কাউন্সিলের আগেই আ’লীগে শুদ্ধি অভিযান

image

দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নেতাদের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দল এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সবস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালাবে আওয়ামী লীগ। অভিযোগের প্রমাণ মিললে সে যেই হোক, কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। গণভবনে শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদচ্যুত করার মধ্য দিয়ে এই শুদ্ধি অভিযানের শুরু বলে মনে করছেন দল ও এর সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার মতে, অনিয়মের কারণে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের পদচ্যুত করার ‘নজিরবিহীন’ এই ঘটনা দলীয় নেতাদের জন্য ‘কড়া বার্তা’-যারা এতদিন নিজেদের ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ মনে করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন’ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলো। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া ও বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করানো হয়েছে। তার মতে, অপরাধ করলে কেউই ছাড় পাবে না তা এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দল এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার একার ইমেজ দিয়ে কি দেশ চলবে? সবার সম্মিলিত ভাবমূর্তি দিয়ে দল ও দেশ চালাতে হবে। কাজেই কাউকে ছাড় দেব না। সবার খবরই রাখি। ছাত্রলীগই হোক আর আওয়ামী লীগই হোক, কঠোরহস্তে এসব মোকাবিলা করা হবে।’

শনিবার রাতে গণভবনের ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করা হয় আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। তাই তৃণমূল থেকে দলকে শক্তিশালী করতে হবে এবং যাতে নিয়মিতভাবে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়, এ জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা সংবাদকে বলেন, তাদের নেত্রী শেখ হাসিনা দল এবং দেশের স্বার্থে ওই নেতাদের ‘লাগাম টেনে ধরবেন’- যারা চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্যে নিজেদের ‘আদ্যপান্ত’ জড়িয়ে ফেলেছেন।

শনিবারের বৈঠকে শেখ হাসিনার আলোচনা ছাত্রলীগের অভিযুক্ত দুই নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না জানিয়ে কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, নেত্রী সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও ‘আকার-ইঙ্গিতে’ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন ও মূল দলের কারও কারও ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তিনি বলেছেন, আমার কাছে সব খবরই আছে। প্রধানমন্ত্রীর ওইদিনের অভিব্যক্তি দেখে ‘তাদের কেউ আর ছাড় পাবে না’ বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় এই নেতা। দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আগামী ডিসেম্বরে দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে ‘ক্লিন ইমেজ’ এবং তুলনামূলক সৎ ও কর্মীবান্ধব নেতাদের দলের প্রথম সারিতে নিয়ে আসা হবে বলেও মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এক নেতার মতে, এবার দল আর সরকার আলাদা করার চিন্তা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। যারা দলের শীর্ষপদে থাকবেন, তাদের মন্ত্রিপরিষদে রাখা হবে না। যারা মন্ত্রিপরিষদে থাকবেন, তাদের দলীয় বড় পদ থাকবে না। এছাড়া অভিযুক্ত, সমালোচিত ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নেতাদের এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ওই বৈঠকে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেক নেতাকর্মীকে মনে রাখতে হবে, দেশ ও জাতির প্রতি তাদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে এবং তাদের ওই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে দল গঠন করেছে, তাদের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তারা কেবল নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতায় আসে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অনেক স্থানে স্থানীয় নেতাদের মত উপেক্ষা করে একচেটিয়া কমিটি গঠনের অভিযোগ রয়েছে। কমিটিতে ভিন্ন আদর্শের লোকজন পদ পাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ‘ক্যাডার পলিটিক্স’-এ বিশ্বাস করে না। অথচ আওয়ামী লীগের ব্যানারে ক্যাডাররা প্রকাশ্যে অস্ত্র মহড়া করে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। নেতাদের এসব ক্যাডার নিবৃত্তি করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, না হলে যেভাবে জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদক দমন করা হয়েছে-ওইভাবে ক্যাডার দমন করা হবে। কে কোন দলের ক্যাডার, সেটি দেখা হবে না। ক্যাডার পলিটিক্স চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

শেখ হাসিনা দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সমুন্নত রাখতে এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য কাজ করে যেতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। জনগণ জানে, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, তখনই তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হবে এবং তাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য কাজ করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে পারব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সাল থেকে গত এক দশকে দেশে নজিরবিহীন উন্নতি হয়েছে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশে নামিয়ে এনেছি এবং ৮ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি এবং দেশের জনগণ এর সুফল পাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন ও তাদের দারিদ্র্য্যমুক্ত করা। আমরা ওই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছি। আমাদের আরও বহুদূর যেতে হবে এবং জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি স্থান এবং সারা বিশ্ব বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী। তিনি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তাদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সরকারের সাফল্যের কথা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেন। তার সরকার সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও আগুনসন্ত্রাস শক্তহাতে দমন করেছে এবং মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, চলবে। তিনি সরকাররের প্রতি সহযোগিতার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এ লক্ষ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। তাই আমি খুবই আশাবাদী, দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী দেড়শ’ প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর চিঠি প্রেরণ প্রসঙ্গেও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ‘কেস টু কেস’ অর্থাৎ প্রত্যেকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করলে দলীয় সভাপতি এতে সম্মতি দেন। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা সারাদেশের পরিস্থিতি দলীয় সভাপতির কাছে উপস্থাপন করেন। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব জেলা-উপজেলায় কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, দলের জাতীয় সম্মেলনের আগেই সেখানে দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে।