চৈত্রসংক্রান্তি : আদি-অন্তের সুলুকসন্ধান

শরীফুল্লাহ মুক্তি

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’। ‘চৈত্রসংক্রান্তি’- বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দিন, ঋতুরাজ বসন্তেরও শেষ দিন। বাংলা বছরের শেষ দিন হওয়ায় চৈত্র মাসের শেষ এ দিনটিকে আমরা ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ বলি। দীর্ঘ দিন ধরে চৈত্রের শেষ এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানা উপাচারের মাধ্যমে একটি বঙ্গাব্দকে বিদায় জানানোর জন্য বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে মেতে ওঠে।

সৌর বছর আমাদের। বাংলা বছরের হিসাব চলে সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে। এখানে সময়ের শেষ বা শুরু বলে কিছু নেই। প্রকৃতির নিয়মে বাংলার ঋতুচক্রের পালাবদলে উষ্ণতা নিয়ে আসে গ্রীস্ম। প্রখর তপন-তাপে আকাশ তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। মানব মনও তৃষিত হয় প্রকৃতিকে বরণ করতে, স্মরণ করতে। এরি মাঝে চৈত্রের আগমনী। বারো মাসের বছরের শেষ মাস চৈত্রেও বছরের শেষ হয় না। এ যেন বারবার ঘুরে ঘুরে আসা। ‘সংক্রান্তি’ মানে এক ক্রান্তি থেকে আরেক ক্রান্তি বা এক কিনারা থেকে আরেক কিনারায় যাওয়া। অর্থাৎ ক্রান্তির সঞ্চার বা সাঁতার। মহাকালের অনাদি ও অশেষের মাঝে ঋতুর বদল করতে করতে সূর্যেরও আরও গ্রহ-উপগ্রহ-গ্রহাণু-উল্কার সঙ্গে সঙ্গে সাঁতরে চলা। এ এক চক্রের মতো, চরকার মতো। সূর্য সঁাঁতরে চলে, ঋতুরা ফিরে ফিরে আসে। ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে সময়। নতুন নেই, পুরাতনও নেই।

চৈত্রসংক্রান্তির দিনের সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে যায় একটি বঙ্গাব্দ। উপমহাদেশের সনাতন প্রথা অনুসারী মানুষেরা দিনটিকে খুবই পুণ্যের দিন হিসেবে মনে করে। সনাতন পঞ্জিকামতে, দিনটিকে গণ্য করা হয় মহাবিষুব-সংক্রান্তি হিসেবে। সাধারণত ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ বলতে মেলা, গাজন ও পূজার কথা বলা হয়। হিন্দুরা পিতৃপুরুষের তর্পণ করে থাকে, নদীতে বা দিঘীতে পুণ্যস্নান করে থাকে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এ দিনটিকে নানা উৎসবের মাধ্যমে পালন করে থাকে; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বিঝু’ ও ‘বৈসাবি’ উৎসব। বর্তমানে শহরাঞ্চলে নগর-সংস্কৃতির আমেজে চৈত্রসংক্রান্তি মেলা বা উৎসব বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়। এছাড়াও চৈত্রের এই শেষ দিনটিতে থাকে বর্ষ-বিদায়ের নানা আয়োজন। চৈত্রসংক্রান্তি শেষ হয় নতুন বছরের আগমনী সুর নিয়ে।

যে চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বাঙালির এত আয়োজন তার একটি ঐতিহ্যবাহী আদি ইতিহাস আছে। বাংলা সনের শেষ মাসের নামকরণ হয়েছে ‘চিত্রা’ নক্ষত্রের নামানুসারে। আদিগ্রন্থ পুরাণে বর্ণিত সাতাশটি নক্ষত্র আছে যার নামকরণ রাজা/প্রজাপতির দক্ষের সুন্দরী কন্যাদের নামানুসারে হয়েছে। প্রবাদতুল্য সুন্দরী এ কন্যাদের বিয়ে দেয়ার চিন্তায় উৎকণ্ঠিত রাজা দক্ষ। উপযুক্ত পাত্র কোথায়? যোগ্য পাত্র খুঁজে পাওয়া কি সহজ বিষয়? যোগ্য পাত্র পাওয়া না গেলে কি অনূঢ়া থেকে যাবে তারা? না, বিধির বিধানে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেল। একদিন মহা ধুমধামে চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিয়ে হলো দক্ষের সাতাশজন কন্যার। দক্ষের এক কন্যা চিত্রার নামানুসারে ‘চিত্রানক্ষত্রা’ এবং চিত্রানক্ষত্রা থেকে ‘চৈত্র’ মাসের নামকরণ হয়। রাজা দক্ষের আরেক সুন্দরী কন্যা বিশাখার নামানুসারে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র এবং বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে ‘বৈশাখ’ মাসের নামকরণ হয়।

চৈত্রসংক্রান্তিতে দেশজুড়ে চলে নানা ধরনের আয়োজন; মেলা-উৎসব। হালখাতার জন্য নতুন করে সাজানো হয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। লাঠিখেলা, গান, আবৃত্তি, সংযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও ভূত তাড়ানোর মধ্য দিয়েও উদযাপিত হয় চৈত্রসংক্রান্তি। চৈত্রসংক্রান্তিতে পুরনো ঢাকায় ওঝা সেজে হাতে ঝাড়– নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় ছোট্ট শিশুরা ভূত তাড়ানোর খেলায় মেতে ওঠে।

চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম আকর্ষণ গাজন। গাজন একটি লোকউৎসব। চৈত্রসংক্রান্তি থেকে শুরু করে আষাঢ়ি পূর্ণিমা পর্যন্ত সংক্রান্তিÑ কিংবা পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব উদযাপিত হয়। এ উৎসবের সঙ্গে জড়িত আছে অনেক পুরাতন ও লৌকিক দেবতাদের নাম। যেমন- শিবের গাজন, নীলের গাজন ইত্যাদি। এ উৎসবের মূল লক্ষ্য সূর্য এবং তার পত্মীরূপ কল্পিত পৃথিবীর বিবাহ দেয়া। গাজন উৎসবের পেছনে কৃষক সমাজের একটি সনাতনী বিশ্বাস কাজ করে। চৈত্র থেকে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্যের যখন প্রচ- তাপ থাকে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও বৃষ্টি লাভের আশায় কৃষিজীবী সমাজ সুদূর অতীতে এ অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করেছিলেন।

চৈত্রসংক্রান্তি মেলা আবহমান বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলা নববর্ষের শেষ লগ্নে অর্থাৎ চৈত্রের শেষ দিন গ্রামে গ্রামে বসত এই মেলা। সময়ের স্রোতে হারানো বহু লোকজ ধারার মতোই চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপনের রেওয়াজ এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। চৈত্রসংক্রান্তি মেলা লোকজ উৎসব বিশেষ। প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব এটি। শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে এদিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যজনক মনে করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক পূজা বা নীল পূজা। চড়ক গাজন-উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। এ সময় শিব সম্পর্কে নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়, যাতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে-কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। এ মেলাতে সাধারণত শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বরশিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি সব ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলা-কৌশল দেখানো হয়। এর সঙ্গে চলে গাজনের মেলা। বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশেষ উপাদানে পরিণত হয়েছে চৈত্রসংক্রান্তির এসব আয়োজন। এখনও চৈত্রসংক্রান্তির মেলা চালু আছে অনেক অঞ্চলে। এলাকাভেদে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা একদিন হতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলে। ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্য, খাজা-গজা প্রভৃতির সমারোহ ঘটে গ্রামীণ এ মেলাগুলোতে। মেলাকে কেন্দ্র করেই এখন মুখর হয়ে ওঠে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব। দীর্ঘকাল আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থানে এ উপলক্ষে মেলা বসে। বাংলাদেশের হিন্দু প্রধান অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এতে বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন রকমের ফলফলাদি ও মিষ্টি ক্রয়-বিক্রয় হয় এবং বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি উড়ানো, মোরগ-লড়াই ইত্যাদি চিত্ত-বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল ইত্যাদি অঞ্চলে এই মেলা বসে। অঞ্চলভেদে তিন-চার দিন ধরে এ মেলা চলে।

ঠিক একই সময়ে আদিবাসী সম্প্রদায় পালন করে বর্ষবিদায়, বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ‘বৈসাবি’। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি সাধারণত পুরাতন বর্ষকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ করতে সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু উৎসব পালন করে থাকে। ত্রিপুরাদের বৈসুক শব্দ থেকে ‘বৈ’ মারমাদের সাংগ্রাই শব্দ থেকে ‘সা’ এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিঝু/বিষু শব্দ থেকে ‘বি’ আদ্যাক্ষরগুলোর সমন্বয়ে ‘বৈসাবি’ শব্দের নামকরণ হয়েছে। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব ‘বৈসুক’। বাংলা বছরের শেষ তিন দিনব্যাপী পার্বত্যবাসী অতি আনন্দের সঙ্গে এ উৎসব পালন করে থাকে। অন্য সম্প্রদায় তথা সব ধর্মের লোকও এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সামর্থ্যানুযায়ী ঘরের ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক দেয়া হয়, খাবার হিসেবে বিভিন্ন রকমের পিঠা ও পাঁচন তৈরি হয়ে থাকে। বৈসুক উৎসবের প্রধান আপ্যায়নের বস্তু হলো পাঁচন। পাঁচন সাধারণত বন-জঙ্গলের হরেক রকমের শাক-সবজির মিশ্রণ। তারা মনে করে বছরের শেষ ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন শাক-সবজি দিয়ে পাঁচন খেলে পরবর্তী বছরের রোগ-বালাই থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বছরের শেষ দিনের আগের দিনকে ‘হারি বৈসুক’, শেষ দিনকে বলে ‘বৈসুকমা’, আর নতুন বৎসরকে বলে ‘আতাদাকি’। হারি বৈসুক দিনে প্রথমে তারা ফুল সংগ্রহ করে বাড়ি-ঘর, মন্দির সাজায়। তারপর তারা গায়ে কুচাই পানি (পবিত্র পানি) ছিটিয়ে স্নান করে আসে, সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের পানি তুলে স্নান করিয়ে আশীর্বাদ নেয়। পরবর্তী দিনে পাড়ার যুবক ছেলেরা একজন ওঝার নেতৃত্বে দল বেঁধে গরয়া নৃত্যের মহড়া দেয়। গরয়া দেবতার পুজো দিয়ে তার আশীর্বাদ বক্ষবন্ধনী দিয়ে বেঁধে রাখে। তাদের বিশ্বাস, কারায়া গরয়া হচ্ছে বনের হিংস্র পশুদের নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা। তাদের ধারণা পুজোর আশীর্বাদ গ্রহণ করলে পরবর্তী বছরের জুমচাষ ও বিভিন্ন কাজে বনে-জঙ্গলে গেলে হিংস্র পশুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

পার্বত্য চট্রগ্রামের মারমা এবং কক্সবাজারের রাখাইনদের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘সাংগ্রাই’। মারমা বর্ষের শেষ মাস ‘তেংখুং’। নববর্ষের প্রথম মাস ‘কোসুং’ মাসের প্রথমে এবং বিদায়ী ‘তেংখুং’ মাসের শেষ দিনে এই উৎসব পালন করা হয়। ত্রিপুরাদের মতো তারাও নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটা করে থাকে এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠা, বিনিভাত, পায়েস রেঁধে বিভিন্ন আত্মীয় বাড়ি পাঠায়। সাংগ্রাই-এর মূল আকর্ষণ তরুণ-তরুণীদের জলোৎসব। জলোৎসবের জন্য আগে থেকেই প্যান্ডেল তৈরি করে জল মজুদ রাখা হয়। মজুদ রাখা জলের দু’দিকে অবস্থান নেয় তরুণ-তরুণীরা। চারিদিকে সংগীতের মূর্ছনা চলতে থাকে। তরুণেরা জলভর্তি পাত্র নিয়ে এসে একজন তরুণীর গায়ে ছিটিয়ে দেয়, এর প্রতিউত্তরে তরুণীও ওই তরুণটির গায়ে জল ছিটিয়ে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে জলোৎসব। মারমা সম্প্রদায়ের ধারণা, এ জলোৎসবের সুবাদে পুরাতন বছরের সব দুঃখ, গ্লানি, ব্যর্থতা ধুয়ে মুছে যায়। এভাবেই তারা শেষ করে সাংগ্রাই উৎসব।

চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব ‘বিঝু’ বা ‘বিষু’। তিন দিনব্যাপী এ উৎসব পালন করে থাকে। বাংলাবর্ষের শেষ দিনকে ‘মূলবিঝু’, তার আগের দিনকে ‘ফুলবিঝু’ এবং নববর্ষের প্রথম দিনকে ‘নুয়াবঝর’ বা ‘গোর্জ্যাপোর্জ্যা’ দিন বলে। ফুলবিঝুর দিনে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা নদীতে গিয়ে কলাপাতায় ফুল ভাসিয়ে দেয়, অনেকে ফুল দিয়ে ঘর সাজায়, নাধেং (ঘিলা, বিবিধ খেলা), নাধেংখারা (লাটিম জাতীয় খেলা), গুদু (হাডুডু) ইত্যাদি খেলার আয়োজন করে থাকে। সর্বত্র ফুলের এ ব্যবহারের কারণে হয়তো-বা এ দিনের নামকরণ হয়েছে ফুলবিঝু। অনেকে আবার চারণকবির মাধ্যমে পালাগান পরিবেশন করিয়ে থাকেন। সময়ের ব্যবধানে এসব পুরনো ঐতিহ্য হরিয়ে যেতে বসেছে। মূলবিঝু দিনই চাকমাদের প্রকৃত বিঝু। এদিনে অতিথিদের জন্য দরজা উন্মুক্ত থাকে। কাউকে দাওয়াত করার প্রয়োজন হয় না। কলাপিঠা, সান্যাপিঠা, বিনিপিঠা, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও পানীয় দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। এ সময় অনেক সদ্য বিবাহিত দম্পতি প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে (বিষুত ভাঙা) বেড়াতে যায়। মূলবিঝুর দিনে সব বাড়িতে টক, মিষ্টি, পাঁচন রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস বছরের শেষ দিন তিতা-মিঠা খেয়ে বছরকে বিদায় দেয়া ভালো। এতে বিগত বছরের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা দূর হয়ে যায়। নুয়াবঝর বা গোর্জ্যাপোর্জ্যায় (বছরের প্রথম দিন) প্রার্থনালয়ে গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে ও আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে ভাত খাওয়ায়; বয়োজ্যেষ্ঠদের মদ ও অন্যান্য পানীয় আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে তারা নববর্ষ উদযাপন করে। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বাঙালি কিংবা আদিবাসী যেই হোক-না কেন সবার কাছে একটি হৃদয়স্পর্শী আয়োজনে পরিণত হয়েছেÑ পরিণত হয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনায়।

এসব লৌকিক, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাইরে বছরের শেষ দিনটিতে গ্রামাঞ্চলের ঘরদোর লেপা-পোছা, বিশেষত সকালবেলা ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও গরু-বাছুরের গা ধুইয়ে দেয়ার রীতি প্রচলিত। এ সময়টা উদরাময়, চর্মরোগ এসবের প্রকোপ বেশি বাড়ে। তাই বছরের শেষ দিন নিরামিষ ও তেঁতো খাওয়ার চল রয়েছে। এককালে এ দিনে সাত রকমের তেঁতো শাকের বিভিন্ন পদ রান্না করা হতো। মেয়ে-জামাইকে নাইওর আনা, পোশাক-আশাক উপহার দেয়ার রীতিও চালু ছিল গ্রামাঞ্চলে। বছরের বিদায় বেলায় মানুষ সাধারণত অতীতের সব গ্লানি, ব্যর্থতা, রোগ-শোক, বালা-মুসিবত থেকে মুক্তির প্রত্যাশা করে। মনে মনে আশা করে নতুন বছর বয়ে আনবে সুখ, শান্তি, সচ্ছলতা। এর ওপর ভিত্তি করেই কৃষিভিত্তিক এ জনপদে চৈত্রসংক্রান্তির আচার-আয়োজনগুলোর উদ্ভব হয়েছিল। দিন বদলেছে, এসব রীতি-রেওয়াজও এখন প্রায় উঠেই গেছে।

কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে সংস্কৃতির। সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েও যাচ্ছে আমাদের অনেক পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আবার সব পরিবর্তনই যে আমাদের জন্য সুফল বয়ে আনছে তা কিন্তু নয়। জাতির উন্নতির পূর্বশর্ত হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ, লালন, চর্চা করা এবং শেকড়ের সন্ধান করা। মানুষের সুস্থ বিকাশ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে মূলধারার সংস্কৃতি-চর্চার বিকল্প নেই। আধুনিকতার সঙ্গে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে আমাদের অবশ্যই তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নতুন নতুন ইতিবাচক সংস্কৃতি আমাদের গ্রহণ করতে হবে, পাশাপাশি আমাদের পূর্ব-পুরুষদের পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগুলোও আমাদের লালন-পালন করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে আধুনিকতার নামে ভিনদেশি নেতিবাচক সংস্কৃতি যেন আমাদের গ্রাস করে না ফেলে। এজন্য আমাদের সবকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। আশার কথা হলো চারিদিকে এত দূষণের পরেও আমাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য-সচেতন অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আদি-অন্তের সুলুক সন্ধান করে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেক উদ্যমী ব্যক্তির পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার যে নিরলস প্রচেষ্টা চলছে তা যৎসামান্য হলেও আলোক ধারার ইঙ্গিত বহন করছে। আমাদের পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগ অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যোগ জরুরি। আমাদের রাষ্ট্র সেই উদ্যোগটি সহসা গ্রহণ করুক সেটিই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমাদের শত শত বছরের ঐতিহ্য চৈত্রসংক্রান্তি বার বার ফিরে ফিরে আসুক তার স্বরূপ নিয়ে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষা-গবেষক ও ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি)]

ahmsharifullah@yahoo.com

দৈনিক সংবাদ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

image

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

এক বাগানের ফুল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আটকে রাখা যায় না

image

বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ : কারণ ও প্রতিকার

ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। পাইরিকুলারিয়া ওরাইজি (Pyriculria Orayzai) নামক

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

বাঙালির অবিসংবাদিক নেতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে।

মুজিবনগর সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব

image

মাদক আসছেই

জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ার সেই দিনটি

image