টক অব দ্য কান্ট্রি : যুবলীগের নেতৃত্বে কে আসছেন

image

যুবলীগের নতুন নেতৃত্বে কারা আসছেন- এই মুহূর্তে এটিই দেশের রাজনীতিতে সর্বোচ্চ আলোচিত বিষয়। ক্যাসিনো কাণ্ডে সংশ্লিষ্টতায় শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের কারণে সম্প্রতি ‘যুবলীগ’ ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। ২০ অক্টোবর রোববার গণভবনে এক বৈঠকে চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে অব্যাহতি এবং ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা এবং বয়সসীমা ৫৫ বছরে বেধে দেয়ার খবরে আলোচনা আরও জমে ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত তাপসকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়নি। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগের বর্তমান নেতৃত্ব এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃত্বে যারা ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’ সম্পন্ন, তাদের মধ্য থেকেই এবার চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক করা হবে। তবে যাই হোক, আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসের (জাতীয় সম্মেলন) মাধ্যমেই হবে।

সম্প্রতি অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সংগঠনের নাম ভাঙ্গিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, অনুপ্রবেশকারী এবং অনুপযুক্তদের পদ দিয়ে বাণিজ্যসহ নানা কারণে অভিযুক্ত যুবলীগের প্রভাবশালী বেশ কিছু নেতা দলে ও দলের বাইরে ব্যাপক সমালোচিত হন। বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জিকে শামীম গ্রেফতার হলেও প্রভাবশালী নগর নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন ওঠে। ‘চুনিপুটি নয় রাঘববোয়ালদের ধরতে হবে’- এমন বক্তব্য আসে রাজনীতিক, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছ থেকে। সম্রাট গ্রেফতার হওয়ায় শুদ্ধি অভিযান কিছুটা গ্রহণযোগ্যাতা পায়। সম্প্রতি ওমর ফারুক চৌধুরীকে যুবলীগের চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে গণভবনে ঢুকতে না দেয়া, উভয়ের ব্যাংক হিসেব জব্দকরণ- এসব কারণে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি থেকে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিদায়ের আভাস পায় মানুষ।

গত রোববার রাতে গণভবনে যুবলীগের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগের বয়সসীমা ৫৫ বছর নির্ধারণ করেন। তবে উপস্থিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা (যাদের বয়স ৫৫ বা তার বেশী) সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স বিবেচনায় যুবলীগের বয়সসীমা ৬০ করার অনুরোধ জানান। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এবং তোফায়েল আহমেদের মতো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যুবনীতিতে যুবক ৩৫ বছর, আমি ভেবেছিলাম যুবলীগের বয়স ৪৫ বছর করে দেব। তবে অনেকে বাদ পড়ে যাবে তাই ৫৫ বছরই চূড়ান্ত। যারা এরপরও বাদ পড়বেন তারা নিজ নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

বয়সসীমা ৫৫ বছর বেধে দেয়ায় আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসের (জাতীয় সম্মেলন) আয়োজন করেই বিদায় নিতে হবে গত রোববার রাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম ও সদস্য সচিব হারুনুর রশীদকে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র মতে, এদের (চয়ন-হারুন) দু’জনের বয়সই ৬৫ বছরের উপরে। এছাড়া দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা অধিকাংশ সদস্যের বয়স ৫৫ বছরের বেশি হওয়ায় তারাও আর নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। তাই এবারের কংগ্রেসের মাধ্যমে যুবলীগে হবে নতুন নেতৃত্বের জয়গান।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় সূত্র বলছে, বয়সসীমা ৫৫ করায় বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের বেশিরভাগই বাদ পড়ে যাবেন। ফলে যুবলীগে আসন্ন জাতীয় কংগ্রেসে হবে নতুন নেতৃত্বের জয়গান।

বয়সসীমা ৫৫ বছর করায় যুবলীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। যুবলীগের দফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলা পর্যায়ের কমিটিতেও পঞ্চান্নোর্ধ নেতা রয়েছেন। যারা বাদ পড়ে যাবেন তাদের অনেকেই বয়স পুনর্বিবেচনা করার পক্ষে। তবে সংগঠনের একটি অংশ নেত্রী শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে সংগঠনের নাম যেহেতু ‘আওয়ামী যুবলীগ’ তাই নেতাকর্মীদের যুবক হওয়া জরুরি। বয়সসীমা আরও কমানোর পক্ষে মত দিয়ে অনেকে বলছেন, আসন্ন কংগ্রেসে তরুণ নেতাদের মূল দায়িত্বে আনা প্রয়োজন, যারা এ সংগঠনকে আধুনিকীকরণ করে যুগোপযোগী সংগঠনের রূপান্তর করতে পারবে।

সম্প্রতি ওমর ফারুক চৌধুরীর অব্যহিত, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে গণভবনে ঢুকতে না দেয়া, ক্যাসিনো কাণ্ডে বেশ কিছু নেতার গ্রেফতারের ঘটনায় যুবলীগের কর্মকাণ্ডে স্থবিরাত তৈরি হয়েছে। আগামী মাসে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হলেও অন্য সময়ের মত এবার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দৌড়ঝাঁপ নেই। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল- কোন নেতাকর্মীই নিশ্চিত নন, কে হতে পারেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। যুবলীগে যুক্ত নন, এমন কারও হাতে কিংবা ছাত্রলীগ সাবেক কোন নেতাকেও শেখ হাসিনা দায়িত্ব দিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ৩২ বছর বয়সে আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন গঠনতন্ত্রে যুবলীগের থাকার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪০ বছর থাকলেও ১৯৭৮ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর এ বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ৩৭ বছর বয়সী মোস্তফা মহসীন মন্টু। ১৯৯৬ সালের চতুর্থ জাতীয় কংগ্রেসে ৪৭ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ২০০৩ সালের পঞ্চম জাতীয় কংগ্রেসে ৪৯ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক। এ কমিটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ৬৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী; গত রোববার ৭১ বছর বয়সে তাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

বিতর্কিত কেউ কমিটিতে স্থান পাবে না : সংবাদ সম্মেলনে চয়ন ইসলাম

সপ্তম কংগ্রেস আয়োজনে গঠিত সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মাদক ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও অনুপ্রবেশকারীসহ যেকোন অপরাধে সম্পৃক্তদের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্সে। আসন্ন কংগ্রেসে তারা আমাদের সঙ্গে থাকতে পারবে না। আমরাও তাদের সঙ্গে থাকব না। আমরা এক মাস একদিন সময় পেয়েছি। এরমধ্যে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচষ্টায় একটি সফল সম্মেলন করব। উৎসবমুখর পরিবেশে একটি সুন্দর কংগ্রেস আয়োজন করে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়াই আমাদের চ্যালেঞ্জ।

সম্মেলন প্রস্ততি কমিটির সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন দিনের জন্য একটি সুন্দর সম্মেলন করে কমিটি দেয়াই আমাদের প্রধান কাজ। আমরা নেত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে এটি করব। উল্লেখ্য, গত ২০ অক্টোবর দায়িত্ব পাওয়ার পর এই প্রথম কার্যালয়ে এসে সংবাদিকদের মুখোমুখি হন আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম ও সদস্য সচিব হারুনুর রশীদ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য- আতাউর রহমান, সাঈদুর রহমান সাঈদ, ফারুক হোসেন, মজিবুর রহমান চৌধুরী, আনেয়ার হোসেন, বেলাল হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক আতিক, এসএম জাহিদ, প্রচার সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু, উপস্বাস্থ্য সম্পাদক হেলালুদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মাইনুল হাসান নিখিল, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা প্রমুখ।