সংস্কৃতির মূলধারা সংকুচিত হচ্ছে

সমাজ ও ব্যক্তির জন্য সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ সংকট

দেশে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দিন দিন কমছে। সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারি, জবাবদিহি ও আন্তরিকতার অভাব। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশেষ বিশেষ দিবস পালন ও উৎসব উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ নেই বললেই চলে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির কদর তো বাড়ছেই, তার ওপর পরীক্ষা আর মুখস্থ বিদ্যার চাপে স্কুল থেকে সংস্কৃতিচর্চা একেবারেই নির্বাসিত হয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক ছাত্রের চাপ সামলাতে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা, ডিগ্রি আর সনদের মধ্যে আটকে গেছে। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যে শরীর-মনের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য যেসব খোরাক-রসদ দরকার, তার কিছুই দিতে পারে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার কারণে তাদের মধ্যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, নিজেকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারার ও অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের অক্ষমতা, বিচারহীনতা তৈরি হচ্ছে। তার ওপর রাজধানীর খোলা জায়গা এবং খেলার মাঠগুলো চলে গেছে ভূমিদস্যু ও দখলবাজদের দখলে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা না থাকা এবং খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তরুণরা সামাজিক-সম্প্রীতি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে তাদের চিন্তাভাবনা। ফলে তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভুল শিক্ষা নিয়ে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এরই চরম পরিণতি হিসেবে গুলশান-কিশোরগঞ্জে জঙ্গি হামলায় মানুষ হত্যার ঘটনা দেখতে হয়েছে।

এটা স্পষ্ট যে, যারা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদে জড়িত, তারা পরিবার, সমাজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে নানাভাবে বিচ্ছিন্ন। ধর্মের নামে তাদের এমন উগ্রতায় দীক্ষিত করা হচ্ছে যে, তারা নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা করছে। মাত্র অল্প কিছুদিনের প্রশিক্ষণে তারা কী করে এভাবে অমানুষ হতে পারে, এটা ভাবার বিষয়।

রাষ্ট্র পরিচালনা করে রাজনীতি। আর এর পেছনে থাকে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো রাষ্ট্র ও জাতির অসাধারণ সম্পদ। এর চর্চা না হলে ছেলেমেয়েরা বিপথগামী হবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ অবস্থায় সরকার কী করতে পারে? সংস্কৃতি কোন আরোপিত বিষয় নয়। ভাষা ও সংস্কৃতি সব সময় গতিশীল, তাই এর রূপান্তর, পরিবর্তন, উত্তরণ ঘটবেই এবং তাতে গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকবেই। সরকারের কাছে কাম্য হলো সুস্থ সংস্কৃতির ধারা বহমান রাখা এবং তার অনুকূলে ভূমিকা পালন। সুস্থ প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত হবে সমাজকে আরও জায়গা দেয়া, সৃষ্টিশীল মানুষদের স্বাধীনতার পরিসর বাড়তে দেয়া এবং শিক্ষাকে স্বদেশ ও সংস্কৃতি চর্চার সমন্বয়ে প্রাণবন্ত মানবিক ও গভীরতায় সমৃদ্ধ হতে দেয়া।

ভাষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে যে লড়াই করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর সেগুলো আর অব্যাহত রাখা হয়নি। বরং জঙ্গির ভয় দেখিয়ে সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রগুলোকে সংকুচিত করে তোলা হয়েছে। অথচ পাকিস্তানি আমলেও শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল ও অন্ধকারের শক্তিদের রুখে দেয়া হয়েছিল। আজ সেসব হচ্ছে না এবং করতেও দেয়া হচ্ছে না। মুক্তচিন্তার বন্ধ্যত্বের ফলে জন্ম নিচ্ছে ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদ।

সংস্কৃতি যত ছড়াবে মানুষের মন তত আলোকিত হবে। আগে পাড়ায় পাড়ায় গ্রন্থাগার থাকত। খেলার মাঠ থাকত। পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, যাত্রাগান-পালাগান, গ্রামাঞ্চলে পুঁথিপাঠের আসর বসত। মানুষ রাত জেগে যাত্রা দেখত, সেখান থেকে মানবিক হয়ে ওঠার শিক্ষা পেত। এখন যাত্রা করতে দেয়া হয় না। সর্বজনীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করে দেয়া হয় প্রশাসনিক পুলিশি নির্দেশে। সাংস্কৃতিক বোধ এবং সাংস্কৃতিক চর্চা শক্তিশালী হবে কিভাবে। শক্তিশালী সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাই সমাজ থেকে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় রাজনীতির মতো অপশক্তিগুলোকে রুখে দিতে পারে। এ দেশেই সেটা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই সংস্কৃতির চর্চাকেই এখন নিয়ন্ত্রণ করে বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে গেছে। আগে সাংস্কৃতিক কিছু কর্মকান্ড সবাইকে আন্দোলিত করত। কিন্তু এখন তো সেগুলো হারিয়ে গেছে। সংস্কৃতি স্বাভাবিক প্রবাহমানতা রুদ্ধ করে সংস্কৃতিতে ‘ফরমায়েশি এবং প্রাতিষ্ঠানিক’ অচলায়তনে পরিণত করা হচ্ছে। অল্প পরিসরে যেটা আছে, তা কোনও আবেদন রাখতে পারছে না। তারা যে ধরনের রুচি গড়ে তুলেছে, তাতে তাদের বাঙালি সাংস্কৃতির যে মূলধারা, তা তাদের কোনও আকর্ষণ করে না। সংস্কৃতিগত চেতনা বাড়াতে হবে। পরস্পরের সঙ্গে ভাবনা-বিনিময় বাড়াতে হবে।

সব অপশক্তিকে প্রতিহত করার অন্যতম উপায় হলো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা। সংস্কৃতি মানুষকে হতাশা থেকে বাঁচায়। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হওয়া যায়। শিক্ষাঙ্গনে বাংলার উদার মানবিক ধারার সংস্কৃতিচর্চার পথ খুলে তা বেগবান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ধর্মান্ধ বা জঙ্গি তরুণ সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়। এর জন্য বিস্তারিত সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রয়োজন। সমাজকে সেবা ও কল্যাণের পথে এবং সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে মানবিক করে তোলার জন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজে সুস্থ ইতিবাচক মানবিক বাতাবরণ তৈরির জন্য ওয়ার্ড ও ইউপি এবং গ্রামাঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এ ধারায় সক্রিয় করে তুলতে হবে। খোলামেলা পরিবেশে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে সংস্কৃতির সুস্থধারা বহমান থাকলে সমাজ সুস্থ থাকবে।

দৈনিক সংবাদ : ২০ মে ২০১৯, সোমবার, ৬ এর পাতায় প্রকাশিত

পরিবহন সেক্টরকে মাফিয়ামুক্ত করুন

সাত দফা দাবিতে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে গত সোমবার দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত

জঙ্গিবাদের হুমকি মোকাবিলায় ঐক্য গড়ে তুলুন

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে হামলার পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার

গণধর্ষণ মামলার চার্জশিট প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশের ভূমিকা

সুবর্ণচরে গণধর্ষণের শিকার নারীর অভিযোগ ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রতীকে ভোট দেয়ায় তার ওপর নির্যাতন হয়েছে

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত করতে হবে

চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগ মানসম্মত বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারায়

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চাই কঠোর মনিটরিং

আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রিসাইক্লিংয়ে পরিকল্পিত ও স্থায়ী উদ্যোগ নিন

ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বা ই-বর্জ্যরে পরিমাণও। এসব ই-বর্জ্যরে দূষণ থেকে প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা

বর্ষার আগেই ঢাকাডুবি কেন নগর কর্তৃপক্ষ কী করছে

চৈত্র মাসেই বৃষ্টির পানি জমে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ এলাকার রাস্তা

পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার মামলায় স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভিকটিমের স্বজনরা।

স্বাভাবিক পুঁজিবাজার চাই অনৈতিক কারসাজি দমন করুন

দেশের পুঁজিবাজারে এখনও কারসাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছে এমন