বিতর্কিতদের বদলে যোগ্যদের পদায়ন শীঘ্রই

image

চাঁদাবাজি, পদায়নে অর্থের লেনদেনসহ নানা অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে অপসারণের পর সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে। দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে দুই নেতাই তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। সংবাদের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে দুই নেতাই সংগঠনের নেতাকর্মীদের যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ছাত্রলীগকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করে পার পাবে না। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংগঠনে থাকবে না প্রটোকলের রাজনীতি। বিলাসী জীবনযাপনের প্রচলিত ধারা বন্ধ হবে। বিতর্কিতদের অবস্থান ছাত্রলীগে হবে না। শীঘ্রই কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের পদায়ন করা হবে। ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থার সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সারা দেশের সাংগঠনিক রিপোর্টের ভিত্তিতে ইউনিটগুলোতে কমিটি করা হবে। কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পেলে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। নিয়মিত ছাত্রলীগের বর্ধিত সভার আয়োজন করা হবে। আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে। দশ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণরুম ও গেস্টরুমে শিক্ষার্থী হয়রানি বন্ধে থাকবে বিশেষ নির্দেশনা। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সার্বিক দিকনির্দেশনা নিয়েই সব সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এমন প্রতিশ্রুতিই ব্যক্ত করলেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য।

চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কারণে সদ্য সাবেক শীর্ষ দুই নেতাকে পদ হারাতে হয়েছে। এর ফলে ইমেজ সংকটে পড়েছে ছাত্রলীগ। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে কি করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, এ ঘটনাগুলো যাতে না ঘটে তার জন্য আমরা কাজ করব। যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত থেকে সংগঠনকে বিতর্কিত করতে চায়, তাদের প্রতি আমাদের কঠোর বার্তা থাকবে। কোন দুর্নীতিবাজের জায়গা ছাত্রলীগে হবে না। কেউ যদি চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, তাদেরকে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্যই মূলত আমাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দশ মাস সময় নিয়ে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ সময়ের মধ্যে সারা দেশের সাংগঠনিক ইউনিটগুলোতে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে সম্মেলনের একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

বিগত কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে হল ছেড়ে বিলাসী জীবনযাপন করার অভিযোগ আসলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলে থেকে সংগঠন পরিচালনা করছেন জয় ও লেখক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয় বলেন, প্রটোকলের রাজনীতি আমরা করব না। তাই দায়িত্ব পাওয়ার পরও সাধারণ কর্মীদের সুখ দুঃখের অংশীদার হওয়ার জন্য ঢাবির হলেই থাকছি। ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে আগামীদিনে বিলাসী জীবনযাপনের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। লেখক বলেন, ছাত্রলীগের আমরা সবাই কর্মী। আমরা চাই না অন্য নেতাকর্মীদের চেয়ে আমাদের লাইফস্টাইল আলাদা হবে। আমাদের প্রধান কাজ ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকা, প্রটোকল নিয়ে ঘোরা নয়। জোর করে প্রটোকল নেয়া তো দূরে থাক, কেউ প্রটোকল দিতে চাইলে তাদের নিষেধ করবো।

বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থার সংকট তৈরী হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কি করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, বর্তমানে আস্থার সংকট কিছুটা হতে পারে। আমরা সে সংকট দূর করার জন্য যা করণীয়, তাই করব। এর মাধ্যমে আমরা ছাত্রলীগকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। একই সুরে কথা বলেছেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকও।

আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, বিতর্কিতদের অবস্থান ছাত্রলীগে হবে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। খুব শীঘ্রই তাদের বাদ দিয়ে নতুনদের পদায়ন করা হবে। লেখক ভট্টাচার্য বলেন, নেত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠক করবো। তারপর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের দায়িত্ব বন্টন করা হবে এবং বিতর্কিতদের বিষয়ে সাংগঠনিক খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য একটি টিম গঠন করা হবে। এ টিমের তদন্তের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যারা প্রকৃতপক্ষে দোষী তাদের বহিষ্কার করে পদবঞ্চিতদের পদায়ন করা হবে।

ছাত্রলীগের ১১১টি সাংগঠনিক ইউনিটের ১০৯টিই মেয়াদোত্তীর্ণ বা কমিটি নেই। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে এসব ইউনিটে কমিটি দিয়ে সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়া কতটুকু সম্ভব হবে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, যেসব জায়গায় আমাদের কমিটি হয় নি, সেখানে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিটি করব। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, কয়েকটি ইউনিটে সম্মেলন হয়ে গেছে। সেগুলোতে আমরা দ্রুত কমিটি দিয়ে দিব। এছাড়া অন্য ইউনিটগুলোতে দ্রুত কমিটি দেয়ার চেষ্টা করব। নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জয় বলেন, ছাত্রলীগে মাদকসেবীদের জায়গা হবে না। শাখাগুলোতে সবচেয়ে যোগ্যরাই আসবে। লেখক বলেন, কমিটির কোনো পর্যায়ে কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। ছাত্রলীগ তার নিজস্ব ধারায় চলবে। ঢাবি ছাত্রলীগের কমিটির বিষয়ে তারা বলেন, ঢাবির হল কমিটিগুলো আমাদের শক্তির উৎস। খুব দ্রুত আমরা হল কমিটি দেয়ার চেষ্টা করব।

কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে জয় বলেন, কারো বিরুদ্ধে যদি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটি দেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। লেখক বলেন, এ বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা কতটুকু প্রাধান্য পাবে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে কমিটি দেয়া হবে না। প্রটোকল দিলে বা সেলফি তুললেই যে তাকে নেতা বানানো হবে, এমনটি নয়। সংগঠনের প্রতি যার ভালোবাসা ও ত্যাগ বেশি, তাকেই আমরা নেতৃত্বের জন্য বেছে নিব। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, পদ দেয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা নয়, আদর্শের বিষয়টিই দেখা হবে।

আলাপকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, আসন সংখ্যা বৃদ্ধিসহ ছাত্রদের সুবিধার দাবি-দাওয়াগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার কথা বলেছেন লেখক। জয় বলেছেন, আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করবেন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন। তারা ডাকসু কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ডাকসুর শিক্ষার্থীবান্ধব সব কাজে পাশে থাকব। আমাদের নিজস্ব কর্মসূচিও চলবে। ডাকসু’র আগামী নির্বাচনে সবক’টি পদের আমরা জয়ের আশা করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণরুম ও গেস্টরুমে শিক্ষার্থী হয়রানি বন্ধে বিশেষ নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, যারা অতি উৎসাহী হয়ে গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে ছাত্রলীগের নাম খারাপ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেব। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, ইতিবাচক উদ্দেশ্যেই গেস্টরুম ও গণরুমের সৃষ্টি। সেটা কেউ কেউ নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে। কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসলে আমরা অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। গণরুমে যাতে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা না হয় সেই নির্দেশনা থাকবে। গণরুমকে আমরা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে আসতে চাই। সেখানে আবৃত্তি, আলোচনা, পাঠচক্রের মতো আয়োজন থাকবে।

ছাত্রলীগের বর্ধিত সভা নিয়মিত করার বিষয়ে একই সুরে কথা বলেন জয় ও লেখক। তারা বলেন, আমরা বর্ধিত সভাগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করব। তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়ে জয় বলেন, তৃণমূলের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করে চলব। লেখক বলেন, আমরা চেইন অব কমান্ড রক্ষা করার চেষ্টা করব। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে বলেও জানান তিনি। ছাত্রলীগের সম্মেলন নিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, ছাত্রলীগের নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন হয়ে থাকে। আমরা আগামী দশ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে সম্মেলনের প্রস্তুতি নিব। ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক দেশরত্ম শেখ হাসিনা। তিনি যখন চাইবেন, তখনই সম্মেলনের বিষয়ে তার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করব। লেখক বলেন, বিষয়টি অনেক চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু অসম্ভব না। প্রসঙ্গত, ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার আগ পর্যন্ত আল নাহিয়ান খান জয় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান জয় বরিশাল জিলা স্কুলে অধ্যয়ন শেষে করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন ঢাকা কমার্স কলেজে। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাবির আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর জয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। হল ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আইন বিভাগ থেকে এলএলবি শেষ করে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি এ বিভাগে তৃতীয় সেমিস্টারে অধ্যয়নরত আছেন। অন্যদিকে, লেখক ভট্টাচার্যের বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। তার বড় চাচা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযূষ ভট্টাচার্য। মেঝ চাচা স্বপন ভট্টাচার্য এখন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। স্থানীয় গোপালপুর সরকারি বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শেষ করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পড়েন যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। এরপর ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। ঢাবির হলের রাজনীতির মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু হয়। পালন করেছেন ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথ হল শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমানে তিনি আইডিয়াল ল’ কলেজে অধ্যয়নরত আছেন।