হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ায় ক্যান্সার আক্রান্ত ঢাবি ছাত্রের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু,ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী

image

চিকিৎসার অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার আক্রান্ত এক ছাত্রের করুন মুত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ মুত্যুর ঘটনার নেপথ্যে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে এ ঘটনায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

আজ ভিডিও কনফারেন্সের সময় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের এ কঠিন পরিস্থিতিতে অনেক চিকিৎসক পালিয়ে গেছেন। সরকারি নির্দেশনা দেওয়ার পরও অনেক হাসপাতালে অন্যন্যা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। অনেক চিকিৎসক কর্মস্থলে আসছেন না।

তিনি বলেন, বিনা চিকিৎসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হওয়া দুঃখজনক। এর জন্য দায়ী চিকিৎসকদের চাকুরি থাকা উচিত নয়। তাদেরকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া উচিত। তারা চিকিৎসা দেওয়ার যোগ্য নয়। ভবিৎষতে এরা চিকিৎসা বিদ্যায় পড়তে পারবে না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা পরিস্থিতিতে যারা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের পুরস্কৃত করা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা হবে। কর্তব্যরত অবস্থায় মারা গেলে তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।

সুমন চাকমা নামের ওই শিক্ষার্থী কোথাও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন খাড়াছড়ির ইটছড়ির বাড়িতে। সেখানেই গতকাল ৬ এপ্রিল সোমবার সকালে মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতক শেষ বর্ষের (২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ) এই শিক্ষার্থী।

ছাত্রটি ক্যান্সারের রোগী হলেও নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে কোনো হাসপাতালেই ভর্তি হতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।

সুমনের বাবা সুপেন চাকমা বলেন, আমার ছেলেটা চিকিৎসার অভাবে মারা গেল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি। করোনার ভয়ে আমার ছেলেকে কোথাও চিকিৎসা দিতে চায়নি, ভর্তি নেয়নি।

অসুস্থ সুমনের সহপাঠী নিখিল চাকমা বলেন, দুই বছর আগের সুমনের ক্যান্সার ধরা পড়ে। পরে সবার সহযোগিতায় তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার ডাক্তাররা বলেছেন তার বুকে টিউমার হয়েছে। তারপর ওষুধে অনেকদিন ভালো ছিল। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সুমনের শরীরে আবার সমস্যা দেখা দিলে তাকে আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানকার ডাক্তাররা করোনার ভয়ে তাকে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানেও চিকিৎসা না দিয়ে আমাদের আইইডিসিআরে যেতে বলে।

আইইডিসিআরে গেলে সেখান থেকে বলা হয় তারা শুধু বিদেশিদের দেখেন। পরে হতাশ হয়ে বাড়িতেই অবস্থান করে সুমন। শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হয়েছে তাকে মারা যাওয়ার আগে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘোরার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ফেইসবুকেও লিখেছিলেন সুমন চাকমা।

গত ২৬ মার্চ সুমন তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাসে লেখেন, আমার করোনা হয়নি। অথচ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনার কারণেই আমাকে মারা যেতে হবে।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক সৈয়দা তাহমিনা আখতার বলেন, সুমনের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আমরা তার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করেছি। ভারত থেকে চিকিৎসার পর অনেকদিন ক্লাসও করেছে। সর্বশেষ কেন মারা গেল, সেটা জানি না। আমরা তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, অত আগের ঘটনা আমার মনে নেই, তা ছাড়া এ বিষয় কারও কোনো অভিযোগও পাইনি। যদি ডাক্তার দেখানোর জন্য ১০ টাকার টিকেট করেও সেবা পায়নি এমন ঘটে থাকে, তাহলে তার তথ্যপ্রমাণ দিলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। তবে আমাদের নীতিমালায় আছে, কোনো রোগীকেই প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে আমরা অন্যত্র পাঠাই না।

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদও (পিসিপি) কেন্দ্রীয় সভাপতি বিপুল চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক সুনয়ন চাকমা এক শোক বার্তায় বলেন, চিকিৎসার অভাবে সুমন চাকমার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশের মানুষ বর্তমানে কী ভয়ানক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একজন দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার অকাল মৃত্যু পর্বতের চেয়েও ভারি এবং পীড়াদায়ক। এই ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ হবার নয়।