রাজধানীতে দ্বিতীয় রেড জোন ওয়ারী : কাল থেকে লকডাউন

image

লকডাউনের প্রতীকি ছবি

পুরনো ঢাকার ওয়ারীকে রাজধানীর দ্বিতীয় রেড জোন ঘোষনার পর কাল শনিবার থেকে সে এলাকায় কঠোর লকডাউন করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এ লকডাউন চলবে ২১ দিন। রাজধানীর প্রথম রেড জোন হিসেবে পূর্ব রাজাবাজারের কঠোর লকডাউনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একই ধরনের লকডাউন করা হবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)’র ৪১ নাম্বার ওয়ার্ডের ওয়ারী এলাকায়। তবে জোন ভিত্তিক এই লকডাউনের ফলে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ প্রথম রেড জোন ঘোষণা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)’র ২৭ নাম্বার ওয়ার্ডের পূর্ব রাজা বাজার এলাকায় লকডাউন করেও করোনামুক্ত করা সম্ভব হয়নি। গত ৯ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২১ দিন লকডাউনের পরেও করোনা রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় রেড জোন মুক্ত হতে পারেনি পূর্ব রাজা বাজার এলাকা। এখনো পূর্ব রাজাবাজারে ৬০ জনের বেশী করোনাভাইরাসের রোগী আছে। তাই রোগী সংখ্যা বিবেচনা করে ওই এলাকায় এখন বাসা-বাড়ীতে লকডাউনের পরিকল্পনা করছে ডিএনসিসি। কিন্তু ঢাকা মহানগরীতে শুধু একটি-দু’টি এলাকা লকডাউন করে তেমন সুফল পাওয়া যাবে না। রাজধানীর ৪৫ টি রেড জোন এলাকায় দ্রুত লকডাউন কার্যকরের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন সংবাদকে বলেন, পূর্ব রাজাবাজারের লকডাউন কার্যকর করায় স্থানীয় কমিউনিটিকে যুক্ত করা খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ ছিল। রাজাবাজারের স্থানীয়রা যখন সেখানকার বাসিন্দাদের বাসায় গিয়ে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করেছে, নমুনা সংগ্রহে সাহায্য করেছে, তখন বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরণের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। নিজেদের এলাকার মানুষজনের সহায়তার ফলে বাসিন্দারাও সঠিক তথ্য দিয়েছেন, যেটা এর আগে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নি। তবে শহরের শুধুমাত্র একটি এলাকা ‘রেড জোন’ হিসেবে থাকার কারণে রাজাবাজারের লকডাউন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জিং ছিল। একসাথে বেশ কয়েকটি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করলে এই ধরণের পদক্ষেপের সুফল আরো দ্রুত পাওয়া সম্ভব। তাই রাজধানীর অন্যান্য রেড জোনে দ্রুত লকডাউন কার্যকরের পরামর্শ দেন তিনি।

পূর্ব রাজাবাজারের লকডাউন পর্যালোচনা করে ডিএনসিসি’র মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে এই এলাকার পরিস্থিতি অনেক উন্নতি হয়েছে। পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফেইজ-১ শুরু হয়। গত তিন সপ্তাহ পরে আমাদের অভিজ্ঞতা এখানে ভালো। জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের পর থেকে এই এলাকায় সংক্রমণের হার কমেছে। তবে সংখ্যার দিক দিয়ে আমরা এখনও সেই অবস্থানে পৌঁছাইনি, যেখান থেকে এই এলাকায় রেড জোন হতে ইয়েলো জোনের দিকে নিয়ে যেতে পারি। এটি ছিল আমাদের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। যে সমস্ত ভবনে কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগী আছে তা লকডাউন থাকবে। শুধুমাত্র পূর্ব রাজাবাজারবাসীর সুবিধার্থে নমুনা সংগ্রহের বুথ আগের মতোই খোলা থাকবে। করোনার লক্ষণ কিংবা উপসর্গ আছে এমন সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হবে। সরকারি নির্দেশনাগুলো না মানলে পরিস্থিতি আগের মতো আরও খারাপ হতে পারে। তাই সবাই বাসায় থাকবেন, অত্যাবশ্যকীয় না হলে কেউ বাসা থেকে বের হবেন না। মাস্ক ছাড়া কেউ বাসা হতে বের হবেন না এবং সঠিক নিয়ম যেমন- নাকমুখ ঢেকে মাস্ক পরিধান করতে হবে। বাসার বাইরে সবসময় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। কমপক্ষে ৩ ফুট তবে ৬ ফুট দূরত্ব মেনে চলা বেশি ভালো। সাবান পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুতে হবে। কোনো কারণে সাবান না থাকলে হ্যান্ডস্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।

এদিকে ওয়ারী এলাকার শনিবার ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়ে চলবে ২৫ জুলাই পর্যন্ত। ওয়ারী এলাকার টিপু সুলতান রোড, জাহাঙ্গীর রোড, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে (জয়কালী মন্দির থেকে বলধা গার্ডেন) আউটার রোড এবং ইনার রোড হিসেবে লারমিনি রোড, হরে রোড, ওয়ার রোড, র‌্যানকিন রোড এবং নওয়াব রোড এই রেড জোনের আওতায় লকাডউন বাস্তবায়ন করা হবে বলে ডিএসসিসি’র সূত্র জানায়। এ সময় রেড জোনে ২১ দিন থাকবে সাধারণ ছুটি। এলাকার সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-কারখানা বন্ধ থাকবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা এ এলাকায় বসবাস করেন, তারাও থাকবেন ছুটির আওতায়। দোকান-পাট, বিপণি বিতান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখতে হবে, খোলা থাকবে শুধু ওষুধের দোকান। লকডাউন শুরু হলে রেড জোনে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া মানা। এ সব এলাকার ভেতরে সব ধরনের চলাচল বন্ধ, প্রবেশ বা বের হওয়ার সুযোগ থাকবে নিয়ন্ত্রিত বলে ডিএসসিসি’র সূত্র জানায়।

ডিএসসিসি’র ৪১ নাম্বার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সারোয়ার হাসান আলো সাংবাদিকদের বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে সব প্রস্তুতি আমাদের শেষ পর্যায়। শনিবার ভোর থেকে ২১ দিনের কার্যক্রম আমরা সুন্দরভাবে শুরু করতে পারব। সিটি মেয়র সব কিছু তদারকি করছেন। টাইম-টু টাইম খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

সরেজমিনে ওয়ারী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, লকডাউন বিষয়ে এলাকার বিভিন্ন সড়কে মাইকিংয়ে করে সতর্ক করা হচ্ছে স্থানীয় কমিশনারের পক্ষে। বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে বাঁশ দিয়ে বানানো হচ্ছে ব্যারিকেড। মোড়ে মোড়ে টানানো হয়েছে ‘লকডাউন’ লেখা ব্যানার। ২১ দিনের লকডাউনের কারণে শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন দোকান ও শপিংমলে ছিলো মানুষের কেনাকাঁটা ভিড়। তবে লকডাউন শুরুর আগের দিন শুক্রবার এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও অলি-গলিগুলো অনেকটাই ফাঁকা দেখা গেছে। তবে লকডাউন চলাকালে নিত্যপণ্যের দাম যেন স্বাভাবিক থাকে এই দাবী জানান স্থানীয়রা।