বসলে সেখানে জনসমাগম বাড়বে; মানুষের মুভমেন্ট (চলাচল) হবে। বড় আকারের গরুর হাট না বসিয়ে এলাকাভিত্তিক অন্যভাবে কিংবা অনলাইনে গরু বেচাকেনা করা যেতে পারে।’

জানা গেছে, করোনাকালীন পরিস্থিতিতে কোরবানি ঈদের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে গত ১ জুলাই একটি সভা করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি। সভায় বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশে ঈদ সামনে রেখে কী করছে, তা নিয়ে আলোচনা করেন কমিটির সদস্যরা। তারা সরকারের কাছে দেয়ার জন্য কিছু প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।

এ কমিটির এক সদস্য বলেন, গত ঈদের পরপর করোনা সংক্রমণ বেড়েছিল। এবারও আশঙ্কা করা হচ্ছে, কোরবানির ঈদকে ঘিরে সংক্রমণ বাড়তে পারে। গত ঈদের আগেও এ কমিটি কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছিল। মানুষের চলাফেরা সীমিত রাখতে প্রয়োজনে সান্ধ্য আইন জারির প্রস্তাব করেছিল। এবারও ওই পরামর্শের পাশাপাশি শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ঈদের আগের ও পরের তিন দিন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এ ব্যাপারে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান সংবাদকে বলেছেন, ‘কোরবানি ওয়াজিব; এটা হজের অংশ, সবার জন্য ফরজ নয়। এটা কোন আবশ্যিক বিষয় নয়। না করলে কোন অসুবিধাও নেই।’

গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ করোনা শনাক্ত হয়। করোনায় দেশে প্রথম মৃত্যু ঘটে গত ১৮ মার্চ। ৪ জুলাই শনিবার পর্যন্ত দেশে এক লাখ ৫৯ হাজার ৬৭৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে করোনায় বাংলাদেশে এক হাজার ৯৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশে করোনা সংক্রমণ এখনও ঊর্ধ্বমুখী। ৪ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে তিন হাজার ২৮৮ জনের করোনা শনাক্ত হয় এবং ২৯ জনের মৃত্যু হয়। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগস্টের মাঝামাঝি শনাক্তের সংখ্যা তিন লাখ ৮০ হাজার থেকে চার লাখের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। আর ঈদের সময় নাগরিকদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সৌদি আরবসহ একাধিক দেশে সংক্রমণ হার একের নিচে এসেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকান্ড উন্মুক্ত করে দেওয়ার কিছুদিন পর সংক্রমণ বাড়তে থাকে।’

বিভিন্ন দেশ কঠোর লকডাউন কার্যকর করে করোনা ঠেকালেও বাংলাদেশে করোনা সংক্রমন ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে পাঁচ/সাত দফা সাধারণ ছুটির ঘোষণা করা হয়। ছুটি কার্যকরে প্রায় সারাদেশেই দেখা যায় ঢিলেঢালা ভাব। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘরে থাকা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা বা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়নি। প্রশাসনও কঠোর হতে পারেনি।