বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

image

‘বাবার বাড়ি বেড়ানো’ শেষে দেবী দুর্গা এক বছরের জন্য ফিরে গেলেন ‘কৈলাসের শ্বশুরালয়ে’; সমাপ্তি হল বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় পার্বণ শারদীয় দুর্গোৎসবের। মহামারি করোনাকালে এবার ছিল না শোভাযাত্রার সেই সমারোহ, তারপরও তো বিজয়া দশমী, ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবীর দেবালয়ে ফেরার দিনে ঢাকের বাদ্য আর অশ্রুভেজা ভালোবাসায় তাকে বিদায় জানালো মর্ত্যের বাসিন্দারা। এবার সপ্তমী শুক্রবার হওয়ায় হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী দুর্গা এবার এসেছিলেন দোলায় চেপে। আর গতকাল সোমবার দশমীতে দেবালয়ে ফিরলেন হাতির পিঠে চড়ে। ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় ‘আনন্দময়ীর’ নিদ্রাভঙ্গের বন্দনায় যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, গতকাল সোমবার দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনে তার সাঙ্গ হল।

সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীপক্ষের শুরু হয় যে অমাবস্যায়, সেদিন হয় মহালয়া; আর মহালয়ার প্রাক সন্ধ্যায় ‘কাত্যায়নী মুনির কন্যা’ রূপে মহিষাসুর বধের জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু পঞ্জিকার হিসাবে এবার আশ্বিন মাস ‘মল মাস’, মানে অশুভ মাস। সে কারণে ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়া হলেও দেবীর পূজা এবার হয়েছে কার্তিক মাসে। নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার বিকালে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবার। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পেরিয়ে সোমবার সকালে বিজয়া দশমীর ‘বিহিত পূজায়’ ষোড়শপ্রচার পূজার পাশাপাশি দেবী প্রতিমার হাতে জরা, পান, শাপলা ডালা দিয়ে আরাধনা করা হয়। সবশেষে দর্পণ বিসর্জনের সময় প্রতিমার সামনে একটি আয়না রেখে তাতে দেবীকে দেখে তার কাছ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য বিদায় নেন ভক্তরা।

কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোমবার বেলা দেড়টায় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের বীণাস্মৃতি স্নানঘাটে বনানী জাকের পার্টির হিন্দু ফ্রণ্ট পূজাম-পের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর যে শোভাযাত্রা হবে না, তা আগেই জানানো হয়েছিল।এ বছর ঢাকা মহানগরে দুইশর বেশি মণ্ডপে পূজা হয়েছে। সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে, যার যার মত করে এসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেবে।

কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মিজানুর রহমানবলেন, প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি নৌ-পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা নদীবন্দরে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম-পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, প্রতিমা বিসর্জন যাতে সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়, বিআইডব্লিউটি থেকে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিআইডব্লিটিএ-এর ডুবুরি দল ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে বুড়িগঙ্গার তীরে রাখা হয়েছিল জরুরি প্রয়োজনে মাঠে নামার জন্য। ঢাকায় ওয়াইজঘাট ছাড়াও বসিলায় তুরাগে এবং সবুজবাগ এলাকার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। দুপুরের পরপরই বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ঘাটের পথে রওনা হন ভক্তরা। শঙ্খ আর উলুধ্বনির সঙ্গে চলে খোল-করতাল-ঢাক-ঢোলের সনাতনি বাদ্য।

প্রতিমা ঘাটে নেওয়ার পর ভক্তরা শেষবারের মতো ধূপধুনো নিয়ে আরতি করেন। শেষে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে নৌকায় তুলে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জন শেষে মন্দিরে শান্তির জল নিয়ে আসা হয়; সন্ধ্যায় মণ্ডপে করা হয় আশীর্বাদ।

সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, এক বছর পর নতুন শরতে আবার দেবী আসবেন ‘পিতৃগৃহ’ এই ধরণীতে। শাস্ত্রমতে, শরৎকালে অর্থাৎ দক্ষিণায়নে সব দেব-দেবীর মতো দেবীদুর্গাও নিদ্রিত থাকেন। শারদীয় দুর্গাপূজার বোধন হচ্ছে নিদ্রিত দেবীকে জাগ্রত করা। শরৎকালে অকাল বোধনের দ্বারা দেবীকে জাগ্রত করা হয় বলে দুর্গার অপর নাম শারদীয়া। শরৎকালে এই দুর্গাপূজা হয়, তাই তাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয়।

চণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গা শব্দের অর্থ জীবের দুর্গতি হননকারী। আরেকটি অর্থ দুর্জয়া। জীবকে দুর্গতিতে ফেলা ‘দুর্গম’ নামক অসুরকে বধ করায় দেবী মায়ের নাম হয় দুর্গা। দুর্গমকে বধ করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবগণকে হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দেন তিনি এবং দুর্গতির হাত থেকে জীবকে রক্ষা করেন। এ কারণেই তাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী।

টানা পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রথম দিন পূজার ষষ্ঠীতে দেবীর ষষ্ঠাদিকল্প অর্থাৎ আবাহন, বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস প্রভৃতি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ষষ্ঠীতে সন্ধ্যাকালে দেবীর বোধন হয়। শাস্ত্রমতে, দেবীর বোধন হয় বিল্ববৃক্ষে বা বিল্বশাখায়। অন্যদিকে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিমায় দেবীর অর্চনা করা হয়ে থাকে। পূজার অষ্টমীতে বিশেষ অনুষ্ঠান অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিতে দেবীর বিশেষ পূজা ‘সন্ধিপূজা’। অষ্টমী তিথিতে কুমারী বালিকাকে পূজা করা হয়। দক্ষিণ ভারতে কন্যাকুমারী মন্দিরের কুমারী প্রতিমা পূজা দেবীদুর্গারই ঐতিহ্য বহন করে। ১৯০১ সালের ১৮ অক্টোবর স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজায় কুমারীপূজা করেছিলেন।

সনাতন বিশ্বাসমতে, কুমারীপূজা মাতৃভাবে ঈশ্বরেরই আরাধনা। কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা করে জগজ্জননীর উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দুর্গাপূজার অষ্টমী বা নবমীতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছরের একটি কুমারীকে প্রতিমার পাশে বসিয়ে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। দুর্গাজ্ঞানে পূজা করে সবার মধ্যে মাতৃভাবেরই সঞ্চার করা হয়। প্রায় সর্বজাতিয়া কন্যাকেই কুমারীরূপে পূজা করা হয়। তবে স্বত্বগুণসম্পন্না শান্ত, পবিত্র, সত্যশীলা ও দৈব সম্পদের অধিকারিণী কুমারীকেই জগজ্জননীর প্রতিমারূপে গ্রহণের বিধি আছে। পাখি যেমন একটি ডানায় উড়তে পারে না, সমাজও তেমনি শুধু পুরুষশক্তি দ্বারা চলতে পারে না। কুমারীপূজা নারীকে মূল্যায়নের একটি সর্বোচ্চ শাস্ত্রীয় বিধি। যদিও এ বছর করোনার কারণে রাজধানীতে কোন কুমারীপূজার আয়োজন করা হয়নি।

পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজনে প্রতিটি পূজাম-পে ছিল ঢাকঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্য, ধূপ আরতি ও দেবীর পূজা-অর্চনায় ভরপুর। সেই সঙ্গে ছিল করোনামুক্ত বিশ্বের প্রার্থনাও। করোনা মহামারির মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এ ধর্মীয় উৎসবে স্বাস্থ্যবিধি মানার একটা তাগিদ ছিল। সে তাগিদ যেমন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, তেমনি ব্যক্তি পর্যায়েও। এখানে ধর্মীয় আচারকে গুরুত্বের জায়গায় রেখে বৈশ্বিক মহামারির ব্যাপারে সচেতন থেকেছেন সবাই। প্রতি মা’তে-ই প্রতিমা আছে। এবার ঘরে থাকুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ রকমন পোস্ট দিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেকেই।

রাজধানীর প্রধান পুজামণ্ডপ ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, বনানী মাঠ পূজামণ্ডপ, জয়কালী মন্দিরসহ অন্যান্য পূজামণ্ডপে হ্যান্ড স্যানিটাইজিং স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছিল। বাঙালির চিরায়ত সম্প্রতির বন্ধন এবার পুজাও ছিল অটুট। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা করোনা মহামারির মধ্যেও পুজাপ-প পরিদর্শন করেছেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও বরাবরের মতো পুজাপ-প পরিদর্শন, বন্ধুদের সঙ্গে হৈহুল্লর করেছেন।পস্পরের মধ্যে উপহার সামগ্রী আদান-প্রদান হয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিজয়া দশমী উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেন।এছাড়াও জাতীয় দৈনিকগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।