ক্রিকেট নিয়ে শামিম কবিরের ভাবনা

image

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভিত্তি যারা রচনা করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন শামিম কবির। তিনি শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়কই নন, তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব। খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নেয়ার পর ১৯৮২ ও ’৮৬ আইসিসি ট্রফিতে জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্রিকেটে বড় অবদান রাখায় ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। ঢাকা বিশবিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ‘ব্লু’ প্রদান করে।

১৯৪৫ সালের ৪ এপ্রিল, নরসিংদী জেলার ঘোড়াশালে জন্ম শামিম কবিরের। পিতা আবু ইউসুফ লুৎফুল কবির ও মা সুফিয়া খাতুনের সন্তানদের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় শামিম একটু বেশি আদরের ছিলেন। তার মেঝ ভাই দৈনিক সংবাদের সাবেক প্রধান সম্পাদক প্রয়াত আহমদুল কবির ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন-ডাকসুর প্রথম ভিপি। বড় ভাই খায়রুল কবির এবং সেঝো ভাই নুরুল কবির, সবার কাছ থেকেই খেলাধুলায় উৎসাহ পেয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক শামিম কবিরকে নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশন একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে। সে অনুষ্ঠানে শামিম কবির নিজের খেলোয়াড় জীবনের অনেক অজানা কথা বলেন। সে অনুষ্ঠানে বলা তার কিছু কথা এখানে তুলে ধরা হলো।

অনুষ্ঠানে শামিম কবির বলেন-

‘আমি আমার পরিবারের কাছ থেকে খেলাধুলা করতে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। আমার বাবা আমার খেলার ধারাভাষ্য রেডিওতে শুনতেন। আমার বড় ভাই খায়রুল কবির নিজেও কম বেশি খেলতেন। মেঝ ভাই আহমেদুল কবির এসএম হলের অ্যাথলেটিক সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। সেঝ ভাই নুরুল কবির খেলা হলেই মাঠে চলে যেতেন দেখতে।’ ‘আমি যখন স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন স্কুলের প্রধান দলে ১৪ জনের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ করে এক ম্যাচে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান খেলতে আসেনি। সেই ম্যাচে আমাকে স্কুলের হয়ে খেলার সুযোগ দেয়া হয়।’ ‘মুসলিম হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে নটরডেম কলেজে ভর্তি হলাম। নটরডেম কলেজ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের??? অধীনে। সেজন্য কলেজে পড়া অবস্থাতেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যাম্পে যোগ দেয়ার সুযোগ পাই।’ শামিম কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, হকি ও বাস্কেটবল খেলেছেন। তবে ক্রিকেটই তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। ১৯৬৩ এবং ১৯৬৪ সালে আইয়ুব ট্রফি এবং কারদার সামার ট্রফিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়কত্ব করেছেন। ইস্ট পাকিস্তান দলের বিপক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

শামিম কবির বলেন - ‘সেই ম্যাচে আমি ব্যাটিংয়ে ৪০ রান করার পাশাপাশি একটি স্ট্যাম্পিং এবং দু’টি ক্যাচ ধরি। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অনেক নামি খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও আমরা জয়লাভ করেছিলাম।’ স্কুলে থাকতেই ১৯৬১ সালে আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে ঢাকার ক্রিকেটে পথচলা শুরু শামিম কবিরের। ঢাকার প্রথম বিভাগ লীগে পুরো সময়টাই কেটেছে আজাদ বয়েজ ক্লাবের তাবুতে। ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও উইকেটরক্ষক হিসেবে দলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাড়াও, দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিকবার।

শামিম কবির বলেন - ‘আমাদের সময় আজাদ বয়েজ ক্লাব ছাড়াও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব অনেক শক্তিশালী ছিল। একটি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গে ৫১ রানে অলআউট হই আমরা। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সবার মন খারাপ। এমন সময় আমাদের অধিনায়ক মনি ভাই আমাদেরকে বলেন। খেলায় হারজিত আছেই। আজকের খেলায় আমরা জিতব। আমরা সেই ম্যাচে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবকে ৫০ রানে অলআউট করে ১ রানে জয়লাভ করি।’

শামিম কবির ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সফররত এমসিসি দলের বিপক্ষে ইস্ট পাকিস্তান যুব দলের হয়ে খেলেছেন। পরের বছর ১৯৬৭ সালে ইস্ট পাকিস্তান দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান। ৬৮ সালে করাচির সঙ্গে তিন দিনের ম্যাচে করাচি হোয়াইট দলের বিপক্ষে তার নেতৃত্বে ইস্ট পাকিস্তান জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে ম্যাচ ড্র করেন। সে সময় করাচি দলে হানিফ মোহাম্মদ, মোশতাক মোহাম্মদ এবং ওয়াজির মোহাম্মদের মতো খেলোয়াড় খেলতেন। এই দলের বিপক্ষে ড্র করাটাও ছিল বড় সাফল্য।

তবে শামিম কবিরের ক্যারিয়ারের স্মরণীয় অধ্যায় হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে এমসিসি দলের বিপক্ষে ঢাকা স্টেডিয়ামে তিন দিনের বেসরকারি টেস্টে জাতীয় ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি।

শামিম কবির বলেন - ‘ঐ ম্যাচের পরই আমি ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেই। এর প্রধান কারন ছিল দলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও ভূমিকা রেখেছেন শামিম কবির। লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনে জাস্টিস আবু সাইদ চৌধুরীর সেক্রেটারি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন শামিম কবির।

শামিম কবির বলেন - ‘আমরা সবসময় মনেপ্রানে বিশ্বাস করতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তবে মনের ভেতরে শুধু একটা কথাই উকি দিত ‘দেশটা কবে স্বাধীন হবে’। যুক্তরাজ্যে আমরা সে সময় মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য টাকা তুলেছি। তখন শুধু বাংলাদেশিরাই নয় বিদেশিরাও অনেক সাহায্য করেছে।’