‘জীবনের চেয়েও গোলকে বড় মনে করতাম’

image

সিলেট মূল শহর থেকে একটু ভেতরে করেরপাড়া। স্থানীয় কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে খোঁজ মিলল প্রবীণ ফুটবলার রণজিত দাসের বাড়ির। করেরপাড়ার শেষ প্রান্তের শেষ বাড়িটা কমলাকান্ত ভবন। চার তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলা থাকেন বাংলাদেশের ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক রণজিত দাস। বয়স নব্বই ছুইছুই। ছোট কদমে হাটেন। কানে শোনেন না একেবারেই। কাগজে লিখে কথা বোঝাতে হয়। কাগজ পড়ে উত্তর দেন একেবারে বলিষ্ঠ কন্ঠে। গলার স্বরে এখনো তারুণ্যের ভর। স্মৃতিশক্তিও অসম্ভব প্রখর। ৫০-৬০ দশকের ঘটনা বলে গেলেন অবলীলায়।

রণজিত দাসের সমসাময়িক মারী, আশরাফ, কবির, চুন্না রশিদ (কাজী সালাহউদ্দিনের গুরু), অনেকেই পরপারে। রণজিত সিলেটে থাকলেও যারা বেঁচে আছেন তাদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে,‘ আমার সমসাময়িক নব্বইভাগ ফুটবলারই তো নেই। তিন দিন আগে গাউস ( আজাদ স্পোর্টিংয়ের ফুটবলার) মারা গেল। এখন আমাদের যাওয়ার সময়। বশিরও অসুস্থ। বশির যোগাযোগ করে। টিপু, পিন্টু, প্রতাপ আমার জুনিয়র হলেও যোগাযোগ আছে। ’

১৯৫৫ সালে ইস্পাহানীর হয়ে খেলা শুরু রণজিতের। ৫৬-৫৮ সালে ছিলেন আজাদ স্পোর্টিংয়ে। মাঝে এক বছর ছিলেন অধিনায়ক। অধিনায়ক হয়ে লীগ চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। ৫৯ সালে এক মৌসুমে মোহামেডানের হয়ে খেলেছিলেন। ঐ মৌসুমে আগাখান গোল্ডকাপ, লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহামেডান। ভারতে আইএফএ শিল্ডও খেলেছেন মোহামেডানের হয়ে। পরের বছরই আজাদ স্পোর্টিংয়ে ফিরতে হয়। এর পর ক্লাব বদলাননি। আজাদের রণজিতই হয়েই থাকেন। এই বয়সেও এত দূরে থেকেও আজাদ স্পোর্টিংকে মনেপ্রাণে ধারণ করেন,‘ প্রতি মুহূর্ত ও নিঃশ্বাসে রয়েছে আজাদ স্পোর্টিং। আমান চৌধুরি, গেদা ওরা তো মারাই গেছে। এখন ইউসুফ যোগাযোগ করে। এখন তো ক্রিকেটের দিকে ঝুকেছে বেশি। ফুটবল তো মনে হয় তৃতীয় বিভাগে (দ্বিতীয় বিভাগে এখন) খেলে। আমরা যতদিন বেঁচে আছি আজাদও ততদিন থাকবে।’ যারা তার খেলা দেখেছেন এবং সাবেক অনেক ফুটবলারই বলেন রণজিত দাস বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক। কাগজে এই বিষয়ে লিখে মন্তব্য চাইলে মৃদু হেসে বলেন,‘ আমার বাবা বলতেন তুমি চেষ্টা করলে তৃতীয় শ্রেণীর গোলরক্ষক হতে পারবে। সেরা তো কখনোই নয়। আমি চেষ্টা করে গেছি প্রাণপণ জানি না কতটুকু পেরেছি সেটা জানি না। জীবনের চেয়েও গোলকে বড় মনে করতাম ’।

বাড়িতে থাকলেও টিভিতে ফুটবল দেখেন। পত্রিকায় ফুটবলের খবর পড়েন। সাফে নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের হারটি বুকে শেল হয়েই বিধেছে তার,‘ সেদিন গোলরক্ষক শিশুসুলভ গোল খেয়েছে। এটা কাম্য নয়। ম্যাচ টেম্পারমেন্ট অনেক বড় বিষয়। গোলকিপিং অনেক সাধনা ও আত্মত্যাগের বিষয়।’

গ্রিপিং, সেন্স, ধারাবাহিকতা অনেক দিক থেকেই রণজিত আদর্শ গোলরক্ষক। জীবনের শুরুতে গোলরক্ষক তো নয়-ই, তাঁর ফুটবলারই হওয়ার কথা ছিল না। ফুটবলার হওয়ার গল্পটা বললেন,‘ ফুটবল ছিল তখন বৃষ্টি মৌসুমের খেলা। সব সময় বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিক্স খেলতাম। স্বপনের (সাবেক তারকা ফুটবলার কায়সার হামিদের ডাক নাম) বাবা আব্দুল হামিদের জন্যই আমি গোলরক্ষক হয়েছি। ১৯৪৮ সালে আমি ছিলাম বিডি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। হামিদ ছিল আলীয়া মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। সাইফুর (মরমী কবি হাছন রাজার নাতনী) ও আমি মিলে হামিদকে আমাদের স্কুলে আনি। ও আমাকে হারিয়ে নবম শ্রেণীতে ক্যাপ্টেন হয়। আমাকে গোলকিপিং করতে বলে। প্রথম ম্যাচে আমার ভুলে দল হেরেছিল। খুব খারাপ লেগেছিল। এরপর থেকে জিদ ছিল গোলরক্ষকই খেলব। ’

নিজে গোলরক্ষক হলেও জাতীয় (চিং হু লাং চৌধুরী মারী) ও আন্তর্জাতিক (ফেরেঙ্ক পুসকাস) পর্যায়ে তার প্রিয় ফুটবলার দুজনই ফরোয়ার্ড। তার সময় ও এই সময়ের ফুটবল এবং গোলরক্ষকদের অবস্থান ব্যাখা করলেন দারুণভাবে, ‘আমাদের সময়ে ফুটবলে দুই ব্যাক তিন হাফ আর পাচ ফরোয়ার্ড। গোলরক্ষকরা বৃত্তের বাইরে বের হতে পারত না। অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। তাহলে চিন্তা করুন গোলরক্ষকদের কত কষ্ট হতো। আর এখন একটু নেতিবাচক ফুটবল বেশি হয়। চার-পাঁচ জন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলে। নব্বই মিনিটে অনেক সময় এক গোলও হয় না। ’

নিজের একটি সমালোচনার দিক উন্মোচন করলেন নিজেই, ‘গোলরক্ষকদের লম্বা হওয়া ভালো। আমি একটু খাটো। এজন্য রিংয়ে ঝুলতাম। লাফিয়ে আমি মাথা দিয়ে আট ফিট পোস্ট স্পর্শ করতে পারতাম।’ সান্টুর গোলরক্ষক হওয়াও তার মাধ্যমে,‘ সান্টু ক্রিকেট খেলতে ঢাকায় এসেছে। ভালো পেস বল করতো। ওর উচ্চতা দেখে বললাম আজাদ স্পোর্টিংয়ে খেলাব। অনুশীলনে দেখলাম ভালো সেন্স। এরপর থেকে ও গোলরক্ষক। ’ তার শিষ্য সান্টু, সমসাময়িক মারী, আশরাফ, কবির, একটু জুনিয়র পিন্টু, প্রতাপরাও পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছেন। তিনি পাকিস্তান দলে সুযোগ পাননি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার বয়স ছিল না। জাতীয় দলে খেলতে না পারলেও অতৃপ্তি নেই কোনো। তবে স্বাধীন বাংলা ফুটবলের সাথে সম্পৃক্ত হতে না পারায় আফসোস আছে কিছুটা,‘ আমি তখন অনেক সিনিয়র ফুটবলার। ইচ্ছে ছিল যাওয়ার। কিন্তু মাত্র মেয়ে হয়েছে। মেয়ে, স্ত্রী ও ভাতিজি নরসিংদী। ওদের রেখে যেতে পারিনি। ’ ফুটবল ক্যারিয়ার ও ব্যক্তি জীবনে কোনো অতৃপ্তি নেই,‘ ভগবান আমাকে খুব ভালো রেখেছে। ছেলে-মেয়ে মানুষ হয়েছে। সবাই ভালো আছে। সমাজের অনেকে আমাকে শ্রদ্ধা করে। এর চেয়ে বড় পাওয়া জীবনে আর কি হতে পারে। ’