আ’লীগের তৃণমূলে বিভক্তি বাড়ছে

image

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আগাম বিরোধে জড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। মূলত দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’কে ঘিরেই সব বিরোধ। পৌরসভা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচানগুলোতে নৌকা প্রতীক পেতে নেতাকর্মীদের প্রতিযোগিতা বাড়ছে, এ কারণে তৃণমূল আওয়ামী লীগে বিভক্তি বাড়ছে। নৌকা প্রতীক না পেয়ে সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মীই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্র্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এতে দল ও অঙ্গসংগঠনে বিভক্তি তীব্র রূপ নিচ্ছে। এছাড়াও স্থানীয় কমিটিতে পদ-পদবির লড়াই তৃণমূলে কোন্দল বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় এক যুগ টানা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে কর্মীদের অনেকের মধ্যেই নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা জেগে উঠেছে। ফলে সেখানে কর্মীর চেয়ে এখন পদধারী এবং পদবিহীন নেতার সংখ্যা বেড়ে গেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগে বিভক্তি শুরু হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে যা পরবর্তীতে তৃণমূল পর্যন্ত গড়ায়। নির্বাচনের আগে সংসদীয় বেশিরভাগ আসনেই একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী এলাকায় নিজ নিজ নিজস্ব বলয় গড়ে তোলে। পরে যিনি মনোনয়ন পার তার পক্ষ ভারি হয়। তবে কিছু আসনে ব্যতিক্রম ঘটনাও ঘটে। এরপর স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে নৌকা প্রতীক প্রত্যাশীদের মধ্যে শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও মূল আলোচ্য বিষয় ছিল মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে সৃষ্ট বিভক্তি ও কোন্দলের বিষয়টি। ওই সময়ে কয়েকটি জেলার বেশ কয়েকজন নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়।

জাতীয় নির্বাচন শেষ। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। অতীতে দেখা গেছে, একেকটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে গড়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রায় ১০ জন প্রার্থী থাকেন। নৌকা প্রতীক পেতে তাদের অনেকেই নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এমনকি বর্তমান দলীয় মেয়র ও চেয়ারম্যানের দোষ-ত্রুটি (প্রমাণিত নয়) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে প্রচারে নামেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অপরেরর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা কুৎসা তুলে ধরেন। দুর্নীতিবাজ, গডফাদার আখ্যা দিয়ে এবং গুরুতর অভিযোগ তুলে একে-অন্যকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সামনে এমন যাতে না হয়, এজন্য কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। সম্প্রতি ওয়ার্কিং কমিটির সভায় এসব বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সংবাদকে বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নয়, এটা প্রতিযোগিতা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাচ্ছে। এ দলে প্রতিযোগিতা আছে, থাকবে।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কখনও কখনও দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে- শৃঙ্খলা ও পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা-সহমর্মিতা-সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বন্ধন বাড়িয়ে দলকে শক্তিশালী করা। বিগত সময়ও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে এনেছি। আগামীতেও সবকিছু সফলভাবেই সমাধান করা হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গিয়ে বিরোধে জড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্র থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও সময়মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দিতে পারছেন না অনেকেই। আবার বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক জেলায় দুটি করে কমিটির তালিকা তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে কমিটিতে স্থান পাওয়ার জন্য নিজ দলের সহকর্মীই হয়ে গেছে তীব্র প্রতিপক্ষ।

শুরুতে এক অন্যের চরিত্র হনন এক পর্যায়ে হামলা ও সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। অনেক কমিটিতে প্রভাবশালীরা প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের স্থান না দিয়ে নিজেদের লোকদের পদে আনছেন। নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করে তা কেন্দ্রেও জমা দিয়েছেন অনেকে। যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নজরে আসায় তিনি এসব তালিকা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এসব কমিটিগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। কার্যক্রম শেষ হলেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করায় একদিকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত যেমন বেড়েছে আবার দলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একজনকে প্রতীক বরাদ্দ দিয়ে অন্যান্য প্রত্যাশীদের বঞ্চিত করার কারণে। তবে স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই। দৃশ্যমান যেসব সমস্যা সেগুলো নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর স্থানীয় নেতাদের স্বজন-প্রীতি ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার ফল। দেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন সুশিক্ষিত হবে, সবার মধ্যে যখন আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, তখন এসব সমস্যা থাকবে না।