সিলেটে জঙ্গি গডফাদার ১৬ বছরেও শনাক্ত হয়নি

image

সিলেট থেকে নব্য জেএমবি’র যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের নেতৃত্বে ছিলো শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই নাইমুজ্জামান ২০১৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করলেও কফিশপে (বারিস্তা) কফি মেকার হিসেবে কাজ করতো।

এছাড়া ছাত্রজীবনে সে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় সদস্য ছিলো। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতো জঙ্গি ধরা পড়েছে তারা কোনো না কোনো ভাবে জামায়াতে ইসলামীর এ ছাত্র সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো বলে খবর বেরিয়েছে। এমনকি এদের গডফাদার হিসেবে জামায়াতের অনেক নেতার সম্পৃক্ততার কথা শোনা গেলেও গত ১৬ বছরেও এদের শনাক্ত করা যায়নি। মূলত সিলেটের সূর্যদীঘল বাড়ি থেকে কুখ্যাত জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী এ সংগঠনটির নাম বার বার আলোচনায় আসে। তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতার সময়ই সারা দেশের ন্যায় জঙ্গিরা সিলেট অঞ্চলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।

গত মঙ্গলবার সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান, সানাউল ইসলাম সাদি, রুবেল আহমেদ, আব্দুর রহিম জুয়েল ও সায়েম মির্জাকে গ্রেফতারের পর দু’টি বাসায় অভিযান চালিয়ে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাদের মূল টার্গেট ছিল হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে বড় ধরণের নাশকতা চালানো। এখানেই বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গ্রেণেড হামলায় কয়েকজন নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত তখনকার ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী।

সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে দেশে জঙ্গি হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। এরপরই আলোচনায় আসে সিলেট। কারণ বিগত দিনগুলোতে যে হামলা বা ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা বেশির ভাগই সিলেট অঞ্চলে। এখানকার পাহাড়ি-টিলাঘেরা এলাকা, বাসাবাড়ি ও ব্যাচেলর কোয়ার্টারে জঙ্গিদের ছিল নিরাপদ ঘাঁটি। এ নিয়ে গত ২৯ জুলাই দৈনিক সংবাদের অনলাইন ভার্সনে ‘‘জঙ্গি হামলার আশংকায় সিলেটে টিলা-পাহাড়ি এলাকা ও বাসাবাড়িতে নজরদারি’’ এবং ৩০ জুলাই প্রিন্ট ভার্সনে ‘‘জঙ্গি হামলার আশংকায় সিলেটে পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি’’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ হয়েছিল। ওই খবরে বলা হয়েছিল, ঈদুল আজহার আগে বা পরে যাতে এ ধরণের কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য আইনশৃংখলা বাহিনী অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আর এরই মধ্যে সফলতা পাওয়া গেছে নব্য জেএমবি’র পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতারের মাধ্যমে।

সিলেটে জঙ্গিবাদের উত্থাণ বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। তখনকার সময় এখানে ছোট ছোট ঘাঁটি গড়েছিল তারা। সেই সময়েই সিলেটের শাপলাবাগের সূর্যদীঘল বাড়িতে লুকিয়ে ছিল জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমানের মতো ভয়ংকর নেতারা। এছাড়া পার্শ্ববর্তী হাতিমবাগও ছিল তাদের জন্য নিরাপদ। সেসময় স্থানীয়রা জানিয়েছিলেন, রাতের আঁধারে কালো পাজেরো জিপে অনেকের যাতায়াত ছিল সূর্যদীঘল বাড়িতে। অভিযোগ ওঠে জামায়াত নেতাদের আশ্রয়েই শায়খ আবদুর রহমানের মতো জঙ্গিরা নিরাপদ মনে করেছিল সিলেটকে। তবে ওইসময় নিজেদের আড়াল করতে স্থানীয় আ’লীগ নেতাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরই জঙ্গি বিরোধী কঠোর অভিযান শুরু হলে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবুও বিচ্ছিন্ন ভাবে তারা অনেকটা জানান দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের মার্চে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আতিয়া মহলে জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। এই অভিযান চলার সময় ও পরে ১১ জনের মৃত্যু হয়। ফলে আইনশৃংখলা বাহিনীর ধারণা, সিলেট জঙ্গিদের জন্য অনেকটা নিরাপদ এলাকা। আর এ কারণেই এখানে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর ফলে গ্রেফতার হয় নব্য জেএমবি’র পাঁচ সদস্য।

সিটিটিসি-এর ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বুধবার বলেছেন, যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সেলের কয়েকজন পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারেও চেষ্টা চলছে। তবে গডফাদারদের শনাক্ত না করা পর্যন্ত সিলেট যে জঙ্গি তৎপরতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয় সেই আশংকা থেকেই গেছে।