পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করেছে

image

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ বলেন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ডিপার্টমেন্ট, ইভনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও ইনস্টিটিউটের ছড়াছড়ি। নিয়মিত কোর্স ছাড়াও এসব বাণিজ্যিক কোর্সের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে। এসব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু লাভবান হচ্ছে এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও এক শ্রেণীর শিক্ষক কিন্তু ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। তারা নিয়মিত নগদ সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যায় মেলায় পরিণত হয়। আবার কিছু শিক্ষক নিয়মিত কোর্সের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু ইভনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে তারা খুবই সিরিয়াস। কারণ, এগুলোতে নগদ প্রাপ্তি থাকে।

৯ ডিসেম্বর সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সাইটেশন পাঠ করেন ও ভাষণ দেন। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কসমিক রে রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তাকাকি কাজিতা সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে তাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রি প্রদান করা হয়। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এ সময় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীনসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য ও একাডেমিক পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ৭৯ জন কৃতী শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীকে ৯৮টি স্বর্ণপদক, ৫৭ জনকে পিএইচডি, ৬ জনকে ডিবিএ এবং ১৪ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। সমাবর্তনে ২০ হাজার ৭৯৬ গ্র্যাজুয়েটকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামান সমাবর্তন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভনিং কোর্স নিয়ে আমার কিছু কথা রয়েছে এবং ভর্তির ব্যাপারেও আমরা কিছু কথা আছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন ইভিনিং কোর্স আমার কাছে ভালো লাগে না। এই শিফটের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যার পরে আর কোন পরিবেশ থাকে না। এখানে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সাবজেক্টে ২২টি কোর্স আছে। প্রতি কোর্সে সাড়ে দশ হাজার টাকা করে ২২টি কোর্সে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার মতো পড়ে। আমি শুনছি যে এর অর্ধেক শিক্ষকরা পান, আর অর্ধেক ডিপার্টমেন্ট পায়। ডিপার্টমেন্টের টাকা কি হয় জানি না। কিন্তু শিক্ষকরা টাকা পাচ্ছেন। আমি এটাও জানি যারা নাকি পিএইচডি, ডক্টরেট করা, সিনিয়র শিক্ষকরা যারা আছেন, তারাই ক্লাস নেন। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পয়সা সততার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপাচার্য ও শিক্ষকদের। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক ও অ্যাকাডেমিক লিডার। কিন্তু কোন কোন উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কি তা ভুলে গেছেন। গবেষণা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ। গবেষণার মান নিয়েও এখন নানা কথা ওঠে। পদোন্নতির জন্য গবেষণা, না মৌলিক গবেষণা তাও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক বিভাগেই এখন অন্য পদের শিক্ষকের চেয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। অনেক শিক্ষকই প্রশাসনিক পদ-পদবি পেয়ে নিজে যে একজন শিক্ষক সে পরিচয় ভুলে যান।

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, লাশ হয়ে বা বহিষ্কৃত হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য নয়। কর্তৃপক্ষ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে এসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হতো। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। আমি আশা করব ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেবে।

সমাবর্তন বক্তা অধ্যাপক ড. তাকাকি কাজিতা বলেন, জীবনে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করতে হলে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ আমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি। এই গবেষণা আমার একটি লক্ষ্য ছিল। আমি মৌলিক ও রহস্যপূর্ণ কণা নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করি। এতে দেখা গেলো, নিউট্রিনোর ভর আছে এবং এরা এদের রূপান্তরের পরিক্রমায় বিভিন্ন পরিচয়ে বিদ্যমান থাকতে পারে। এটি খুবই হালকা নিরপেক্ষ একটি কণা; যা পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার ফলে তৈরি। নিউট্রিনোর উৎপত্তিগতভাবে পরিবেশ দুটো ভিন্ন পরিচয়ে বিদ্যমান। এই উদ্ভাবনের ফলে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে যাবে। মূল কথা হলো- আমি এই লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়েছি এবং সাফল্যও পেয়েছি। কাজেই শিক্ষার্থীদেরও এভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তাহলে সাফল্য একবার না একবার আসবেই।

ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতবর্ষকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণা ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। যুগের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে।