সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে

image

সারা বিশ্বে বন উজাড় ও শিকারিদের দৌরাত্ম্যে বাঘ মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বাঘের কয়েকটি উপপ্রজাতি। বর্তমানে মাত্র কয়েকটি দেশে বাঘের অস্তিত্ব কোন রকমে টিকে আছে। এর প্রভাব পড়েছে বাঘের অন্যতম আবাসস্থল বাংলাদেশের সুন্দরবনেও। এখানে আশঙ্কাজনক হারে বাঘের সংখ্যা কমে গেলেও সর্বশেষ জরিপ বলছে, সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। এখন বাঘের সংখা মাত্র ১১৪টি। যেটি ২০১৫ সালের জরিপে ১০৬টি বাঘ পেয়েছিল। সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা ও তাদের বংশ বৃদ্ধির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। যে কারণে বাঘের সংখ্যা আবারও বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বন বিভাগ বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার জন্য বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। চলমান তথ্য-উপাত্ত ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কোন সুযোগ না থাকলেও আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণের সংখ্যা ধারণক্ষমতায় রেখে অবৈধ হরিণ শিকার বন্ধ, আবাসস্থলের উন্নয়ন ও নিয়মিত টহল প্রদান করে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বদ্ধপরিকর। যদিও বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে বাঘের শিকার প্রাণীর মধ্যে চিত্রা হরিণ, শূকর, ও বানর রয়েছে। বাঘের সংখ্যা বাড়াতে হলে শিকার প্রাণীর (হরিণ) সংখ্যা বাড়াতে হবে। এখনি সবাইকে আমাদের জাতীয় প্রাণী বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এই বিপন্ন প্রাণীটি আমাদের দেশ থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে।

সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে চোরাপথে বাঘের চামড়া পাচার ও কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। বাঘ ও শিকার প্রাণী (হরিণ, বুনো মহিষ, সাম্বার, শূকর ইত্যাদি) গোপনে নিধন ও পাচার হচ্ছে। বাঘসমৃদ্ধ বনাঞ্চল ধ্বংস করে গড়ে উঠছে ভারী শিল্প কলকারখানা, রাস্তাঘাট, জনবসতি, হাটবাজার ইত্যাদি। বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখনও সনাতনী ওষুধ, স্যাম্পু ও টনিকের জন্য বিশাল বাজার আছে চীনে। এ বাজার চাহিদা না কমাতে পারলে বাঘ সংরক্ষণ আরও সংকটে নিমজ্জিত হবে। এছাড়া বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি, বাঘসমৃদ্ধ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যানবাহন ও নৌচলাচল বৃদ্ধি পাওয়া বাঘ হ্রাস পাওয়ার কারণ। তাই জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোর জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণে যথাযথ সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করতে পারলে বাঘ শিকার বহুলাংশে বন্ধ করা যাবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন। এই বনভূমি অবস্থিত যা বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সুন্দরবনের ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ বিশ্ববিখ্যাত। তবে এই বাঘের সঠিক সংখ্যা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। যদিও বিভিন্ন জরিপে চালিয়ে আনুমানিক সংখ্যা বিভিন্ন সময় জানানো হয়েছে। ডব্লিউডব্লিউএফ (ওয়ার্ল্ড উইল্ডলাইফ ফন্ড) পরিচালিত ১৯৬৭ সালের বন্যপ্রাণী জরিপে গাই মাউনটফোর্ড ৫০-১০০টি বাঘের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর দীর্ঘদিন পর ১৯৭৫ সালে হেন্ডরিখ ৫৫টি কম্পার্টমেন্টে জরিপ চালিয়ে সুন্দরবনে ৩৫০টি বাঘের উপস্থিতির কথা জানানো হয়। পরে ১৯৮২ সালে রাসরি বন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষকদের সহায়তায় সুন্দরবন দক্ষিণ অভয়ারণ্যে ১১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ১৫টি বাঘের সন্ধান পান। বাঘের পদচিহ্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রয়োগে তারা এই সংখ্যায় উপনীত হয়। সেই নমুনার ভিত্তিতে সমগ্র সুন্দরবনে বাঘের আনুমানিক সংখ্যা ৪৫০টি বলে প্রচার করেন। তবে এই সংখ্যা কোন সার্বিক জরিপের ফলাফল নয়।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ বন বিভাগ এক প্রকল্পের আওতায় একজন বিদেশি বন্যপ্রাণিতত্ত্ববিদের সহযোগিতায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পুনরায় নিরূপণ করা হয়। ওইবার বাঘের পদচিহ্ন প্রয়োগে সুন্দরবনে ৩৬২টি বাঘের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয় বাঘের সংখ্যা ঘনত্ব প্রতি ১০ দশমিক ৯ বর্গ কিমিতে ১টি বাঘ : বাঘ-বাঘিনীর আনুপাতিক হার ১:২/৩; কিশোর ও শাবক ৪০ শতাংশ। বিভিন্ন সময় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নিয়ে নানা রকম তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে এক গণনায় বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৩৫০টি। এরপর ১৯৮১ সালে ৪৫০টি এবং ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ ছিল বলে দাবি করা হয়। ২০০০ সালে বাঘের থাবা চিহ্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে ইউএনডিপি ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঘ বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় বন বিভাগ ৪৪০টি বাঘের সংখ্যা নিরূপণ করেন। এরপর ২০১৫ সালে ‘স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন’ প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ ও উইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়া যৌথভাবে ক্যামেরা ট্রেপিং জরিপ পদ্ধতিতে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি নির্ধারণ করা হয়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে ১১৪টি বাঘ রয়েছে। সুন্দরবনে বাঘের বিচরণক্ষেত্র ৪ হাজার ৪৬৪ কিলোমিটার এলাকাকে আপেক্ষিক ঘনত্ব দিয়ে গুণ করে এই বাঘের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনে গত তিন বছরে বাঘের সংখ্যা ৮ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্লক অনুযায়ী বাঘের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (৩.৩৩ বাঘ/১০০ বর্গকিলোমিটার) এবং খুলনা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে কম (১.২১ বাঘ/১০০ বর্গ কিলোমিটার)। জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট চারটি ধাপে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা, স্মরণখোলা রেঞ্জের তিনটি ব্লকের ১৬৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিশেষ একধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের ১ হাজার ২০৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দুটি সেশনে ২৫৩ গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। পুনরায় ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে একই বছরের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত খুলনা রেঞ্জের ১৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি সেশনে ৯৬টি ক্যামেরা বসিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। একইভাবে ২০১৮ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে একই বছরের ১০ মে পর্যন্ত শরণখোলা রেঞ্জের ২৮৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় দুটি সেশনে ১৮৭ গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে জরিপ করা হয়। মোট চারটি ধাপে তিনটি ব্লকে ১ হাজার ৬৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে ২৪৯ দিন ধরে পরিচালিত ওই জরিপে ৬৩টি পূর্ণ বয়স্ক বাঘ, ৪টি জুভেনাইল বাঘ (১২-১৪ মাস বয়সী) এবং ৫টি বাঘের বাচ্চার (০-১২ মাস বয়সী) ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। যেহেতু সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের বিচরণক্ষেত্র ৪ হাজার ৪৬৪ বর্গকিলোমিটার। সে ক্ষেত্রে বাঘ গবেষণা ও জরিপে সর্বাধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এসইসিআর মডেলে তথ্য বিশ্লেষণ হয়। তাতে দেখা যায়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়নে ওয়াইল্ডটিম, স্মিথসোনিয়ান কারজারভেশন ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ বন বিভাগ সুন্দরবনে যৌথভাবে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা শুরু করে। ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৮ সালে। তবে ওই প্রকল্পের আওতায় এখনো বাঘ গবেষণা, সংরক্ষণ ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ চলছে বলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে বাঘ পৃথিবীর মাত্র ১৩টি দেশে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, বার্মা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ভুটান, নেপাল ও রাশিয়া অন্যতম। বাঘের ৮টি উপপ্রজাতির মধ্যে ইতিমধ্যে বালিনিজ টাইগার, জাভানিজ টাইগার ও কাম্পিয়ান টাইগার বিশ্ব হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাঘের ৫টি উপ-প্রজাতি (কোন রকমে টিকে আছে। এগুলো হল- বেঙ্গল টাইগার, সাইবেরিয়ান টাইগার, সুমাত্রান টাইগার, সাউথ চায়না টাইগার এবং ইন্দো-চায়না টাইগার। ১৯০০ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১ লাখ এবং বর্তমানে বাঘের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি। যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বাঘ রয়েছে ভারতে।

২০১৫ সালে আইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজাভেশন অব নেচার অ্যান্ড নেচারাল রিসোর্স) এবং ডব্লিউডব্লিউএফ (ওয়ার্ল্ড উইল্ডলাইফ ফন্ড) এর জরীপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যান্বোডিয়ায় কোন বাঘ নাই। বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ৪৪০টি থেকে ১০৩টি, ভারতে ১৭০৬ থেকে ২২২৬টি, চীনে ৪৫টি থেকে ৭টি, লাউসে ১৭ থেকে ২টি, ইন্দোনেশিয়ায় ৫০০ থেকে ৩৭১টি, মালোয়েশিয়ায় ৫০০টি থেকে ২৫০টি, থাইল্যান্ডে ২৫২টি থেকে ১৮৯টি, এবং ভিয়েতনামে ২০টি থেকে ৫টি তে নেমে এসেছে। তবে মায়ানমার বাঘ জরিপের কোন হালনাগাদ তথ্য পাওয়া য়ায়নি।

২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার ঘোষণা ছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জণে শুধুমাত্র ভারত, রাশিয়া, নেপাল ও ভুটান আংশিকভাবে সক্ষম হয়েছে। বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার এই প্রবনতা চলমান থাকলে আগামী কয়েক দশকে পৃথিবী থেকে এ সুন্দর প্রাণীটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সোমবার ২৯ জুলাই সোমবার পালিত হবে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস ২০১৯’। বাংলাদেশসহ বাঘ আছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ একযোগে দিবসটি পালন করবে। বাংলাদেশে বাঘ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘বাঘ বাড়াতে শপথ করি, সুন্দরবন রক্ষা করি’।