এক বাগানের ফুল

মিথুশিলাক মুরমু

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো সিংহাসনে আরোহনের পরই তার শাসনকালকে ‘রেইওয়া’ নামকরণ করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োশিহিদে সুগা। হিসাব মতে, আগামী ১ মে থেকে শুরু হচ্ছে নতুন যুগের, এই দিনই সিংহাসনে আরোহণ করবেন নতুন সম্রাট নারুহিতো। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে ‘রেইওয়া’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। দুটি বর্ণসহযোগে গঠিত শব্দটির একটি বর্ণ ‘রেই’। জাপানি ভাষায় যার অর্থ ‘শৃঙ্খলা’; এর আরেকটি অর্থ ‘শুভ’। ‘ওয়া’ অর্থ শান্তি বা সম্প্রীতি। জাপানের ইতিহাসে প্রথম সম্রাট যিনি জীবদ্দশায় সিংহাসন ত্যাগ করতে যাচ্ছেন। জাপানিরা প্রার্থনা ও বিশ্বাস করেছে- তাদের সম্রাট শৃঙ্খলা, শান্তি ও সম্প্রীতির আদর্শ নিয়ে জাপানকে নেতৃত্ব দেবেন; বিশ্বমঞ্চে আদর্শিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজেদের শান্তির ধারক-বাহকের অগ্রগণ্য বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবেন।

নিউজিল্যান্ডে উগ্রধর্মান্ধ ও বর্ণবাদী ধারণায় বিভোর অস্ট্রেলিয় যুবক ব্রেনটন টারান্ট (২৮) যে মর্মান্তিক ঘটনার অবতারণা করেছেন; তাতে আমরা বিস্মিত ও হতবাক হয়েছি। করজোড়ে প্রার্থনা করেছি, ঈশ্বর যেন সেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের দায়িত্ব তুলে নেন। যিনি এহেন ঘৃর্ণ্য কাজ করেছেন, তার সম্পর্কে ফরিদ আহমেদের ক্ষমার বাণী বিশ্ববাসীকে মোহিত করেছে। ফরিদ আহমেদের স্ত্রী সেদিনের ঘটনার শিকার হয়েছেন, বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে নিহত হয়েছেন। নিহত স্ত্রীর স্মৃতিকে ধারণ করেই খুনির ব্যাপারে বলেছেন-

‘মানুষ আমার কাছে জানতে চাইছে, স্ত্রীর খুনিকে আমি কীভাবে ক্ষমা করতে পারলাম? এ প্রশ্নের অনেক জবাব আমি দিতে পারি, সেসবে দরকার নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন, আমরা যদি একে অন্যকে ক্ষমা করি, তিনি আমাদের ভালোবাসবেন। মানুষের কত ধর্ম, কত বর্ণ, কত সংস্কৃতি। কিন্তু সব মানুষই একেকটা ফুলের মতো। আর সবাই মিলেই আমরা একটা সুন্দর বাগান।’

ক্ষমা করার হৃদয়, বিশালতা, ক্ষমতা, দেল, দেমাগ, সুন্দরতম মনোভাব না থাকলে কখনোই ক্ষমা করা যায় না। তর্কের খাতিরে বলবেন, দুর্বলরা সবলদের ক্ষমা না করে উপায় নেই। এখানে এটি আপেক্ষিক বিষয়, ক্ষমা আর দুর্বলতা ভিন্ন বিষয়; স্বর্গীয় স্রষ্টার ওপর বিশ্বাসগত, ভক্তিগত, আস্থাগত চিন্তা-চেতনা না থাকলে ক্ষমার বাণী উচ্চারণ করা সম্ভবপর নয়। শাস্ত্রে রয়েছে-

‘বস্তুতঃ প্রভু সদাপ্রভু, ইস্রায়েলের পবিত্রতম এই কথা বলিলেন, ফিরিয়া আসিয়া শান্ত হইলে তোমরা পরিত্রাণ পাইবে, সুস্থির থাকিয়া বিশ্বাস করিলে তোমাদের পরাক্রম হইবে’।

নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসকে কলঙ্কের দাগ থেকে মুক্ত করার যে নিরলস প্রচেষ্টা প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন চালিয়েছেন; সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে সংবরণ করতে নিজেও হিজাব পরিহিত হয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছেন-

‘ঘৃণা ও ভীতির ভাইরাস প্রতিরোধী আমরা নই। কোনদিন তা হতেও পারব না। কিন্তু আমরা এমন একটি জাতি হতে পারি, যারা এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে। ...পৃথিবীতে বর্ণবাদ আছে, তবে আমার দেশে তা ঢুকতে দেয়া হবে না।’

সাদা-কালো-বাদামি, লম্বা-খাটো বৈষম্য মানুষই সৃষ্টি করেছে। আমরাই ঈশ্বরের উত্তমতা, সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যকে কুলষিত করে চলেছি। আর সেটি কখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনও গায়ের রং দিয়ে; আবার কখনও ধনী-গরিব সামাজিক স্ট্যাটাস উদ্ভাবন করে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরীয় গুণাবলী বিদ্যমান, সেটিকে কেউ আবিষ্কার করতে সমর্থ হই; কেউবা অপব্যবহার করে। মানুষে মানুষে বিভেদ, অশান্তি, সাম্প্রদায়িকতাই এখন বিশে^ সবচেয়ে বড় সমস্যা। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে-

‘প্রতিশোধ লওয়া আমারই কর্ম, আমিই প্রতিফল দিব, ...তোমার শত্রু যদি ক্ষুধিত হয়, তাহাকে ভোজন করাও; যদি সে পিপাসিত হয়, তাহাকে পান করাও; কেননা তাহা করিলে তুমি তাহার মস্তকে জ¦লন্ত অঙ্গারের রাশি করিয়া রাখিবে, আর সদাপ্রভু তোমাকে পুরস্কার দেবেন।’

বিগত বছর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে গোপালগঞ্জ সদরে অবস্থান করছিলাম। জেলা শহর থেকে বিভিন্ন জায়গায় গমনাগমন করতে গিয়ে সুন্দর ও চমৎকার বিলবোর্ড লক্ষ্য করেছি। বিলবোর্ডে চারটি ধর্মের (ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান) চিত্র অঙ্কিত রয়েছে এবং নিচে লেখা রয়েছে- ‘সব ধর্মই শান্তির চর্চা করে’।

এ বিলবোর্ডটি খ্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেণ্ট ইন বাংলাদেশের (সিসিডিবি) সৌজন্যে স্থাপিত হয়েছে। এ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানটি মহান মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের অবকাঠামো, সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী নিয়েই এগিয়ে চলেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় পুরোহিত রেভা. শমুয়েল এস. বালার সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি বিলবোর্ড সম্পর্কে মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, চেতনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার যে অভাবনীয় প্রভাব তা স্বীকার করেন। মানুষের সামনে দিনের পর দিন এরূপ বিলবোর্ড থাকলে, এক সময় নিজ থেকেই অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ে; সেটি হতে পারে পারস্পরিক মতবিনিময় কিংবা বইপুস্তক অধ্যয়ন করে। উদার দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় চেতনার মানুষ কখনোই সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি, গোপালগঞ্জের এ দৃষ্টান্ত দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ‘বাংলাদেশের গৌরব’-এর বর্ণনা করা হয়েছে এরূপ- বাংলাদেশের প্রায় সব লোক বাংলায় কথা বলে। তবে আমাদের দেশে যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, তেমনি রয়েছে মানুষ ও ভাষার বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকজন। এদের কেউ চাকমা, কেউ মারমা, কেউ মুরং, কেউ তঞ্চঙ্গ্যা ইত্যাদি। এছাড়া রাজশাহী ও জামালপুরে রয়েছে সাঁওতাল ও রাজবংশীদের বসবাস। তাদের রয়েছে নিজ নিজ ভাষা। একই দেশ অথচ কত বৈচিত্র্য। সবাই সবার বন্ধু, আপনজন। এদেশে রয়েছে নানা ধর্মের লোক। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। সবাই মিলেমিশে আছে যুগ যুগ ধরে। চিন্তা- চেতনায়, ভাবনায় যেন সত্যে পরিণত হয়, ইসলাম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী, আমরা সবাই এক বাগানের ফুল।

দৈনিক সংবাদ : ২৯ এপ্রিল ২০১৯, সোমবার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

image

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আটকে রাখা যায় না

image

বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ : কারণ ও প্রতিকার

ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। পাইরিকুলারিয়া ওরাইজি (Pyriculria Orayzai) নামক

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

বাঙালির অবিসংবাদিক নেতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে।

মুজিবনগর সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব

image

মাদক আসছেই

জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর

চৈত্রসংক্রান্তি : আদি-অন্তের সুলুকসন্ধান

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’। ‘চৈত্রসংক্রান্তি’- বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দিন, ঋতুরাজ বসন্তেরও

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ার সেই দিনটি

image