স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চরম দুর্বল

image

দেশের ৩২৮টি পৌরসভায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চরম দুর্বল। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। দক্ষ ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব। এসব পৌরসভায় প্রায় ৪ কোটি মানুষের বসবাস। অথচ জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। পৌরসভায় ঈদ বা ছুটির সময় জনসমাগম বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি না মানায় করোনাভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে বলে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জানান।

বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন থেকে জানা গেছে, করোনাভাইরাসে ৮ আগস্ট রোববার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৩৩ জন পৌর মেয়র, ৫৮ জন কাউন্সিলর ও ১৮৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ৪ জন কাউন্সিলর ও ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেন। পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ঢাকা ভিাগীয় সাধারণ সম্পাদক মো. ম ই তুষার এ তথ্য জানিয়েছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি জেলার একাধিক পৌরসভা রয়েছে। পৌরসভাগুলোর স্বাস্থ্য বিষয় পৌর কর্তৃপক্ষ দেখে। সেখানে দক্ষ জনবলের অভাব। জেলা পর্যায়ে আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পৌরসভা এলাকায় রয়েছে। দুর্বল পৌর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে পৌরসভায় মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। জেলার সিভিল সার্জনরা বলেন, জেলার পৌরসভাগুলোতে জনসমাগম বেশি হয়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। পৌরসভাগুলোর জন্য আলাদা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

জেলা সিভিল সার্জনদের তথ্যমতে, গত রমজান ও কোরবানির ঈদের সময় পৌরসভায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। স্বাস্থ্য বিধি না মেনে ঘোরাফেরা ও আড্ডা দেয়া থেকে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকে আক্রান্ত হলেও তথ্য গোপন রাখেন। তারা জ্বর ও সর্দি নিয়ে বাসায় থাকেন।

পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ঢাকা বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক ম ই তুষার মুঠোফোনে সংবাদকে জানান, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় উপজেলা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টের ব্যবস্থা করছেন।

এ কর্মকর্তা বলেন, দেশে ৩২৮টি পৌরসভায় ডাক্তার আছেন মাত্র ১০ জন। এরমধ্যে লাকসাম, সিরাজগঞ্জ, খাঁগড়াছড়ি, মাদারীপুর, নরসিংদী ও সাভার, পটুয়াখালীসহ ১০টি পৌরসভায় ডাক্তার আছেন। অন্যগুলোতে তা নেই। অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, ৩ থেকে ৪টি আরবান ক্লিনিক থাকলেও সেখানে করোনার সময়ও ডাক্তার ঠিকমতো পাওয়া যায় না। করোনাসহ নানা সমস্যার কারনে এ বছর ট্যাক্স আদায়ও বন্ধ রয়েছে।

পৌরসভা চিকিৎসক সমিতির সভাপতি ডা. আবদুস সামাদ ফকির পৌরসভাগুলোতে ডাক্তার ১০ থেকে ১১ জন থাকার কথা স্বীকার করে মুঠোফোনে বলেন, পৌরসভায় নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও হাসপাতাল নেই, কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আছে। মেডিকেল টিম দিয়ে করোনার নমুনা কালেকশন করা হয়। কিন্তু বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় কার্যক্রমে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। করোনা চিকিৎসায় কোন কোন কোন পৌরসভায় কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা আছে বলে তিনি দাবি করেন। সেখানে মেডিকেল টিম আক্রান্তদের নমুনা কালেকশান করে পরে তা টেস্টের জন্য পাঠানো হয়।

নোয়াখালী চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র আক্তার হোসেন ফয়সাল মুঠোফোনে জানান, করোনার বিস্তার ঠেকাতে সেখানে মাইকিং, লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। আর জীবাণু প্রতিরোধে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বাইরের লোকজন আসায় রোগীর সংখ্যা মাঝেমধ্যে বেড়ে যায় বলে তিনি মনে করেন।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পৌরসভার মেয়র সাদেকুর রহমান বলেন, করোনার বিস্তার রোধে সোনারগাঁয়ের পৌরসভায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশপাশি ১০ হাজারেরও বেশি মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। আর পৌরসভাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য জীবাণুনাশক ওষুধ ছিটানোসহ সবধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ চলছে। আর করোনা আক্রান্তদের জন্য পৌরসভায় ৫টি রুম রাখা হয়েছে। সেখানে আক্রান্তদের রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে পৌর এলাকায় বাড়ি বাড়ি জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। যার কারণে সোনারগাঁয়ের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো আছে বলে মেয়র দাবি করছেন।

ফেনীর দাগনভূঁইয়া পৌরসভার মেয়র ওমর ফারুক খান জানান, তিনি নিজেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন কিছুটা সুস্থ আছেন। তার মতে, পৌরসভায় ডাক্তার নেই। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে। উপজেলা থেকে চিকিৎসক পৌরসভায় যান। পৌরসভায় ১শ’র বেশি করোনা রোগী আছে। উপজেলা থেকে তাদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে মেয়র দাবি করছেন।

ঝালকাঠীর একজন চিকিৎসক জানান, ঝালকাঠী জেলার পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মীরা জেলা সিভিলদের বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচিতে অসহযোগিতা করছে। তাদের মধ্যে সহযোগিতার অভাব রয়েছে বলে জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে জানা গেছে। এভাবে অনেক পেরৈসভার স্বাস্থ্য কর্মীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

খুলনার চালনা পৌরসভার মেয়র বাবু সনত কুমার বিশ্বাস মুঠোফোনে জানান, চালনা পৌরসভায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে। কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে এখন ট্যাক্স আদায় কম হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিণ্টু মুঠোফোনে সংবাদকে বলেন, ঝিনাইদহ পৌরসভায় লোকসংখ্যা ৩ লাখ। পৌরসভায় কোন ডাক্তার নেই। করোনা টেস্ট করানার ব্যবস্থা নেই। তিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত। জেলা হাসপাতাল থেকে ডাক্তার তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। তার পৌসভায় ৩শ’র বেশি করোনা রোগী। কুষ্টিয়ায় গিয়ে তাদের করোনা টেস্ট করতে হচ্ছে। তিনি ঝিনাইদহ পৌরসভায় দ্রুত করোনা টেস্টের পিসিআর মেশিন) বসানোর দাবি জানান।

বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতি (ম্যাব) সেক্রেটারি জেনারেল শরীয়তপুর পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল মুঠোফোনে বলেন, দেশের ৩২৮টি পৌরসভায় প্রায় ৪ কোটি মানুষের বসবাস। পৌরসভাগুলোতে স্বাস্থ্য শাখা আছে। অধিকাংশ পৌরসভায় এমবিবিএস ডাক্তারের পদ আছে। তবে অনেকেই থাকেন না। এরপরও পৌর সভার মেয়রসহ জনপ্রতিনিধিরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গত মার্চ মাস থেকে করোনা মোকাবিলায় কাজ করছেন। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নমুনা কালেকশন করে তা পরীক্ষার পর যাদের করোনা পজিটিভ। তাদের খোঁজ নিয়ে হোম কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করেন। তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। মেয়র থেকে শুরু করে কাউন্সিলরসহ জনপ্রতিনিধিরা সবাই মিলে পৌর এলাকায় মাইকিং, ত্রাণ বিতরণ , ও অসহায়দের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করা হয়েছে। পৌরসভা এলাকায় করোনা প্রতিরোধ করতে গিয়ে রোববার পর্যন্ত ৩৩ জন মেয়র আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি নিজেই ও তার স্ত্রীসহ পরিবারের ১০ জন করোনাভাইরাসে এখন আক্রান্ত। এভাবে অনেক মেয়র আক্রান্ত হয়েছে। অনেকেই এখনও আক্রান্ত আছেন। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ মেয়র নেতার দুঃখ শহরগুলোতে নানা ভাবে সহযোগিতা করা হলেও পৌরসভাগুলোতে তেমন কোন সহযোগী নেই বললেই চলছে। সেখানে পর্যাপ্ত প্রণোদনা নেই। যে প্রণোদনা পাওয়া গেছে তা সামান্য। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এডিবি দিয়েছে ২০ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২৫ কোটি টাকা। যা পর্যাপ্ত নয়। তিনি পৌর সভার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ করোনার মধ্যেও অনেক পৌরসভায় স্টাফদের বেতন-ভাতা এখনও বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে। এরপর অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। কর্মস্থলে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, দেশের পৌরসভা এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য কাঠামোই নেই। সেখানে জেলা সিভিল সার্জনদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে হবে। পৌর এলাকায় আইসোলেশন সেন্টার চালু করে সেখানে করোনা রোগীদের আইসোলেশন সেন্টারে না রাখলে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। পৌর এলাকা গুলোতে ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দরকার হলে ডেপুটেশনে ডাক্তার রেখে রোগী শনাক্ত ও টেস্টের ব্যবসা করে চিকিৎসা করতে হবে।

বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতি (ম্যাব) সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন তাদের বক্তব্যে বলেন, পৌরসভার যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের তালিকা স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রস্তুত করে অর্থ বিভাগে প্রণোদনার জন্য পাঠানো হবে। যাতে সরকার ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা তারাও পায়। আমাদের অনেক পৌরসভা করোনাকালীন বেতন-ভাতাও পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রোববার রাতে সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, করোনাভাইরাসে পৌরসভার আরও অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও করোনার চিকিৎসার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিলে পৌরবাসী উপকৃত হবেন।