শাদের সমর্থনে প্রার্থী প্রত্যাহার করতে পারে আ’লীগ

image

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রয়াত এইচএম এরশাদ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে রংপুর সদর-৩ আসনের এমপি ছিলেন। তার মৃত্যুর কারণে ওই আসনে আগামী ৫ অক্টোবর উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপিসহ বড় দলগুলো প্রার্থী ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করতে পারে বলে দলটির উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে। কারণ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল জাপাকে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চায়। বর্তমানে চলছে বিরোধী দলশূন্য রাজনীতি। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে তৈরি করতে চায়। এ জন্য এরশাদের আসনে তার পুত্রকেই যোগ্য প্রার্থী মনে করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র। আবার জাতীয় পার্টি চাইছে আসনটি ধরে রাখতে। অন্যদিকে বিএনপি চাইছে সবাইকে চমক দিয়ে আসনে জয়ী হতে।

রংপুর সদর-৩ আসনটি রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২২টি এবং তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪১ হাজার ২৪৩ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২০ হাজার ৮২৩ ও নারী ২ লাখ ২০ হাজার ৪০১ জন রয়েছেন। ১৭৫টি ভোটকেন্দ্রের সবটিতেই ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন রিটানিং অফিসার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা শাহাতাব উদ্দিন। ৯ সেপ্টেম্ব ছিল প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু, জাপা প্রার্থী এরশাদের ছেলে শাদ এরশাদ, বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমান, এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহারিয়ার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এছাড়া বিএনপির দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন জমা দেন মহানগর বিএনপির সভাপতি কাওছার জামান বাবলা। এদিকে এনপিপির সফিউল আলম, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লা, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের একরামুল হকসহ মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) মনোনয়নপত্র যাছাই-বাছাইকালে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা বাংলাদেশ কংগ্রেস দলের একরামুল হকের ঋণখেলাপির অভিযোগে মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছে রিটানিং অফিসার জিএম শাহাতাব উদ্দিন। তবে বর্তমানে ৭ প্রার্থী থাকলে রংপুর সদর-৩ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম রাজুর সঙ্গে জাপা প্রার্থী শাদ এরশাদের এমনটাই মনে করেন ভোটারসহ রাজনৈতিক মহল। তবে জাতীয় পার্টি চাইছে এরশাদ দীর্ঘদিন এ আসনে এমপি ছিলেন। এ কারণে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিলে মহাজোটগতভাবে তারা নির্বাচন করতে চায়। সেক্ষেত্রে তাদের বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে জাপা মহাসচিব মশিয়ার রহমান রাঙ্গা মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রত্যাহার করার কথা বলেছেন। একই দাবি করেছেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। জাপার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে এ দাবি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের দু’জন দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়ে মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করার কথা বললে আশ্চর্যের কিছু হবে না।

এদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক মহল মনে করে, শাদ এরশাদের মতো তরুণ শিক্ষিত রাজনীতিতে আসুক। আর জাতীয় সংসদে জাপা বিরোধী দলের ভূমিকা আরও শক্তিশালীভাবে পালন করুক। এ কারণে রংপুর সদর-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম রাজুকে তার দাখিল করা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতে বলা হবে। আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন এর আগে জাপার সঙ্গে মহাজোট করে আমরা নির্বাচন করেছি। এরশাদ রংপুর সদর আসনে মহাজোট প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিল। আমরা তার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিইনি। এ কারণে এ আসনের উপনির্বাচনে শেষ পর্যন্ত শাদ এরশাদকে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে সরে আসার কথা ভাবছে বলেও জানান ওই শীর্ষ কর্মকর্তা। ফলে মহাজোট গতভাবে নির্বাচন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ জন্য আর মাত্র ৫ দিন অর্থাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওই দিন হচ্ছে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার দিন। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী থাকলে মূলত আওয়ামী লীগ ও জাপার প্রার্থীর মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করেন দুই দলের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম রাজু বলেছেন, ২৫ বছর ধরে এরশাদ এমপি থাকলেও এখানে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ এখন দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায়। তারপরও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এখানে। এর উপর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন অত্যন্ত শক্তিশালী। জনগণ আওয়ামী লীগের উন্নয়নযজ্ঞে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী করবে বলে আশা তার। তিনি এ আসনে শেষ পর্যন্ত থাকার কথা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন কোন কারণে এ আসনে ছাড় দেয়া হবে না।

অন্যদিকে জাপা প্রার্থী এরশাদের ছেলে শাদ এরশাদ বলেছেন তার বাবা এ আসনে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এমপি হয়েছেন। রংপুর হচ্ছে জাপার দুর্গ। এখানে কেউ সেই দুর্গে হানা দিতে পারবে না। এবারেও জনগণ তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় জেলা ও মহানগর বিএনপির সকল স্তরের নেতা কর্মী এবার তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ রিটা রহমান কোনদিন বিএনপি করেনি। দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছে। বিগত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো। নির্বাচনের পর ঢাকায় চলে গিয়ে আর আসেনি। অন্যদিকে দলের ত্যাগি নিবেদিত প্রাণ নেতা যারা জেল জুলুম সহ্য করে দল করছেন তাদের মনোনয়ন না দিয়ে বহিরাগত রিটা রহমানকে তারা মেনে নেবেন না। এর প্রমাণও মিলেছে মনোনয়ন পত্র দাখিল ও মনোনয়ন পত্র যাছাই বাছাইয়ের দিনে জেলা বা মহানগর বিএনপির একজন নেতা কর্মী তার সাথে আসেননি। বুধবার মনোনয়ন বাছাই করার সময় তিনি একাই এসে অসহায়ের মতো বসে ছিলেন। রংপুর মহানগর ও জেলা বিএনপির একাধিক নেতা রিটা রহমানকে বয়কট করার কথা জানিয়েছেন । ফলে বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিএনপির তৃণমুল নেতা কর্মীরা।

অন্যদিকে এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহারিয়ার স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও নির্বাচনে তিনি তেমন কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না বলেই মনে করেন সাধারণ ভোটাররা। কারণ এখানে জাপা প্রার্থীকে ভোট দেন লাঙ্গল প্রতীক দেখে তাই এখানে লাঙ্গল প্রতীক যেহেতু শাদ এরশাদ পাচ্ছেন সে কারণে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলেই অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। তার পরেও রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।