১৫ হাজার প্রাথমিক স্কুল সংকটে

image

নিম্নমানের কাজ, মানহীন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না করার কারণে প্রায়ই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ, দেয়াল ও পলেস্তারা ধসে পড়ছে। সম্প্রতি সারাদেশে এ ধরনের এক ডজন ঘটনা ঘটেছে। ছাদ ও পলেস্তারা ধসে পড়ে সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহতও হয়েছে।

সারাদেশে প্রায় ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় অবকাঠামো সংকটে রয়েছে বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ১৫ হাজার বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর অবস্থা খুবই নাজুক। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে দেড়শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়ন কাজও শুরু হয়েছে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) দু’জন কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ১৫/২০ বছর আগে যেসব প্রাইমারি স্কুলভবন নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোর স্থায়িত্ব ধরা হয়েছিল ৫০ বছর। নির্মাণ কাজ হয়েছে এলজিইডির অধীনে। কিন্তু অনেক ভবনই ১৫/২০ বছরে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে, ধসে পড়ছে। অথচ ইইডি নির্মিত হাইস্কুল ও কলেজের কোন ভবন এই সমস্যায় পড়েনি। গত ৫/৭ বছরে হাইস্কুল ও কলেজের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে ১০০ বছরের স্থায়িত্ব ধরে।’

এদিকে গত দুই বছরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় তিন হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়; যার মধ্যে প্রায় তিনশ’ বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা ভবন নির্মাণে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করা হলেও নির্মাণ কাজের যথাযথ মনিটরিং ছিল না বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ সামগ্রী ব্যবহার করায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে বলে ডিপিইর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারে জোরাল উদ্যোগ নিয়েছেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বারবার ধসে পড়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা ভবিষ্যতে এলজিইডির মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম না করে নিজস্ব একটি শিক্ষা প্রকৌশল দফতর প্রতিষ্ঠার চিন্তা-ভাবনা করছে। একইসঙ্গে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে গত ৮ এপ্রিল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গণশিক্ষা সচিবের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। এই নির্দেশনার আলোকে মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন সংবাদকে বলেছেন, ‘দেশের সব বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কারের জন্য আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৬৫৪টি বিদ্যালয়ের সংস্কার কাজের জন্য পিইডিপি-৩ (প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প) এবং রাজস্ব বাজেট থেকে দেড়শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে অবকাঠামো সংকটে থাকা বিদ্যালয়ের আরেকটি তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই তালিকা হাতে পেলে মোটামুটি সব বিদ্যালয়ই সংস্কারের আওতায় আসবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন জেলায় ৫৯৮টি জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন চিহ্নিত করেছেন। বরগুনা জেলায় ১৬০টি ও পটুয়াখালী জেলায় ২৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও খুলনায় শতাধিক, ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় ১৪১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৭টি স্কুলের ভবনই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের দু’জন কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায়ের চাহিদা অনুযায়ী সংস্কারের অভাব ও অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে। শ্রেণীকক্ষ, ভবন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য ডিপিইকে মাঠপর্যায় থেকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দের সংকট আরও ঘণিভূত হচ্ছে।

গত ৬ এপ্রিল বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোটবগী ইউনিয়নের ৫নং ছোটবগী পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবনের বিমের অংশ ধসে তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রী নিহত হয়। এই ভবনটি নির্মাণ করা হয় ২০০২ সালে; পরবর্তীতে একাধিকবার সংস্কারও করা হয়। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও ঠিকাদারদের দায়িত্ব অবহেলার কারণেই ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ধসে পরেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এর আগে ২৭ মার্চ টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার আগতাড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ ধসে পরে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় ছাদ ধসে পড়ে বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানায়। আগতাড়াইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য ২৯ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল বলে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা গেছে।

গত ১০ এপ্রিল বরগুনার আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া জগৎচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাদের অংশ ও বিম ভেঙে পড়েছে। তবে এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তক্তাবুনিয়া জগৎচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল্লাহ জানিয়েছেন, ‘সকাল ৯টার দিকে ৪র্থ শ্রেণীর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় সেখানে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর পাঠদান চলছিল। বিম ভেঙে পড়তে দেখে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক দৌড়ে শ্রেণীকক্ষ থেকে নেমে যান।’

শহিদুল্লাহ জানান, ২০০১-০২ সালে এলজিইডির অর্থায়নে প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে স্কুল ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবন নির্মাণেরে পর আর সংস্কার করা হয়নি। বিদ্যালয় ভবনটি বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার আবেদন করা হয়েছে; কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না।’

গত ১১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ ও যশোরে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পলেস্তারা ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলার পোড়াটাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে শ্রেণীকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পরেছে।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাবুল জানান, ১৯৯৪ সালে বিদ্যালয় ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবনটিতে তিনটি শ্রেণীকক্ষ রয়েছে। সিঁড়ির পাশে ছোট একটি কক্ষে বিদ্যালয়ের অফিস। অনেক আগে থেকেই ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনের সবকটি কক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পরছে। তবে টুকরোটি একটু ফাঁকা জায়গায় পড়ায় তা কোন শিক্ষার্থীর গায়ে লাগেনি।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলায় স্কুলের জরাজীর্ণ ভবনের ছাদের পলেস্তারা ভেঙে পড়ে তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্র আহত হয়। ওইদিন বেলা ১২টার দিকে উপজেলার উত্তর আজিবপুর সরকারি প্রাথমিক ক্লাস চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। ১৯৯৫ সালে এ স্কুল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে তীব্র অবকাঠামো সংকটে ছিল প্রায় ১৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত দেড় বছরে দুই হাজার বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কার হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয় সংস্কারের আওতায় আসেনি; এতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলার স্কুলে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করেছে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ২০০৩ সালে পরিচালিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, পুরনো ৩৭ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানই জরাজীর্ণ। এর মধ্যে কিছু ভবন সংস্কার হয়েছে। নতুন করে জরাজীর্ণ ভবনের সংখ্যা আরও বাড়ছে।

পরবর্তীতে ২০১২/১৩ সালে সরকার প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছে। এগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ ও চরম অবকাঠামো সংকটে রয়েছে। সবমিলিয়ে অবকাঠামো সংকটে রয়েছে ন্যূনতম প্রায় ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (পিইডিপি-৩) আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম ২০১৭ সালে শেষ হয়। কিন্তু দেশের সব বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণ করা এ প্রকল্পের আওতায় সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সাল থেকে পিইডিপির নতুন পেইজ শুরু হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এলাকার প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে যে গতিতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ চলছে, তাতে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যা আগের তুলনায় আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন শিক্ষকরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব হাইস্কুল, কলেজ ও সমপর্যায়ের মাদ্রাসার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) মাধ্যমে। চাহিদার ভিত্তিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজও করে আসছে ইইডি।

তবে সম্প্রতি টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন (১২তলা ভবন) একটি ভবনের ছাদ ধসে ১৮ জন শ্রমিক আহত হন। ইইডি-কে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এই ভবনের নির্মাণ কাজ করছেন।

আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) অধিদফতরের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইইডি নির্মিত কোন শিক্ষা ভবনে বড় ধরনের অনিয়ম বা ভবন ও ছাদ ধসে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বারবার এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।