প্রাচীন বাংলার ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আটকে রাখা যায় না

খন্দকার মুনতাসীর মামুন

image

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মন মাতানো গান ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই...’ নানা জনের মুখে মুখে ফেরে। ‘বাংলা’ শব্দটির সঙ্গে একবার সপ্তমী, আর একবার ষষ্ঠী বিভক্তির হেরফের ঘটিয়ে ‘বাংলা’ কথাটি একাধারে একটি ভাষা এবং একটি ভূখন্ডের অর্থবহ হয়ে যায়। এর ভেতর দিয়ে বাংলা ভাষা, বাংলা নামক এলাকা ওই ভাষাটি ব্যবহারকারী হিসেবে বাঙালির পরিচিতি খুঁজে নেয়া যায়। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সরল এবং নিরীহ মনে হলেও তার ভেতরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে জটিলতা। সেই জটিলতা বুঝতে গেলে ইতিহাসের ভেতর ঢুকতে হয়।

প্রাচীনতম পর্ব থেকে ১২০০ সাধারণ অব্দ পর্যন্ত বাংলা নামক ভূখন্ডটির বহুমাতৃক এবং জটিল অবস্থাটিকে পর্যালোচনা করার ও ফুটিয়ে তোলার আগ্রহে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ‘হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ : আরলি বেঙ্গল? ইন রিজিওনাল পারস্পেকটিভস’ নামের দুই খন্ডে বিধৃত গ্রন্থাবলিতে প্রকাশিত হয়েছে হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস।

বইটি মূলত এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাদেশের ইতিহাস শীর্ষক গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত। এ গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত ১৭০৪ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পর্বের ইতিহাস তিনটি খন্ডে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশ করেছে। তিন খন্ডের সম্পাদনা করেন সিরাজুল ইসলাম। বলাবাহুল্য নিছক জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে সুদূর অতীতকে ধরা অসম্ভব। কারণ তখন জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্বই ছিল না। প্রাচীন কাল থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা বলেও কোন নির্দিষ্ট এলাকা ছিল না। তাই গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এ ভূখ-ের উপবিভাগগুলোর সম্যক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করাই পরের গ্রন্থের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ১৬৪০ পৃষ্ঠার নতুন গবেষণা গ্রন্থের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ইতিহাসবিদ রণবীর চক্রবর্তী এবং প্রফেসর আবদুল মোমিন চৌধুরী। বইয়ে দেখানো হয়েছে, বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা, অসম, ওডিশা এবং বিহারসংলগ্ন এলাকার কিছুটা অংশ নিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

যখন লিপি ছিল না, ভাষাটাও সেভাবে দানা বাঁধেনি, তখন থেকেই পুরাতত্ত্ব, প্রাচীন লেখক, মুদ্রা, শিল্পনিদর্শন, সাহিত্য সম্ভারের মধ্যে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের অঙ্কুর ছড়িয়ে আছে। ভারত, বাংলাদেশ, জাপান, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরাও এর মধ্যেই খোঁজ করেছেন, ইতিহাসের নবাঙ্কুরের। কালিদাস দত্ত, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধাগোবিন্দ বসাক যে-পথে বাংলার ইতিহাস চর্চার অগ্রপথিক হয়েছিলেন, সে-পথেই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখেছিলেন রমেশচন্দ্র মজুমদার, নীহাররঞ্জন রায়। আলোচ্য গ্রন্থে গবেষকরা সে-পথেই হেঁটেছেন।

প্রাচীন বাংলার আঞ্চলিক রূপটি প্রকট হয়েছিল ব্যারি মরিসন এবং দীনেশচন্দ্র সেনের লেখায়। মুঘল আমলে বলা হত সুবে- বাংলা। পর্তুগিজেরা ‘বেঙ্গালা’ শব্দটা চালু করে। সেই থেকে ‘বাঙ্গালা’ শব্দটাও চালু হয়। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাসের আদিপর্ব লেখার পর বাঙালির ইতিহাস চর্চায় আর কোন বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সেদিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগটি উল্লেখযোগ্য।?

বইটির প্রথম খন্ডে থাকছে প্রাচীন জনগোষ্ঠী তথা কৌমগুলোর পরিচয়-অনেকটাই নৃতত্ত্বের ভিত্তিতে। আছে প্রতœতাত্ত্বিক সমীক্ষা, রাজনৈতিক ইতিহাস। দ্বিতীয় খন্ডে সন্নিবিষ্ট হয়েছে বর্ণ-জাতিতে বিভাজিত অসাম্য-চিহ্নিত সমাজ, নারীর অবস্থান, দৈনন্দিন জীবনযাপন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাব্যবস্থা, কৃষি প্রযুক্তি, ধর্মীয়-জীবন (ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ এবং জৈন সম্প্রদায়) শিল্পকলার কথা (স্থাপত্য-ভাস্কর্য, চিত্রকলা, মূর্তিতত্ত্ব), বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিকাশ, সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (সংস্কৃত, প্রাকৃতে রচিত এবং অবশ্যই চর্যাপদের পর্যালোচনা)। থাকছে অনেকগুলো মানচিত্র এবং আলোকচিত্র। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রমিলা থাপারের মুখবন্ধ এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রাককথন বইটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

বাংলাদেশের তরফে এ পদক্ষেপ নেয়া হলো, অথচ তা বাংলাদেশের বর্তমান ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যে আটকে রাখা হলো না তাতে ইতিহাসবোধ মান্যতা পেয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি সিরাজুল ইসলামের সম্পাদনায় ১০ খন্ডে ইংরেজিতে ও বাংলায় আলাদা করে বাংলাপিডিয়া নামে যে গ্রন্থকোষ প্রকাশ করেছিলেন সেখানেও জাতিরাষ্ট্রের মাপকাঠিতে আলোচনা আটকে রাখা ছিল না। সেই প্রাথমিক প্রয়াসের পূর্ণতর রূপ পাওয়া যাবে এ প্রকাশনাটিতে।

সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের নিরিখেই হোক (যে জাতিরাষ্ট্রকে ইতিহাসচর্চার শ্রেয় এলাকা বলে প্রায়ই ধরে নেয়া হয়), আর মানচিত্রের মাপকাঠিতেই হোক, বাংলা (ইংরেজি বেঙ্গল) বলে কোন দেশের কিন্তু এখন অস্তিত্ব নেই; অথচ এটিই আলোচ্য দুটি খন্ডে বিধৃত ইতিহাস চর্চার আধার। বাংলা নামে একটি প্রদেশ ব্রিটিশ আমলে ছিল বটে, কিন্তু দেশভাগের কারণে ১৯৪৭ এর ১৪-১৫ আগস্ট থেকে তো সেই বাংলা ভূখন্ডের অস্তিত্ব লোপ পেয়েছে। ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত বাংলা এলাকার উৎস আবার নিহিত ছিল মুঘল আমলের সুবা বাঙ্গালার মধ্যে। মুঘলকালীন বাঙ্গালাহ কিন্তু নিছক বাংলার ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না; তার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান বিহার ও ওড়িশা এলাকাও। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য রূপে পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভব। আর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ হলো পূর্ববঙ্গ (ইস্ট বেঙ্গল)। ১৯৫৬ সালে ইস্ট-বেঙ্গল এবং পূর্ববঙ্গ দুটি অভিধাই ঘুচে গিয়ে নতুন নামকরণ হলো ইস্ট পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তান। এরপর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিলয় এবং স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। আধুনিক ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ দুটি নামের মধ্যেই পুরনো দিনের বাঙ্গালাহ, বাংলা এবং ইংরেজি (তথা ইউরোপীয় ভাষায়) বেঙ্গল ইত্যাদি ভৌগোলিক অভিধার রেশ রয়ে গেছে। তাই বঙ্গ বা বেঙ্গল বা বাংলাদেশ যারই ইতিহাসের আদিপর্ব নিয়ে অনুসন্ধান করা হোক না কেন, সেই চর্চাকে হাল আমলের জাতিরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সীমারেখায় আবদ্ধ রাখা অসম্ভব এবং অনুচিত। পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী এবং বাংলাভাষী যে কোন মানুষ যতটা ভারতীয়, ঠিক ততটাই বাঙালি। একইভাবে বাংলাদেশের বাসিন্দারা একাধারে বাংলাদেশি এবং বাঙালি। আত্মতার এ যুগ্ম পরিচয় বাংলার ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাস রচনায় শেষ বলে কিছু নেই, ইতিহাসের চূড়ায় সত্য প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব। তাই আবিষ্কৃত তথ্যের আলোকে, অতীতের বাংলা নিয়ে নতুন কথা বলার সুযোগ যথেষ্ট। সেই কারণেই এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ দুই খন্ডে ইংরেজিতে (হয়ত বাংলাতেও প্রকাশিত হবে) বাংলার সুপ্রাচীন অতীতের সামগ্রিক আলোচনায় উদ্যোগী হয়েছেন। নতুন তথ্য গত চার দশকে পরিমাণে বেড়েছে, আকর তথ্যের রকমফেরও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে পুরাতাত্ত্বিক তথ্যপঞ্জি, লেখমালা, মুদ্রা এবং শিল্পসম্ভারের তথ্য উদ্ঘাটনে এ-পার ও-পার দুই বাংলাতেই বহু নতুন কথা জানা গেছে। পুরাতন এবং নব্যপ্রস্তর যুগে-বিশেষত লিখিত উপাদান আসার আগে- বাংলার মানুষের জীবন, জীবিকা, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির ছবি আগের তুলনায় বদলে যেতে বাধ্য। যুক্তি অনুযায়ী আনকোরা তথ্যের আলোকে, পূর্বসূরিদের কাজকে খতিয়ে দেখে নতুন কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। আর সে কাজটিই সুনিপুণভাবে করে চলেছে এশিয়াটিক সোসাইটি। আমরা আশা করব, ‘হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ : আরলি বেঙ্গল? ইন রিজিওনাল পারস্পেকটিভস’ বইটি বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহের মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে। এবং উত্তর প্রজন্মের জন্য ইতিহাস চর্চার নতুন দিশা খুঁজে দেবে।

[লেখক : সাংবাদিক]

suva.muntasir@gmail.com

দৈনিক সংবাদ : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, রোববার, ৭ এর পাতায় প্রকাশিত

চিনি শিল্পে সংকট ও উত্তরণ

সময় মতো আখ বিক্রির টাকা না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে জমি থেকে আখ উপড়ে ফেলেছেন জয়পুরহাট চিনি কলের কৃষক। আখের বদলে আবাদ

চুকনগর গণহত্যা দিবস : গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে চুকনগরের মাটি

image

জাহানারা ইমাম নিরলস যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে

image

জঙ্গিদের পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ!

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশকিছু ওলোট-পালটের ঘটনা ঘটছে। শিগগিরই আরও কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। মারাত্মকভাবে হতাশায় নিমজ্জিত দলগুলোতেই

এক বাগানের ফুল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপান নতুন যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। আড়ম্বরের সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে- জাপানের ভাবী সম্রাট নারুহিতো

বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ : কারণ ও প্রতিকার

ব্লাস্ট ধানের একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। পাইরিকুলারিয়া ওরাইজি (Pyriculria Orayzai) নামক

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

বাঙালির অবিসংবাদিক নেতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে।

মুজিবনগর সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব

image

মাদক আসছেই

জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর