অমার্জনীয় ব্যাটিংয়ে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ

image

জিম্বাবুয়ের জয়োল্লাসে হতাশায় বাংলাদেশের শেষ ব্যাটসম্যান আরিফুল -সংবাদ

সিলেট টেস্টে চার দিনের মধ্যে মঙ্গলবার (৬ নভেম্বর) গ্যালারিতে দর্শক সবচেয়ে বেশি ছিল। এক-দুই রানেও উল্লসিত সবাই! কিন্তু রেজিস চাকাভা যখন আরিফুলের ক্যাচ ধরেন, গ্যালারিতে তখন যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা। যদিও মাঠে জিম্বাবুয়ের ফিল্ডাররা ছিলেন আনন্দে মাতোয়ারা। দীর্ঘদিন পর এমন এক জয়ে তাদের মধ্যে বাঁধভাঙা উল্লাস। বিপরীতে লজ্জায় মাথা নিচু বাংলাদেশ দলের। স্টেডিয়ামের ঘড়িতে তখন দুপুর পৌনে ২টা! বলতেই হয় জিম্বাবুয়ের কাছে এমন হারের একটাই ব্যাখ্যা- টেস্টে এখনও অনেক কাঁচা বাংলাদেশ দল।

সিলেটের টেস্ট অভিষেকে বাংলাদেশ খেলতে পারেনি পুরো চার দিনও। জিম্বাবুয়ের কাছে হারতে হয় ১৫১ রানের বিশাল ব্যবধানে। লড়াইয়ের মানসিকতায় হারের ব্যবধান অনেক বেশি। টেস্ট ক্রিকেটে দেড় যুগের পথচলায় এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়গুলোর একটি। শেষ ইনিংসে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩২১ রান, শেষ দুই দিনে ২৯৫। বাংলাদেশ করেছে মাত্র ১৬৯ রান। টেস্টে দুইশর নিচে গুটিয়ে যাওয়ার ঘটনা টানা অষ্টম ইনিংসে।

অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের জন্য এই জয় বয়ে এনেছে দীর্ঘ খরার পর মুষলধারে বৃষ্টির সুখ। মাসের পর মাস বেতন পান না ক্রিকেটাররা, কোচিং স্টাফ বদলায় প্রতিনিয়ত। মাঠের বাইরে হাজার সমস্যায় জর্জরিত তাদের ক্রিকেট। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও স্মরণীয় প্রমাণ করল তারা সামর্থ্যরে জোর। ২০১৩ সালে পাকিস্তানকে হারানোর পর প্রথম টেস্ট জয়ের কৃতিত্ব অর্জন তাদের। দেশের বাইরে এটি মাত্র তৃতীয় টেস্ট জয়, ২০০১ সালের পর প্রথম। সেবার তারা জিতেছিল বাংলাদেশের বিপক্ষেই, চট্টগ্রামে।

অথচ দিনের শুরুটা বাংলাদেশের আশা ছিল বেশ তীব্র। মেঘলা আকাশের নিচে যখন শুরু হয় খেলা, প্রথম ঘণ্টা নিয়েই ছিল মূল শঙ্কা। ইমরুল কায়েস ও লিটন দাস খুব আস্থায় খেলতে পারেননি। জীবন পেয়েছেন দুজনই, ব্যাটের কানায় লেগেছে বল বারবার। তারপরও টিকে গেছেন। সময় কাটিয়েছেন। জুটি ছাড়িয়ে যায় ফিফটি। তখন মনে হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রমশ শক্ত বিত তৈরি করছে। কিন্তু না। সবই ধারণা। শুরু হয় আবারও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী। একের পর এক আত্মঘাতী শটে নিজেদের হারের পথ সুগম করে ব্যাটসম্যানরা। যেন উইকেট বিলিয়ে দেয়ার উলঙ্গ প্রতিযোগিতা! এরকম অবিশ্বাস্য ধস দেখে মনে পড়ে-- ’৮৩তে কলকাতা টেস্টে লয়েড বাহিনীর কাছে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ী কপিল বাহিনীর শোচনীয় হারে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ১ম পাতায় ৬/৭ কলামের শিরোনামে লিখেছিল, ‘দোহাই এদের ক্লিব বলবেন না, এদের ঘরে বৌ-ছেলে-মেয়ে আছে।’ সিলেটে হারের রহস্য কি একমাত্র ক্রিকেটারাই বলতে পারেন। কিন্তু বোর্ড যে দলটির জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের এহেন দায়-দায়িত্বহীন খেলার জবাব বা ব্যাখ্যা কি? বিশেষ করে নিজ মাঠের পিচের ধারণা না থাকার মতো ধারণাতীত ব্যাটিং অসহনীয় বলাই উচিত। অনুমান করতে অসুধিা হয় না এভাবে টেস্ট খেললে আইসিসির নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়াও বিচিত্র নয়।

খেলার কথা : ২১ রানে জীবন পেয়ে লিটন ফিরলেন ২৩ রানে। সিকান্দার রাজার শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে গড়বড়। ৫৬ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে। সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে দলে ঢোকা মমিনুল হক দুটি চারের পর আউট হলেন কাইল জার্ভিসের বল স্টাম্পে টেনে এনে। রাজার বোলিংয়েও ততক্ষণে যেন মুত্তিয়া মুরালিধরন, সাকলায়েন মুশতাকের মতো অফ স্পিনারের প্রতিচ্ছবি দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। পরে তার শিকার আরও দুইজন! ২২ রানে জীবন পাওয়া ইমরুল, লড়াই করলেন অনেকক্ষণ। কিন্তু ৪৩ রানে ঠিকই রাজাকে উইকেট উপহার দিলেন সুইপ করতে গিয়ে পায়ের পেছন দিয়ে বোল্ড। টেস্টে বাজে ফর্মে থাকা অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ চারে উঠে দিতে চান ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু একটু পরই দেখালেন ওই বার্তা ছিল ভুল। রাজাকেই দিলেন উইকেট। যার বলে তেমন কোন টার্ন বা ভীতিকর কিছু ছিল না।

জিম্বাবুয়ের মূল দুই স্পিনার ব্র্যান্ড মাভুটা ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা তখনও বলই হাতে নেননি। যখন তারা ডাক পেলেন, বাংলাদেশের পরাজয় ঘনিয়ে আসে আরও। নাজমুল হোসেন আবারও সুযোগের অপচয় করলেন মাভুটার বলে বাজে শটে। এই লেগ স্পিনারের বলেই মুশফিক আউট হন আরও একবার প্রিয় সুইপ খেলে। রেকর্ড রান তাড়ায় যদি এভাবে উইকেট উপহার দেয় প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানই, দলের তখন মান বাঁচানোই অসম্ভব। প্রথম ইনিংসের মতোই লড়াইয়ের চেষ্টা শুধু আরিফুল হকের ব্যাটে। অন্য প্রান্তে সঙ্গীদের হারিয়ে খেলেন কিছু শট। ৪টি চার ও ২ ছক্কায় করেন ৩৮। কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য তাতে খুব পাল্টায়নি। পরাজয় বিশাল ব্যবধানেই। ব্যাটিংয়ের ধরন আর মানসিকতায় যখন টেস্ট ক্রিকেটের মূল খেলাই থাকে উপেক্ষিত, পরিস্থিতির দাবিকে পূরণ করতে পারে না, তখন পরাজয় ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, জিম্বাবুয়েও জুজু হয়ে উঠল কখন, কিভাবে এবং কেন এর জবাব চায় দেশবাসী?