download

রাজনীতির মাঠে শুধুই আ’লীগ : ধুঁকছে বিএনপিসহ অন্যান্য দল

http://thesangbad.net/images/2020/October/19Oct20/news/plitics.jpg

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা রাজনীতির মাঠে ধুঁকছে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। তৃণমূল পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে মাঝে মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও কেন্দ্রীয় ঐক্যে ক্ষমতাসীন দলটির শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ঐক্যের অভাবে বিএনপিসহ অন্যান্য দলগুলো রাজনীতির মাঠে তাদের অবস্থান হারাচ্ছে।

রাজনীতিতে দলীয় অবস্থান শক্তিশালী করতে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় বাম সংগঠনের জনপ্রিয় নেতাদের কাছে টেনেছে। তাদের জোটে নিয়েছে। সরকার গঠনের পর মন্ত্রিত্ব দিয়েছে। এক সময়ের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) জোটে নিয়ে সরকারের অংশীদার করেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারের অংশ হওয়া বাম দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি কমেছে। জাতীয় পার্টিও ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান হারিয়েছে। এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে বিএনপি একবার ক্ষমতায় এলেও পরবর্তীতে স্বাধীনতাবিরোধী দলটির কারণে নতুন প্রজন্মের আস্থা হারিয়েছে বিএনপি। জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার পৃথক পৃথক দল গঠনের কারণেও বিএনপির শক্তি খর্ব হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সংবাদকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ। নেত্রীর নির্দেশ ‘টপ টু বটম’ এক বাক্যে মেনে নেয়ার যে প্রবণতা তাই আওয়ামী লীগকে এতো শক্তিশালী করেছে। এই যোগ্যতা শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন, তার সততা, মেধা, সাহস, পরিশ্রম, দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতার কারণে। বাংলাদেশের অন্য কোন দলে এমন অবিসংবাদিত নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

দেশে মোট ৪১টি রাজনৈতিক সংগঠন নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধন নিয়ে রাজনীতি করছে। আইন অনুযায়ী ৪১টি দলেরই নিজ নিজ প্রতীকে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকলেও বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে অনেকগুলো দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মাহাজোট ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের অধীনে নৌকা প্রতীকে অথবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছে। নিবন্ধিত বেশ কয়েকটি ইসলামী দল ও পৃথক জোট গঠন করে ভোট করেছে। এরমধ্যে এককভাবে নির্বাচন করে হাতপাখা প্রতীকে চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে না পারলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ভোটের হিসেবে জাতীয় পার্টিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এছাড়া আরও শতাধিক দল রয়েছে যারা ইসির নিবন্ধন না পেলেও রাজনীতির মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরামের সভাপতি বর্ষীয়ান রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ আরও কয়েকটি দল ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নামে নতুন জোট গঠন করে ভোটে অংশ নিলেও তাদের ফল বিপর্যয় ঘটে। পরে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মতবিরোধের কারণে ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি বেশিদিন থাকতে পারেনি। এরপর কেন্দ্রীয় নেতাদের মতবিরোধের কারণে গণফোরামেও ফাটল ধরে। ফলে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে সুবিধা করতে পারেনি এই জোট।

এদিকে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বাধীন বাম সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এখনও রাজনীতিতে দলীয় আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তির অভাবে দলটি রাজনীতির মাঠে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নে রাজনীতির মাঠে লড়াই করে যাচ্ছে। এই দুটি দলের সঙ্গে গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ (মার্কসবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি বাম সংগঠন ঐক্য করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করলেও ভোটে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, আসনও পায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি কেন্দ্রীয় অনৈক্যের কারণেই সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমানের মধ্যে সমঝোতার অভাবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দুটি বলয় তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে রাজনীতি চালিয়ে যেতে চায়, অপর পক্ষের লক্ষ্য তারেক রহমানকে নেতৃত্বে এনে রাজনীতি পরিচালনা। তৃতীয় একটি পক্ষ আছে, যারা দুই দিকেই ভারসাম্য রক্ষা করে নিজেদের পদ-পদবি টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত। নেপথ্যে আরেকটি পক্ষ খালেদা-তারেককে বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করলেও তারা সামনে আসছে না। বিএনপির কেন্দ্রীয় এই অনৈক্যের প্রভাবে তৃণমূল নেতাকর্মীরাও নিজ নিজ বলয়ে বিভক্ত। এছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণেও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্প্রতি এক সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভাজনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, নেতারা পদ নিয়ে, কমিটি নিয়ে ব্যস্ত, নেতারা কথায় ব্যস্ত। তবে আন্দোলনের জন্য রাজপথে নামার জন্য কেউ ব্যস্ত নয়। তাই আওয়ামী লীগ সরকার এখনেও ক্ষমতায় আছে।

সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা থেকে আমাদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। দেশে গণতন্ত্র নেই, ধর্মনিরপেক্ষতা নেই। দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আমেরিকা, সৌদি আরব, ভারতের মাধ্যমে।

একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিন টানা ক্ষমতায় থাকায় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জোয়ার তৈরি হয়েছে। সব শ্রেণী পেশায় এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সরকারি সুবিধা লাভের সুপ্ত আশা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অংশীদার হওয়ার জন্য ব্যস্ত। মূল দলে সুযোগ না পেলেও সুবিধাবাদী এসব শ্রেণীর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনে অনুপ্রবেশের তৎপরতা দৃশ্যমান। সেখানেও যাদের ঠাঁই না হয়, তারা নিজেরাই বিভিন্ন নামে সংগঠন করে আগে বা পরে ‘আওয়ামী’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘লীগ’সহ নানা শব্দ জুড়ে সরকারি দলের অংশ হওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তাই রাজনীতির মাঠে এখন আওয়ামী লীগের জোয়ার।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (জেপি), দিলীপ বড়–য়ার সাম্যবাদী দল (এমএল), ব্যারিস্টার মো. আরশ আলীর গণতন্ত্রী পার্টি, রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারীর তরীকত ফেডারেশন, খালেকুজ্জামানের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণআজাদী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কমিউনিস্ট কেন্দ্রসহ আরও কয়েকটি দল রয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে শুরুতে অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ব্যারিস্টার আন্দালিভ রাহমান পার্থের জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জামায়াত, কাজী জাফরের জাতীয় পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, পিপলস লীগ, লেবার পার্টি, জাগপা, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোটসহ আরও কয়েকটি দল ছিল। তবে বিজেপি, এলডিপিসহ কয়েকটি দল জোট থেকে বের হয়ে যায়।

নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর থেকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) লাঙ্গল প্রতীকে এককভাবে নির্বাচন করলেও নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটভুক্ত হয়ে নির্বাচন করে সরকারের অংশীদারে পরিণত হয়। এরপর জাপা সরকারের অংশ হিসেবে দশম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করে। জনমনে লাঙ্গলের ধার কমতে থাকে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত নির্বাচন করে ২৭টি আসন লাভ করলেও মন্ত্রিপরিষদে দলটির সদস্যদের স্থান না হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এরমধ্যে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের মৃত্যুতে স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ভাই জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। রওশন ও কাদের, এই দুই বলয়ে বিভক্ত জাপার রাজনীতি দিন দিন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।