সাকিব ঝড়ে উড়ে গেল উইন্ডিজ

image

সাকিবের শতকের পরে লিটন দাসের অভিবাদন

প্রথম দুটো ম্যাচে টানা হাফ সেঞ্চুরির পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন চাপের মুখে। সোমবার সেমির দৌড়ে টিকে থাকার ম্যাচে সাকিব ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হাঁকালেন আরও একটা সেঞ্চুরি। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরির পর সাকিব এবারের বিশ্বকাপে দেখা পেলেন ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরির। লিটন কুমার দাস সমালোচকদের মুখ বন্ধ তো করলেনই, বুঝিয়ে দিলেন মিথুনের চেয়ে এগিয়ে তিনি। চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে সত্তরের কোটায় তার দুটো ইনিংস ফ্লুক ছিল না এবং বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচের একাদশে তাকে না রেখে কতটা অবিচার করেছেন নির্বাচকরা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই লিটন উপহার দিলেন নিষ্কলঙ্ক রানের ঝড়ো ইনিংস। সৌম্য-সাকিব-লিটনের ব্যাটে চড়ে ক্যারিবিয়ানদের তোলা ৩২১ রান সাত উইকেট আর ৫১ বল হাতে রেখেই টপকে গেল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠানরত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে আবারও শোনা গেল বাঘের গর্জন। পাঁচ ম্যাচ খেলে দুটো জয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন পাঁচ।

জয়ের জন্য বাংলাদেশ দলকে ৩২২ রানের বড় লক্ষ্যই দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটিং ডিপার্টমেন্ট। সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ছিল বাঘের মতো হুংকারের। শুরুতে পথ দেখালেন ড্যাশিং ওপেনার সৌম্য সরকার। তার দেখানো পথে হাঁটলেন তামিম-সাকিব-লিটন। সাকিব আল হাসান বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটার দেখা পেলেন, আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি বিশ্বসেরা অল রাউন্ডার। কোন একটা অঘটনে সমালোচনার মুখে পড়লে তার ব্যাট কতটা চওড়া হয় তা চলতি বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচেই দেখা যাচ্ছে। বিশাল রানের চাপ তাড়া করতে নামা বাংলাদেশের ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টকে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের নেলসনে স্কটিশদের পরাজিত করার স্মৃতি প্রেরণা দিচ্ছিল কিনা, কে জানে। সেবার যে ৩১৯ রান করতে গিয়ে ৩২২ রান করেছিলেন টাইগাররা। এবার টার্গেটা ৩২২। শুধু নেলসন কেন এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজেও আছে তিনটা জয়। অভ্যাস তো আছেÑ এই ভেবে শুরু থেকেই দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার চড়াও হন ক্যারিবিয়ান বোলারদের ওপর। প্রথম পাঁচ ওভারে গড়ে ৬.৮০ করে রান তোলেন দুজনে। পঞ্চম ওভার শেষে সৌম্য যখন ১১ বলে ১৮ অন্য প্রান্তে তামিমের সংগ্রহ তখন ১৯ বলে ৯। যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন বাজে বল পেলে সৌম্য যতটা সম্ভব রান তোলার চেষ্টা করেছেন। পঞ্চম ওভারে শেলডন কটরেলকে এক বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় বড় কিছুর ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন এই ওপেনার। নবম ওভারে রাসেলের প্রথম বল পয়েন্টের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর পরের বলেই সিøপে ক্রিস গেইলকে সৌম্য ক্যাচ দিলে হয় ছন্দপতন। দুটো করে ছক্কা ও চারের মারে ২৩ বলে ২৯ রানের ইনিংস খেলেন টাইগার ওপেনার। সৌম্যর বিদায়ে ভাঙে ৫২ রানের প্রথম উইকেটের পার্টনারশিপ।

চলতি বিশ্বকাপে আগের তিনটা ম্যাচে রানের দেখা না পাওয়া তামিম সোমবারের ম্যাচেও কিছুটা খোলসের মধ্যে ছিলেন। সৌম্যর দেখানো পথে এবং বন্ধু সাকিবকে সঙ্গী হিসেবে ক্রিজে পেয়ে হাত খোলেন তিনি। দুজনের ব্যাটে ভালোই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। শেলডন কটরেলের অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় তামিম রান আউট হলে ভাঙে এই জুটি। ফেরার আগে দ্বিতীয় উইকেটে সাকিবের সঙ্গে তামিমের পার্টনারশিপ ৬৯ রানের। ১৮তম ওভারের তৃতীয় বলটা সামনে ঠেলে পপিং ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তামিম। ফলো থ্রুতে বাম হাতে বল ধরেই চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় তামিম ফেরার আগেই স্ট্যাম্প এলামেলো করে দেন কটরেল। তামিমের ৫৩ বলে ৪৮ রানের ইনিংসে ছিল ছয়টি বাউন্ডারি।

তামিম আউট হওয়ার পরের ওভারটা ছিল ওশান টমাসের। লেগ স্ট্যাম্পের বেশ বাইরের ওই বল ছেড়ে দিলেই ওয়াইড হতো। আপাত নিরীহ একটা বলে অযথাই গ্লান্স করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন মুশফিকুর রহিম (১)। টানা দুই ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশ দলের ইনিংস ১৩৩ থেকে রান পর্যন্ত টেনে নেন লিটন কুমার দাস ও সাকিব আল হাসান।

চলতি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নিজের সেরা ফর্মে থাকা সাকিব ৪০ বলে সাত বাউন্ডারিতে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। এরপর মনঃসংযোগে সামান্যতম কমতি হয়নি তার। ৪৩ বলে পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচেই সাকিব ভাগ বসিয়েছেন বন্ধু তামিমের রেকর্ডে। এতদিন ধরে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে তামিমেরই ছয় হাজার রান ছিল। দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সাকিব ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে এই ক্লাবের সদস্য হয়ে যান। ৮৩ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করা সাকিব মাঠ ছেড়েছেন দলের জয় নিয়ে। তার ৯৯ বলে ১২৪ রানের মহাকাব্যিক অপরাজিত ইনিংসটায় কোন ছক্কা ছিল না। ছিল দৃষ্টিনন্দন ১১টি বাউন্ডারি।

অপরপ্রান্তে লিটন কুমার দাসও ব্যাট চালান সিনিয়রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ৪৩ বলে চার বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় পূর্ণ করেন হাফ সেঞ্চুরি। দলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার আগে আরও ২৬ বল খেলে লিটন জমা দেন ৪৪ রান। দলের প্রয়োজনে লিটন আট বাউন্ডারি ও চারটি ছক্কা হাঁকিয়েই জমা দিয়েছেন ৫৬ রান। ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে মাঠ ছাড়ার সময়ে এরকম একটা ম্যাচে মাত্র ছয় রানের জন্য সেঞ্চুরি বঞ্চিত হবার আক্ষেপ হয়তো আছে লিটনের। কিন্তু দলের পাওয়া এই অবিস্মরণীয় জয়টা যে অনেক বড়।